ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন জায়গায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর উপসাগরীয় অঞ্চল জুড়ে কয়েকটি দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এ নিয়ে আরব অঞ্চলটিতে ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে। পাল্টাপাল্টি হামলায় বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে বাংলাদেশের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানিবাহী জাহাজ এ পথেই বাংলাদেশে আসে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে বিশে^র জ্বালানি খরচ প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। গতকাল শনিবার পর্যন্ত প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ৬৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এদিকে যুদ্ধাবস্থার কারণে বাড়তে শুরু করেছে সোনার দাম।
ভারতের ইকুইরাস সিকিউরিটিজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান যদি প্রতিশোধ হিসেবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ বন্ধ করে দেয়, তাহলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৫ থেকে ১১০ ডলারে উঠে যেতে পারে।
এনডিটিভির এক খবরে বলা হয়েছে, বর্তমানে ইরানের দৈনিক তেল উৎপাদন প্রায় ৩৩ লাখ ব্যারেল, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৩ শতাংশ। প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, চলমান উত্তেজনার মূল বিষয় হচ্ছে এই তেল। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ১ শতাংশ সরবরাহ ব্যাহত হলে তেলের দাম সাধারণত ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। সে হিসেবে শুধু ইরানের তেল সরবরাহই যদি ব্যাহত হয়, তাহলে অপরিশোধিত তেলের দাম ৯ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
ব্লুমবার্গের খবর অনুযায়ী ইরানে আক্রমণ করার যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির মধ্যে শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ২ দশমিক ৭৮ শতাংশের বেশি বেড়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারিতে যেখানে ব্যারেলপ্রতি দাম ছিল ৬১ ডলার, তা বেড়ে বর্তমানে ৬৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের ফলবিহীন বৈঠক এই বাজারকে আরও বেশি অস্থিরতার মধ্যে ফেলে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের শঙ্কা যেখানে
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সরাসরি হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি ও এলএনজি এই রুট দিয়েই বাংলাদেশে আসে। সৌদি আরব, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো প্রধান সরবরাহকারীদের কাছ থেকে জ্বালানি আনার ক্ষেত্রে বাস্তবে কোনো বিকল্প সমুদ্রপথ নেই।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য মূলত দুই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং সরকারের ওপর ভর্তুকির বাড়তি চাপ তৈরি হওয়া। এ ছাড়া রয়েছে সরবরাহ পরিস্থিতি ভেঙে পড়ার শঙ্কা। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিঘিœত হলে বা বীমা প্রিমিয়াম বেড়ে গেলে শিপমেন্ট বিলম্বিত হতে পারে। এর ফলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাবে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে, যা সরাসরি শিল্প খাতে উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেবে। এতে জ্বালানিনির্ভর রপ্তানি পণ্যগুলো বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। এ ছাড়া আমদানি বিল বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে, যা দেশীয় বাজারে মুদ্রাস্ফীতি আবার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশকে দ্রুত বিকল্প সরবরাহ উৎস খোঁজা, দীর্ঘমেয়াদি মূল্যচুক্তি নিশ্চিত করা এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুদ বাড়ানোর বিষয়টি নতুন করে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
সোনার দামে নতুন অস্থিরতা তৈরি হতে পারে
বিশ্ববাজারে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সোনার দামে নতুন অস্থিরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকির কথা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে যুদ্ধ। আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটগুলোর খবরে বলা হয়েছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ার কারণে ইতিমধ্যেই বাজারে নতুন করে সোনার দাম বাড়তে শুরু করেছে।
গত সোমবার সোনার দাম ছিল আউন্সপ্রতি সর্বোচ্চ ৫ হাজার ২৩০ ডলার, যা পরের দিন মঙ্গলবার সোনার দাম ১ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ কমে ৫ হাজার ১৭৬ ডলারে নেমে এসেছে। কিন্তু স্পট মার্কেট কিটকোর খবরে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার স্পট মার্কেটে সোনার দাম আবার আউন্সপ্রতি বেড়ে ৫ হাজার ২৮০ ডলারে উঠেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যখনই অনিশ্চয়তা বাড়ে, তখনই বাড়তে শুরু করে সোনার দাম। বিনিয়োগের নিরাপদ খাত হিসেবে পরিচিত সোনায় বিনিয়োগ বাড়াতে থাকেন বিনিয়োগকারীরা। ফলে ঊর্ধ্বমুখী হয় সোনা। ঠিক তেমনই দেখা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েলের ইরানে যৌথ আক্রমণ এবং অন্যদিকে ট্রাম্পের বিভিন্ন দেশের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের ঘোষণায় সোনার বাজার আবার বাড়তে শুরু করেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দেশের বাজারেও সোনার দাম বেড়েছে। তাও আবার সকাল বিকেল দুই বার বাড়ানো হয়েছে দাম। গতকাল সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম সকালে ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা বাড়িয়ে ২ লাখ ৬৫ হাজার ৪১৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়। রাতে দ্বিতীয় দফায় দাম বাড়িয়ে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন ২ লাখ ৬৮ হাজার ৬৮০ টাকা নির্ধারণের ঘোষণা দেয়।