ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান আলোচনা কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। যেকোনো মুহূর্তে ইরানের ওপর মার্কিন সামরিক হামলার আশঙ্কায় ইসরায়েল থেকে জরুরি প্রয়োজনে নিয়োজিত নন এমন সরকারি কর্মী এবং তাদের পরিবারকে অবিলম্বে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদেরও বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু থাকাকালীন দ্রুত ইসরায়েল ত্যাগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক বিশেষ সতর্কবার্তায় এই নির্দেশনা জারি করা হয়। এতে মার্কিন নাগরিকদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইসরায়েল ভ্রমণে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যেই দুটি বিমানবাহী রণতরী (ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ) ওই অঞ্চলে মোতায়েন করেছেন। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, তেহরান যদি তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম বন্ধের বিষয়ে আন্তরিক না হয়, তবে যেকোনো সময় সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
জেনেভায় গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সমঝোতা ছাড়াই তা শেষ হয়। মার্কিন প্রতিনিধি দলের প্রধান স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার আলোচনার পর কোনো ইতিবাচক বিবৃতি দেননি, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি দূতাবাসের কর্মীদের এক জরুরি ইমেইল বার্তায় বলেছেন, যারা দেশ ছাড়তে চান, তারা যেন আজই (শনিবার) চলে যান।
স্থানীয় সময় রাত ১২টা ০৪ মিনিটে পাঠানো ওই বার্তায় তিনি কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, যেখানেই টিকিট পান না কেন, দ্রুত বুক করুন। লক্ষ্য হওয়া উচিত দ্রুততম সময়ে এই দেশ ত্যাগ করা। রাষ্ট্রদূতের এমন বার্তার পর ইসরায়েলে বিমানে সিট পাওয়ার জন্য ব্যাপক হাহাকার শুরু হয়েছে।
এদিকে, নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে যুক্তরাজ্যও ইরান থেকে তাদের কূটনৈতিক কর্মীদের সাময়িকভাবে সরিয়ে নিয়েছে। ব্রিটিশ ফরেন অফিস জানিয়েছে, বর্তমানে তারা সশরীরে কোনো কনস্যুলার সেবা দিতে সক্ষম নয়।
পুরোদমে যুদ্ধ এড়াতে শেষ মুহূর্তের কূটনৈতিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ওমান। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি জরুরি ভিত্তিতে ওয়াশিংটন উড়ে গেছেন। তিনি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে তা তুলে ধরবেন। আলবুসাইদি বোঝানোর চেষ্টা করবেন যে, সামান্য অগ্রগতির ভিত্তিতে এখনই সামরিক হামলা চালানো ঠিক হবে না।
জেডি ভ্যান্সকে ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা হয় যিনি সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধী। তবে স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র টমি পিগট জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইসরায়েল সফরে যাচ্ছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রুবিও ইসরায়েলে অবস্থানকালে হয়তো হামলা শুরু হবে না, কারণ পাল্টা ইরানি হামলার ঝুঁকি রয়েছে। তবে রুবিও তার এই সফরে সাংবাদিকদের সঙ্গে নিচ্ছেন না, যা একটি অস্বাভাবিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চূড়ান্তভাবে হামলার নির্দেশ দেবেন কি না তা আমি জানি না। তবে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা সীমিত পরিসরে সামরিক পদক্ষেপ নিতেই পারি। কেউ ভুল করেছে মানে এই নয় যে আমরা আর কখনোই সামরিক শক্তি ব্যবহার করব না।
ইরান তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশে রপ্তানি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। গত জুলাইয়ে ইরানি পার্লামেন্টে পাস হওয়া এক আইনে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সাথে সহযোগিতা বন্ধ এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকারের স্বীকৃতি দাবি করা হয়েছে।
আইএইএ তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইরানের অভ্যন্তরে থাকা ৪০০ কেজি উচ্চ মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। ইসফাহান, নাতাঞ্জ এবং ফোরদোর পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে সন্দেহজনক কার্যক্রম লক্ষ্য করা গেলেও পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার না থাকায় প্রকৃত অবস্থা জানা সম্ভব হচ্ছে না।
বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরবর্তী কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক আগামী সপ্তাহে ভিয়েনায় আইএইএ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে তার আগেই যুদ্ধের প্রস্তুতি মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
দক্ষিণ সুদানে আবারও ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা
২৭৪ তালেবান ও ৫৫ পাক সেনা নিহতের দাবি