বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি দেশের স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও উন্নত বিশ্বের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।
‘উন্নত দেশে মাথাপিছু বর্জ্য উৎপাদন বেশি হলেও উন্নত ব্যবস্থাপনার কারণে পরিবেশ দূষণ কম: অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশে বর্জ্য কম হলেও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় সমস্যা বেশি।
বর্তমান বিশ্বে বর্জ্য (Municipal Solid Waste) একটি গুরুতর পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। দৈনন্দিন ভোগ-আনন্দের জীবনে মানুষ যতো বেশি ভোগবাদী হচ্ছে ততোই বর্জ্য উৎপাদনের হার বাড়ছে। বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্জ্যের উৎপাদন দেশভেদে ব্যাপক পার্থক্য থাকে এবং এর সাথে জীবন যাত্রার মান ও আয়ের স্তর সরাসরি সম্পর্কযুক্ত।
বিশ্বজুড়ে মধ্যস্থভাবে জনপ্রতি দৈনিক প্রায় ০.৭৪ কেজি বর্জ্য গড়ে উৎপন্ন করে, কিন্তু দেশভেদে এটি জনপ্রতি দিনে ০.১১ থেকে ৪.৫৪ কেজি পর্যন্ত ভিন্ন হয়ে থাকে।
উন্নত ও উচ্চ আয় দেশসমূহে বর্জ্য উৎপাদন সাধারণত বেশি। বেশি আয় দেশগুলোর শহরগুলোতে জনপ্রতি দৈনিক ১.২ কেজি পর্যন্ত বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। আর কম আয়ের দেশগুলোর শহরগুলোতে এটি সাধারণত জনপ্রতি দৈনিক ০.৪-০.৮ কেজি।
যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রতি দৈনিক প্রায় ২.৩ ২.৬ কেজি, ব্রাজিল এ প্রায় ১.২০ কেজি, জার্মানিতে প্রায় ২.১ কেজি, চীনে প্রায় ১.০ কেজি, ভারতে প্রায় ০.৩৪ কেজি এবং বাংলাদেশে (অনুমানিক) প্রায় ০.৪৯ -০.৫২ কেজি বর্জ্য তৈরী হয়ে থাকে।
একটি শহরের বর্জ্য তার জীবনধারা (lifestyle) প্রকাশ করে, আর নগরায়ন বাড়ার সাথে সাথে বর্জ্যের পরিমাণ জ্যামিতিক হারে বাড়ে। আমাদের দেশের শহুরের উল্লেখযোগ্য বর্জ্যসমূহ হলো রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট, প্লাস্টিক প্যাকেট, বোতল, পলিথিন, সবজি-ফলের উচ্ছিষ্ট, কার্টন, থার্মোকল, টেক্সটাইল বর্জ্য, কেমিক্যাল কনটেইনার, মেডিকেল ওয়েস্ট (সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ) ইত্যাদি।
এসব বর্জ্য সমূহ আবার বায়োডিগ্রেডেবল ও নন-বায়োডিগ্রেডেবল নামক ভাগে বিভক্ত, যথা:
বায়োডিগ্রেডেবল (৬০-৭০%): খাবারের উচ্ছিষ্ট, সবজি, ফল, কাগজ, পাতা, কাঠ ইত্যাদি আর এগুলো থেকে কম্পোস্ট, বায়োগ্যাস, জৈব সার তৈরি করা সম্ভব এবং দ্বিতীয়টি হলো নন-বায়োডিগ্রেডেবল বর্জ্য: প্লাস্টিক, পলিথিন, গ্লাস, ধাতু, থার্মোকল এসব, এগুলো শত বছরেও নষ্ট হয় না, ড্রেন ব্লক করে, নদী ও সাগরে যায় এবং পরিবেশ দূষণ করে।
এর বাহিরেও আরেকটি সবচেয়ে অবহেলিত কিন্তু সবচেয়ে ক্ষতিকর বর্জ্য রয়েছে, যা বিপজ্জনক বর্জ্য হিসেবে বিবেচিত যেমন- মেডিকেল ওয়েস্ট, কেমিক্যাল বর্জ্য, ব্যাটারি, ই-ওয়েস্ট
কেবল ঘরোয়া বর্জ্যই নয়, খাদ্যবর্জ্যও বিশ্বব্যাপী বড় সমস্যা। United Nations Environment Programme (UNEP)-এর Food Waste Index Report-2024 অনুযায়ী-বিশ্বজুড়ে গড়ে একজন মানুষ বছরে প্রায় 79 কেজি খাদ্য বর্জ্য করে।
বাংলাদেশে একজন মানুষ বছরে প্রায় ৮২ কেজি খাদ্য নষ্ট বা বর্জ্য করেন, যা যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস এবং জাপানের মতো উন্নত দেশের মতো বা তারও বেশি।
বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১.০৫ বিলিয়ন টনের খাদ্য বর্জ্য তৈরি হয়, যার প্রায় ৬০% পরিবারের ভিতরে ঘটে (Daily Observer)। এই খাদ্যবর্জ্য শুধুমাত্র অপচয় নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ক্ষতিকর গ্যাস (মিথেন)ও উৎপন্ন করে এবং খাদ্য-অভাবে সারা বিশ্বে লক্ষাব্দসংখ্যক মানুষ ক্ষুধার্ত থাকে (Daily Observer)। বিশ্লেষণ ও মূল কারণ উন্নত দেশগুলোতে বর্জ্য বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে রয়েছে- বেশি ভোগ-ব্যবহার, প্যাকেটজাত পণ্য, দ্রুত পরিবর্তিত জীবনধারা এবং বেশি প্লাস্টিক ব্যবহার। বিশ্বব্যাংকের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যদিও মাথাপিছু বর্জ্য কম, তবুও পৃথকীকরণ, পুনঃব্যবহার ও নিরাপদ পরিচালনায় অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলো পূর্বাভাস দিচ্ছে যে-২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী বর্জ্যের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হবে (World Bank)। এ ভাবে হতে থাকলে পরিবেশ, ভূমি ও জল সম্পদে বিরূপ প্রভাব ফেলবে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াবে।
বিশ্বজুড়ে বর্জ্য উৎপাদনের মাত্রা দেশের উন্নয়ন, ভোক্তা আচরণ, জীবনধারা ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে। উন্নত দেশগুলোতে মাথাপিছু বর্জ্য বেশি হলেও ব্যবস্থাপনা উন্নত, আর উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যদিও বর্জ্য কম, সেখানে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এখন প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংকের মতে, সারা বিশ্বে টেকসই পরিবেশ ও স্বাস্থ্য রক্ষায় দুটি ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট নীতি, সচেতনতা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্জ্য কমিয়ে, পুনঃব্যবহার ও রিসাইক্লিং বৃদ্ধি করা যেতে পারে। বিশ্বব্যাংক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অর্থায়ন, নীতি সহায়তা এবং উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে পদক্ষেপ নিচ্ছে যার মধ্যে রয়েছে বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ বৃদ্ধি, খোলা ডাম্পিং হ্রাস, ল্যান্ডফিল গ্যাস ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদন (যেমন- সেন্টমার্টিন) এবং রিসাইক্লিং ও কম্পোস্টিং এর মতো পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিকে উৎসাহিত করা, যা উন্নত বর্জ্য পৃথকীকরণ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক উন্নতি সাধনে সহায়ক।
বাংলাদেশের বর্তমান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গ হলো
বাস্তবতা হলো সিটি করপোরেশন ভিত্তিক সংগ্রহ, খোলা ডাম্পিং গ্রাউন্ড, সীমিত ল্যান্ডফিল এবং অনানুষ্ঠানিক রিসাইক্লিং ইত্যাদির মধ্যে সীমাবদ্ধ। আমাদের দেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কিছু কিছু সিস্টেম থাকলেও ইন্টিগ্রেটেড সিস্টেম নেই। আমাদের দেশে অনানুষ্ঠানিক একটি খাত রয়েছে আর এ খাতের ভূমিকায় রয়েছে টোকাই/ভাঙারিওয়ালা যারা প্লাস্টিক আলাদা করে বিক্রি করে, রাষ্ট্র এদেরকে স্বীকৃতি দেয় না, অথচ এরা হলো রিসাইক্লিংয়ের মেরুদন্ড। বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ সমূহ হলো- নীতিমালা ও মহাপরিকল্পনা (ক্লিন ঢাকা মাস্টার প্ল্যান, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা খসড়া, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১), বেসরকারি সামাজিক উদ্যোগ (ওয়েস্ট কনসার্ন, বেসরকারি সংস্থা ও কোম্পানি), 3 R (Reduce, Refuse, Recycle) নীতির প্রয়োগ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সংস্কার এবং সমন্বিত ও বিকেন্দ্রীভূত পদ্ধতি ইত্যাদি।
অপর দিকে, উন্নত বিশ্বের waste to Energy বর্জ্য ব্যবস্থাপনার তুলনামূলক চিত্র হলো ভিন্ন রকম । উদাহরনস্বরূপ জাপান, জার্মানি ও সিঙ্গাপুরের কথা বলছি। জাপান উৎসে বর্জ্য আলাদা করে, নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শেষ করে এবং নাগরিক শৃঙ্খলা তথা আইন প্রয়োগ প্রয়োগ করে। জার্মানি Circular economy বা রি-সাইক্লিন সিস্টেম আর সিঙ্গাপুর Waste-to-energy থিওরী ফলো করে এবং বিধি ভঙ্গ করলে কঠোর জরিমানা আরোপ করে। এখানে মূল পার্থক্য হলো: প্রযুক্তি নয়, শাসন এবং নাগরিক আচরণ।
আমাদের দেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ কিছু দিক নির্দেশনা ও সম্ভাবনা হতে পারে উচ্চ জৈব বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন সম্ভাবনা বেশি, তরুণ জনগোষ্ঠীর আচরণ পরিবর্তন করা সম্ভব এবং রিসাইক্লিং মার্কেট যা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।
এসব সম্ভাবনাকে ফলপ্রসু করতে আমাদের সামনের চ্যালেঞ্জ সমূহ হলো: নাগরিক অসচেতনতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, নীতি বাস্তবায়নে দুর্বলতা, অপর্যাপ্ত অর্থায়ন ও জনবল, সমন্বয়ের অভাব, দুর্নীতি, পর্যাপ্ত জমির সংকট এবং সরকারি নজরদারি।
সংকট উত্তরনের সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে- উৎসে বর্জ্য আলাদা করা, সিটি করপোরেশন এর পাশাপাশি প্রাইভেট পার্টনারশিপ চালুকরন, অনানুষ্ঠানিক খাতকে অন্তর্ভুক্ত করা, স্কুল-কলেজে বর্জ্য শিক্ষা এবং বর্জ্যকে "সম্পদ" হিসেবে নীতিতে স্বীকৃতি দেওয়া, সরকারের নজরদারি বৃদ্ধি করা। পরিশেষে বলবো, "সমস্যা আবর্জনা নয়, সমস্যা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি” অর্থাৎ আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে।
লেখক: নিবিড় কর্মকার, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ