শুক্রবার, ছুটির দিনের দুপুর। ঘড়ির কাঁটায় তখন ১টা ৫২ মিনিট। হঠাৎ কেঁপে উঠল সারা দেশ। গতকাল দুপুরে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল সারা দেশ। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৪। উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা। কয়েক সেকেন্ডের এই কম্পনে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় সব জেলা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকায় (বিশেষ করে কলকাতা ও বারাসাত) তীব্র ঝাঁকুনি অনুভূত হয়। দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে বিস্তারিত
আশাশুনি-সাতক্ষীরায় তীব্রতা সবচেয়ে বেশি : সাতক্ষীরা জেলা আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন জানান, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল খুলনা শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং সাতক্ষীরা থেকে ১৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে আশাশুনি উপজেলায়। গভীরতা ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে আনুমানিক ৩৫ কিলোমিটার। এই গভীরতা ও উৎপত্তিস্থলের নৈকট্যের কারণে সাতক্ষীরা, আশাশুনি, কালীগঞ্জসহ আশপাশের এলাকায় কম্পনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। গুগলের তথ্যমতে, কেন্দ্রস্থল আশাশুনি সদর থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে।
আশাশুনির সমাজকর্মী কৃষ্ণ ব্যানার্জি জানান, কম্পনের সময় তিনি পরিবার নিয়ে দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যান। পরে দেখেন তার বাড়ির দুটি দেয়ালে ফাটল ধরেছে।
আনুলিয়া এলাকার বাসিন্দা কাজল কুমার সানা জানান, নদীর পানি কেঁপে উঠেছিল, যা দেখে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। একই এলাকার আবদুল খালেক জানান, তার পানির প্ল্যান্টের দেয়াল ভেঙে গেছে এবং গ্রামের কয়েকটি কাঁচা ঘরে ফাটল দেখা দিয়েছে। তালা উপজেলার নগরঘাটা ইউনিয়নে একটি কাঁচা ঘরের চালের টালি ঝরঝর করে ভেঙে পড়ার খবর পাওয়া গেছে।
খুলনা-যশোরে আতঙ্কে রাস্তায় মানুষ : খুলনায় কম্পনের সময় অনেকে আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন। বয়রা আবাসিক এলাকার গৃহবধূ শামিমা নাসরিন সীমা বলেন, হঠাৎ বিশাল শোঁ শোঁ শব্দে বাড়ি কেঁপে ওঠে, আমরা দ্রুত রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি। নৌবাহিনীর সাবেক সদস্য হাফিজুর রহমান জানান, জুমার নামাজের মোনাজাতের সময় কম্পন হওয়ায় মুসল্লিদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
খুলনা আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, এটি মাঝারি ধরনের ভূমিকম্প ছিল।
যশোরেও তীব্র কম্পন : বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, উৎপত্তিস্থল আশাশুনি এবং গভীরতা ৩৫ কিলোমিটার। লোকজন আতঙ্কিত হয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসে, তবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির খবর নেই।
কলকাতায়ও ঝাঁকুনি, মানুষ রাস্তায় : ভারতের পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষ করে কলকাতায় কম্পন অনুভূত হয়। স্থানীয় সময় দুপুর ১টা ২২ মিনিটে (বাংলাদেশ সময়ের সঙ্গে মিল রেখে) তীব্র ঝাঁকুনিতে বহুতল ভবন থেকে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজির তথ্যমতে মাত্রা ৫.৫, যদিও ইউএসজিএসের তথ্যে ৫.৩। কেন্দ্রস্থল বাংলাদেশের সাতক্ষীরায়। এর আগে গত ৩ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমার উৎসে ৬ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয় কলকাতায়।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা : সাতক্ষীরা জেলা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের পর্যবেক্ষক বেলাল হোসেন বলেন, সাম্প্রতিককালে এ অঞ্চলে এটি তুলনামূলক বড় ভূমিকম্প। বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর না থাকলেও মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে। ভূমিকম্প যেকোনো সময় আবার হতে পারে। দুর্যোগ প্রস্তুতি, নিরাপদ ভবন নির্মাণ ও জনসচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ ধরনের কম্পন ভবিষ্যতের বড় ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করে। ফেব্রুয়ারিতে এখন পর্যন্ত ১০টিরও বেশি মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে, যা টেকটোনিক কার্যকলাপের বৃদ্ধির লক্ষণ। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, ভবন নির্মাণে কোড অনুসরণ ও দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। যদিও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর নেই, তবু আতঙ্কের ছায়া এখনো রয়ে গেছে অনেক এলাকায়।