গণঅভ্যুত্থান থেকে সংসদে

প্রথম বছরে এনসিপির সাফল্য ও সংকট

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৬, ০৭:৩৬ এএম

বিরাজমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলে ‘নয়া বন্দোবস্ত’ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে যাত্রা শুরু করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এক বছর পূর্ণ করেছে। গণঅভ্যুত্থানের আবহ থেকে উঠে আসা দলটি গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ করে। শুরু থেকেই তারা ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠা এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক ধারার প্রতিশ্রুতি সামনে আনে। প্রথম বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত হয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ছয়টি আসনে জয় নিশ্চিত করেছে দলটি। পাশাপাশি আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে লড়ার ঘোষণাও দিয়েছেন দলটির নেতারা।

‘দেশ যাবে নতুন পথে, ফিরবে না আর ফ্যাসিবাদে’ স্লোগান সামনে রেখে প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করে এনসিপি। এ উপলক্ষে গত শনিবার রাজধানীর ধানমন্ডির আবাহনী মাঠে কেন্দ্রীয়ভাবে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রাষ্ট্র সংস্কার এবং জুলাইয়ের হত্যাকা-ের বিচার দাবিতে সরব ভূমিকা পালন করে আসছে দলটি।

তবে এক বছরের এই যাত্রা একেবারেই মসৃণ ছিল না। প্রতিষ্ঠাকালে ২১৭ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হলেও বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সদস্য সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১৭২ জনে। অর্থাৎ অন্তত ৪৫ জন নেতা বিভিন্ন সময় দল ছাড়েন বা বহিষ্কৃত হন। জাতীয় নির্বাচনের আগে গত ডিসেম্বরে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর সাবেক জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারাসহ প্রায় ২০ নেতা দল ত্যাগ করেন। জ্যেষ্ঠ নারী নেত্রী সামান্তা শারমিন ও নাহিদা সারোয়ার নিভা, নুসরাত তাবাসসুম আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ না করলেও দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় রয়েছেন।

তৃণমূলপর্যায়ের বিচ্ছিন্নতা হিসাব করলে দলত্যাগের সংখ্যা শতাধিক ছাড়াতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এনসিপি নেতাদের মতে, জুলাই অভ্যুত্থানে যুক্ত একাংশের মধ্যে নেতৃত্বের আদর্শিক মতপার্থক্যই এই সরে যাওয়ার মূল কারণ।

দল ছেড়ে যাওয়া নেতাদের ফিরিয়ে আনা হবে কি না প্রশ্নের জবাবে সদস্য সচিব আখতার হোসেন জানান, যারা দল ছেড়েছেন, তাদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে অভ্যন্তরীণ এই টানাপড়েনকে দলটির শীর্ষ নেতারা রাজনৈতিক বিকাশের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবেই দেখছেন। বরং তারা প্রথম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েই ছয়টি আসনে জয়লাভকে বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করছেন। নতুন দল হিসেবে এটি নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক বলেও মত এনসিপি নেতাদের।

এনসিপির কয়েকজন নেতার মতে, এনসিপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন অভ্যন্তরীণ বিভক্তি সামাল দেওয়া এবং নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। একই সঙ্গে বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ এবং স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় সুস্পষ্ট করে সাংগঠনিক কার্যক্রম বেগবান করা।

জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-১১ আসনে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, রংপুর-৪ আসনে সদস্য সচিব আখতার হোসেন, কুমিল্লা-৪ আসনে দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ, নোয়াখালী-৬ আসনে যুগ্ম সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ, কুড়িগ্রাম-২ আসনে যুগ্ম আহ্বায়ক আতিকুর রহমান মুজাহিদ এবং নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে যুগ্ম সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল আমিন জয়ী হন।

৩২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রায় ২১ লাখ ভোট পেয়েছে এনসিপি, যা দল হিসেবে তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোট ও আসনপ্রাপ্তির রেকর্ড।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, আন্দোলন থেকে উঠে আসা কোনো দলের জন্য সাংগঠনিক শক্তিকে ভোটে রূপান্তর করা সহজ কাজ নয়; এটি বড় ধরনের সক্ষমতার পরীক্ষা। সেই বিবেচনায় এনসিপির নির্বাচনী ফল তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। তৃণমূলভিত্তিক সক্রিয়তা, ইস্যুকেন্দ্রিক অবস্থান এবং তরুণ ভোটারদের সম্পৃক্ততা দলটির পক্ষে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

সংসদে ছয়জন প্রতিনিধির উপস্থিতি শুধু সংখ্যাগত অর্জন নয়; বরং নতুন রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব জানান দেওয়ার সুযোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। তারা যদি ইস্যুভিত্তিক, দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, তবে দলটির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত আরও শক্ত হতে পারে। স্বল্পসময়ের প্রস্তুতিতে এমন ফল অর্জনকে নেতাকর্মীরা ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের ভিত্তি হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

নির্বাচনের সময় থেকে নিষ্ক্রিয় থাকা এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, ‘দলের জন্য আমার শুভকামনা সবসময় থাকবে। ভেতরের মতপার্থক্যের কারণে আমি সক্রিয় নই, তবে সংকটে পাশে থাকব।’

দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রতিষ্ঠা এবং নির্বাচনে অংশ নিয়ে অবস্থান সুসংহত করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেই সংসদে ছয়টি আসন পেয়েছে এনসিপি। এখন প্রধান লক্ষ্য সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কাঠামো আরও মজবুত করা। আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে লড়বে এনসিপি।

সার্বিক বিষয়ে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, গত এক বছরে নানা দেশি-বিদেশি শক্তি এবং সংস্কারবিরোধী গোষ্ঠী এনসিপির পথরোধের চেষ্টা করেছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অপচেষ্টা অব্যাহত থাকতে পারে। এনসিপিকে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে না দিতে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছে। তবে বাধা, বিপত্তি ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই এগিয়ে যেতে হবে। এসব প্রতিকূলতা অতিক্রম করার সক্ষমতা ইতিমধ্যেই অর্জন করেছে এনসিপি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত