নরসিংদীতে ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় বাবার কাছ থেকে অপহরণের পর এক কিশোরীকে হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত নুর মোহাম্মদ ওরফে নুরাকে (২৮) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল শুক্রবার রাত ৯টার দিকে গাজীপুরের মাওনা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে নিশ্চিত করেছেন মাধবদী থানার ওসি কামাল হোসেন।
এদিকে ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগে সালিশ বৈঠকের বিচারক ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহাম্মদ আলী দেওয়ানকে দলীয় প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব ধরনের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গতকাল রাতে সদর উপজেলা বিএনপির এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়। দলটির সদর উপজেলা সভাপতি আবু সালেহ চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেন স্বাক্ষরিত নোটিসে উল্লেখ করা হয়, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ায় আহাম্মদ আলীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
ওই ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে মাধবদীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে আরও পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মহিষাশুড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য ও মহিষাশুড়া ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহম্মদ আলী মেম্বার ওরফে আহম্মদ দেওয়ান (৬৫), তার ছেলে মো. ইমরান দেওয়ান (৩২), হোসেন বাজার এলাকার মৃত মজিবুরের ছেলে গাফ্ফার (৩৪), নুরার চাচাতো ভাই এবাদুল্লাহ (৪০) এবং মো. আজগর আলীর ছেলে মো. আইয়ুব (৩০)।
কিশোরীকে ধর্ষণ ও ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দিতে পরিকল্পিতভাবে হত্যার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ জেলা জুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে ধর্ষণ ও হত্যার বিচারের দাবিতে বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক।
এ চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও নরসিংদী সদর আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন। তিনি বলেন, ধর্ষক ও হত্যাকারীসহ সব অপরাধীর বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। অপরাধী যে দলেরই হোক, তাদের ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ইতিমধ্যে নুরাসহ সব অপরাধীকে গ্রেপ্তারের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মহিষাশুড়া ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহম্মদ আলী দেওয়ান এর আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
পুলিশ, নিহতের স্বজন ও স্থানীয়রা জানান, নিহতের বাবা আশরাফ হোসেন ময়মনসিংহের শেরপুরের বাসিন্দা। মাধবদী এলাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। সম্প্রতি নিহত কিশোরীর মা ফাহিমা বেগমকে বিয়ে করেন। স্ত্রী, সৎকন্যা ও ছেলেসহ মাধবদীর বিলপাড় এলাকায় ভাড়ায় বসবাস করতেন। ১৫ দিন আগে স্থানীয় বখাটে নুরার নেতৃত্বে পাঁচ-ছয়জনের একটি দল এলাকা থেকে মেয়েটিকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে। এর বিচার চেয়ে নিহতের পরিবার মহিষাশুড়া ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহম্মদ আলী মেম্বার ওরফে আহম্মদ দেওয়ানের দ্বারস্থ হয়। সেখানে অভিযুক্ত নুরা ও তাদের সহযোগীরা মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে রফাদফার চেষ্টা করে। রফাদফা না হওয়ায় নিহতের পরিবারকে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন সালিশ বৈঠকের বিচারক আহম্মদ দেওয়ান। এরপর গত বুধবার রাতে বাবা আশরাফ হোসেন কাজ শেষে মেয়েকে খালার বাড়িতে রেখে আসতে যাচ্ছিলেন। পথে বড়ইতলা এলাকায় পৌঁছলে নুরার নেতৃত্বে আরও পাঁচজন তাদের গতিরোধ করে। ওই সময় নুরা নিহতের বাবাকে ছুরির মুখে জিম্মি করে। পরে তার কাছ থেকে কিশোরী মেয়েকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। পরিবারের লোকজন খোঁজাখুঁজির পর না পেয়ে বাড়ি ফিরে যান। বৃহস্পতিবার দুপুরে একই এলাকার একটি সরিষাক্ষেত থেকে গলায় ওড়না পেঁচানো মরদেহ দেখতে পান স্থানীয়রা। পরে মাধবদী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে নরসিংদী সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। গতকাল শুক্রবার বিকেলে নরসিংদী সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে নিহত কিশোরীর মরদেহ মাধবদী স্থানীয় একটি কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এ ঘটনায় নুরাকে প্রধান আসামি করে নয়জনকে আসামি করে মাধবদী থানায় মামলা করেন নিহতের মা ফাহিমা বেগম।
এ ঘটনায় পুলিশ বিএনপি নেতাসহ পাঁচজনকে আদালতে সোপর্দ করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে। আদালতের বিচারক আগামী রবিবার শুনানির দিন ধার্য করেন।
এদিকে গতকাল সকালে নিহত কিশোরীর বাড়ি ও ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জ ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক জানান, গত ১০ ফেব্রুয়ারি মেয়েটিকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়। কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবার তখন পুলিশের কাছে আসেনি। থানায় এলে এ ঘটনা ঘটত না। তবে হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে মাঠে নামে এবং পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মূল অভিযুক্ত নুরাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের কয়েকটি টিম জেলা ও জেলার বাইরে কাজ করছে। স্বল্প সময়ের মধ্যেই সব আসামিকে আইনের আওতায় আনা হবে।
জামায়াতের নিন্দা-উদ্বেগ : ঢাকায় ৬ বছরের এক শিশু ও নরসিংদীর মাধবদীতে এক কিশোরীকে অপহরণ, ধর্ষণ ও নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ, তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের গতকাল শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ঢাকার হাতিরঝিল থানাধীন পশ্চিম উলন এলাকায় তাহেদী আক্তার জান্নাত নামে ৬ বছরের এক শিশু এবং নরসিংদীর মাধবদীতে ১৫ বছরের এক কিশোরীকে অপহরণ, ধর্ষণ ও নির্মমভাবে হত্যার মর্মান্তিক ঘটনায় আমি গভীর শোক, ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করছি। তাদেরকে ধর্ষণের পর পৈশাচিক কায়দায় হত্যা মানবতা, নৈতিকতা ও আইনের শাসনের ওপর চরম আঘাত।’
তিনি বলেন, ‘আমি নিহত শিশু ও কিশোরীর রুহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। একই সঙ্গে এ নৃশংস ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকল অপরাধী তারা যে দল, গোষ্ঠী বা প্রভাবশালী মহলেরই হোক না কেন, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার জন্য সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।’
ঢাবিতে বিক্ষোভ : নরসিংদীসহ সারা দেশে সাম্প্রতিককালে ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, হত্যা ও সহিংসতার ঘটনাগুলোর দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং নারী-শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে পৃথক কর্মসূচি পালন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু), বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাবি শাখা এবং ঢাবির নরসিংদী জেলা ছাত্রকল্যাণ সমিতি। গতকাল দুপুরে পৃথক বিক্ষোভ সমাবেশে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানানো হয়।
শুক্রবার বাদ জুমা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে ডাকসুর উদ্যোগে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে টিএসসির সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মিলিত হয়।
অন্যদিকে রাজধানীর রামপুরাসহ নরসিংদীতে শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনার প্রতিবাদে এক যৌথ বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। বিবৃতিতে শাখা সভাপতি ও ডাকসুর এজিএস মুহা. মহিউদ্দিন খান এবং সেক্রেটারি কাজী আশিক নরসিংদীতে বিচার চাওয়াকে কেন্দ্র করে এক কিশোরীকে অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা জানান।
নরসিংদীর ঘটনা নারী-শিশু সুরক্ষা কাঠামোর দুর্বলতা : নরসিংদীতে কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। গতকাল শুক্রবার সংস্থার এক বিবৃতিতে বলা হয়, এ ঘটনা আমাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আইনপ্রয়োগ এবং নারী-শিশু সুরক্ষা কাঠামোর গুরুতর দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, একজন কিশোরীর জীবন, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা। এ ধরনের অপরাধ শুধু ফৌজদারি আইন লঙ্ঘন নয়, এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনেরও চরম লঙ্ঘন। এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কমপক্ষে ২ হাজার ৪৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে কমপক্ষে ৮২৮ জন, যাদের মধ্যে ৪৭৪ (৫৭ শতাংশ) জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু।