বাংলাদেশে এ বছর ফিতরার হার জনপ্রতি সর্বোচ্চ ২ হাজার ৮০৫ টাকা এবং সর্বনিম্ন ১১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বায়তুল মোকাররম সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত জাতীয় ফিতরা নির্ধারণ কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
পবিত্র রমজান শেষে খুশির সওগাত নিয়ে আসে ঈদুল ফিতর। ঈদের এই আনন্দ যেন সমাজের ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই ভাগ করে নিতে পারে, সে জন্য ইসলামে ‘সদকাতুল ফিতর’ বা ফিতরা আদায়ের বিধান রাখা হয়েছে। এটি এমন এক বরকতময় ইবাদত, যার মাধ্যমে রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতির ক্ষতিপূরণ হয় এবং একই সঙ্গে সামাজিক সাম্য, মানবিক সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত হয়। তবে ফিতরা কার ওপর ওয়াজিব এবং তা আদায়ের সঠিক সময় কোনটি, এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রতিটি মুসলমানের জন্য জরুরি।
যাদের ওপর ফিতরা ওয়াজিব : ইসলামী শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, কারও কাছে সাড়ে সাত ভরি সোনা বা সাড়ে ৫২ ভরি রুপা অথবা তার সমমূল্যের নগদ অর্থ কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অতিরিক্ত সম্পদ ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় বিদ্যমান থাকলে তার ওপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হবে। যার ওপর সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব, তিনি নিজের পক্ষ থেকে যেমন আদায় করবেন, তেমনি নিজের অধীনদের পক্ষ থেকেও আদায় করবেন। তবে এতে জাকাতের মতো বর্ষ অতিক্রম হওয়া শর্ত নয়। (ফাতহুল কাদির ২/২৮১)
এই নেসাব পূর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন, প্রাপ্তবয়স্ক বা মুকিম হওয়া শর্ত নয়। অর্থাৎ নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে শিশু, মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি এমনকি মুসাফিরের ওপরও ফিতরা ওয়াজিব হবে। নাবালেগ বা মানসিক ভারসাম্যহীনের ক্ষেত্রে তার অভিভাবক নিজ সম্পদ থেকে সদকাতুল ফিতর আদায় করবেন। মহানবী (স.) ছোট-বড় সবার পক্ষ থেকেই ফিতরা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। (রদ্দুল মুহতার ২/৩৫৯)
ফিতরা আদায়ের উদ্দেশ্য : মহানবী (সা.) দুটি বিশেষ কারণে সদকাতুল ফিতরকে উম্মতের জন্য ওয়াজিব করেছেন। প্রথমত, রমজানের রোজা পালন করতে গিয়ে যেসব অশ্লীল বা অর্থহীন কথা ও কাজ হয়ে যায়, তা থেকে রোজাকে পবিত্র করা। দ্বিতীয়ত, ঈদের খুশিতে যেন দরিদ্র ও অভাবী মানুষরা খাবারের সংস্থান করতে পারে। (সুনানে আবু দাউদ ১৬০৯)
ফিতরা আদায়ের উত্তম সময় : সদকাতুল ফিতর আদায়ের সর্বোত্তম সময় হলো ঈদের দিন ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বমুহূর্ত। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, লোকজন ঈদের নামাজের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পূর্বেই রাসুলুল্লাহ (সা.) সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি ১৫০৯)
তবে সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকে ঈদের কয়েক দিন আগেও ফিতরা আদায়ের প্রমাণ পাওয়া যায়। নাফে (রহ.) বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) ঈদের দুয়েক দিন পূর্বেই ফিতরা আদায় করে দিতেন। (সুনানে আবু দাউদ ১৬০৬) অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি ঈদের দুই-তিন দিন আগেই ফিতরা উসুলকারীর কাছে তা পাঠিয়ে দিতেন। (মুয়াত্তা ইমাম মালেক ৩১৬)
ফিতরা আদায়ের মূল লক্ষ্য যেহেতু দরিদ্রদের সহায়তা করা, তাই রমজানের শেষ দিকে আদায় করাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত। এতে অভাবী মানুষরা ঈদের কেনাকাটা ও খাবারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আগেভাগেই করার সুযোগ পায়। (আলবাহরুর রায়েক ২/২৫৫)
উল্লেখ্য, কোনো কারণে যদি নির্ধারিত সময়ে অর্থাৎ ঈদের নামাজের আগে ফিতরা আদায় করা সম্ভব না হয়, তবে পরবর্তী সময় তা আদায় করা আবশ্যক। ওয়াজিব বিধান হওয়ার কারণে এটি কোনোভাবেই মাফ হবে না, বরং কাজা হিসেবে দ্রুত আদায় করে দিতে হবে। (কিতাবুল আছল ২/২০৭) ফিতরা ঈদের আনন্দকে সর্বজনীন করার এক মহান সামাজিক ব্যবস্থা। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক সময়ে এবং সঠিক নিয়মে সদকাতুল ফিতর আদায়ের মাধ্যমে গরিব-অসহায়দের মুখে হাসি ফোটানোর তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক
