চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোজা

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৬, ১২:৩৩ এএম

রোজা শরীরের জন্য খুব উপকারী। মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. পিটার ভেনিয়ামিনভ ১৭৬৯ সালে প্রথম বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি দেন, রোজা পরিপাকতন্ত্রকে বিশ্রাম দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগ সারাতে সাহায্য করে। বর্তমানে অটোফ্যাজি প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করে জাপানি বিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওসুমি নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন, যার মাধ্যমে প্রমাণ করা হয়েছে, রোজা কীভাবে শরীর থেকে অকেজো কোষ দূর করে। এক কথায়, রোজার মাধ্যমে মহান আল্লাহর ইবাদতের পাশাপাশি অগণিত শারীরিক উপকারিতাও লাভ করে থাকি আমরা। শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও রোজার রয়েছে অনেক স্বাস্থ্যগত উপকারিতা।

রক্ত ও হৃদযন্ত্রের ওপর রোজার প্রভাব : রোজা রাখলে শরীরে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে এবং ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ে। ফলে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায় । দীর্ঘক্ষণ রোজা থাকার ফলে শরীর যখন সঞ্চিত চর্বি পোড়াতে শুরু করে, তখন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ধমনিতে চর্বি জমার পরিমাণ কমে যায়। যাদের হৃদরোগ আছে, তাদের জন্যও রোজা উপকারী হতে পারে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও ওজন নিয়ন্ত্রণ : রোজা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। নিয়মিত রোজা রাখলে প্রদাহজনিত সমস্যা কমে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের উৎপাদন বাড়ে। সারা বছর অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসের ফলে শরীরে যে জৈব বিষ (টক্সিন) জমে, রোজার সময় সেই বিষাক্ত উপাদান থেকে শরীর ধীরে ধীরে মুক্তি পায়। ওজন কমানোর ক্ষেত্রেও রোজা অত্যন্ত কার্যকরী। দীর্ঘ সময় উপবাসের ফলে শরীর ভিসেরাল ফ্যাট পোড়াতে শুরু করে, যা ওজন কমাতে সাহায্য করে।

মস্তিষ্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি : রোজা মস্তিষ্কের জন্য বিশেষ উপকারী। রোজার সময় শরীরে কিটোন বডি উৎপন্ন হয়, বিশেষ করে বিএইচবি, যা বিষন্নতা দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পিইটি স্ক্যানে দেখা গেছে, রোজার সময় মস্তিষ্কের কোষগুলো স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ৭ থেকে ৮ গুণ বেশি কিটোন বডি ব্যবহার করে। এটি আলঝেইমারস, পারকিনসন্স, অটিজম ও এডিএইচডি রোগীদের জন্য উপকারী। রোজা মস্তিষ্কের নিউরোপ্লাস্টিসিটি বাড়ায়, অর্থাৎ মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে নতুন সংযোগ স্থাপন ও পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়া সক্রিয় করে। এছাড়া এটি স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও শিক্ষার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

ধূমপান ও ক্ষতিকর অভ্যাস ত্যাগে রোজা : রমজান মাস ধূমপান ছাড়ার জন্য সবচেয়ে কার্যকর সময়। দীর্ঘ ১২-১৪ ঘণ্টা ধূমপান থেকে বিরত থাকার ফলে শরীরে নিকোটিনের প্রতি আসক্তি কমে যায় । ধূমপানের কারণে সৃষ্ট ক্যানসার, হৃদরোগ ও ফুসফুসের সমস্যা থেকে বাঁচার জন্য এই অভ্যাস ত্যাগে রোজা সহায়ক ভূমিকা রাখে।

রোজার স্বাস্থ্য উপকারিতা পেতে সঠিক খাদ্যাভ্যাস জরুরি। ইফতার করা উচিত খেজুর ও পানি দিয়ে, কারণ এটি দ্রুত শক্তি জোগায়। ইফতার ও সাহরিতে ভাজা-পোড়া ও অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে চলা উচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাহরিতে ধীরে হজম হয় এমন খাবার (যেমন লাল চালের ভাত, আটার রুটি, শাকসবজি ও ডাল) খেলে সারা দিন শক্তি পাওয়া যায় এবং ক্ষুধা কম লাগে। পানি শূন্যতা এড়াতে ইফতার থেকে সাহরি পর্যন্ত অন্তত আড়াই থেকে তিন লিটার পানি পান করা জরুরি।

লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত