নতুন নেতৃত্বের অপেক্ষায় ডিএমপি

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৬, ০৭:৪৭ এএম

নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পুলিশি ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো। পুলিশকে জনবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত করে গড়ে তোলা। এর জন্য সরকার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন বিভিন্ন পদে পরিবর্তনের গুঞ্জনও উঠেছে, ইতিমধ্যে নতুন আইজিপি নিযুক্ত হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলী পারিবারিক কারণ দেখিয়ে অব্যাহতি নিয়েছেন। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন) মো. সরওয়ারকে ভারপ্রাপ্ত ডিএমপি কমিশনারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিবর্তনের এ সময়ে পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘কার অধীনে কাজ করব আগে ঠিক হোক।’

এ পরিস্থিতিতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কনস্টেবল থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর্যন্ত সবাই বদলি-পদোন্নতির জন্য দৌড়াচ্ছেন। অনেকে ডিউটি সেরেই নতুন সরকারের সঙ্গে সখ্য গড়তে তদবিরে লিপ্ত হয়েছেন। সখ্য গড়ার এ দৌড়ে বঞ্চিতরাও আছেন, তবে দেন-দরবারে সুবিধাভোগীরাই এগিয়ে। গত এক সপ্তাহে ডিএমপি সদর দপ্তর, ডিএমপির বিভিন্ন ইউনিট ও থানা ঘুরে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে এমন চিত্রই দেখা গেছে। কারণ, ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে এসআই-কনস্টেবল পদে বড় রদবদলের খবর চাউর হয়েছে।

ডিএমপির একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিএমপিকে নতুন করে সাজাতে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সবাই বদলি ও পদোন্নতির জন্য তদবির করছেন। এলাকার জনপ্রতিনিধি, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে যোগাযোগ করে তদবির চালাচ্ছেন। যদিও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বলেছে, কোনো প্রকার তদবির চলবে না। যোগ্যরা বিবেচিত হবেন। তাদের দিয়েই ডিএমপি সাজানো হবে।

নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরই ডিএমপির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় কে হচ্ছেন নতুন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার। ডিএমপি কমিশনার হিসেবে সম্ভাব্য কিছু নামও উঠে এসেছে। অনেকটাই ভাটা পড়েছে পুলিশের অপারেশনাল কাজে। কারণ, সবাই নতুন ডিএমপি নেতৃত্বের অপেক্ষা করছে। আবার অনেকে শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে যাতায়াত বাড়িয়ে দিয়েছেন। শীর্ষ পদগুলোতে রদবদলের পর বিভিন্ন ইউনিটেও রদবদল হবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুলিশকে ঢেলে সাজাবেন বলেছেন। ইতিমধ্যে পুলিশের নতুন আইজিপি নিযুক্ত হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় দ্রুত ডিএমপি কমিশনারের আসার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। ডিএমপি কমিশনার নতুন পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে অব্যাহতির আবেদন জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট অনেকে মনে করেন, পুলিশের বদলি ও পদোন্নতির বিষয়টি যোগ্যতার নিরিখে দেখা উচিত।

এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘প্রায় দেড় যুগ পর একটি স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকার গঠিত হয়েছে। তাই জনগণের আশা অনেক। সে আশা পূরণে দ্রুত নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন করতে চাই। পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গণতান্ত্রিক সংস্কার করতে চাই।’ পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যুগোপযোগী উন্নয়নে সঠিক পরিকল্পনা দরকার বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

জনঅভিজ্ঞতা বলে, রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর ভিত্তি করেই পুলিশের বদলি ও পদোন্নতি হয়। নতুন সরকার আসায় ইউনিটভিত্তিক রাজনৈতিক বিবেচনা শুরু হয়। পুলিশের রাজনৈতিক ব্যবহার পুরনো কথা। রাজনৈতিক সরকার পুলিশের বিভিন্ন দায়িত্ব বণ্টন করে বলে রাজনৈতিক সমীকরণের আলোচনা ওঠে, আবার যোগ্যতার বদলে রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য বেশি প্রাধান্য পেয়ে থাকে বলেও রাজনৈতিক সমীকরণের আলোচনা সামনে আসে। এর ওপর ভিত্তি করেই নতুন বদলি ও পদোন্নতির তদবির চলছে। তদবিরের জন্য নেতাকর্মীদের আনাগোনাও রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক এসআই দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন সরকারের সময়ে সবাই বিভিন্ন স্থানে বদলি হবে। ভালো কোথাও বদলি হওয়ার জন্য তদবির করছে সবাই। যেখানে গেলে পরিবার-সন্তান নিয়ে ভালোভাবে থাকা যাবে, অতিরিক্ত বিশৃঙ্খলা ছাড়া চাকরি করা যাবে, সেখানে সবাই যেতে চায়। টাকা-পয়সা খরচ করে হলেও।’

ডিএমপির একটি বিশ্বস্ত সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেছে, ডিএমপি কমিশনারের চুক্তি বাতিল করে নতুন একজনকে নিয়োগের জন্য ফাইল পাঠানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। নতুন আইজিপি দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে আলোচনা করে ডিএমপির বাকি চারটি ঊর্ধ্বতন পদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ওই চার পদের ফাইল প্রস্তুত করা হয়েছে উল্লেখ করে সূত্র বলে, ডিএমপি কমিশনারসহ পাঁচটি পদে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত আসছে সরকারের শীর্ষ মহল থেকে।

ডিএমপি কমিশনার হওয়ার আলোচনায় আছেন অতিরিক্ত আইজিপি (লজিস্টিকস অ্যান্ড অ্যাসেট অ্যাকুইজিশন) মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ ও র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ফারুক আহমেদ। তাই অপারেশনাল কাজে তারা সেভাবে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। নতুন নেতৃত্বে আগামীতে ভালো কাজ করার জন্য বিভিন্ন অপারেশন প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। আবার অনেকে নতুন নেতৃত্বের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএমপির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর ডিএমপির অনেক পুলিশের নামে মামলা হয়েছে, কেউ কেউ আত্মগোপনে চলে গেছেন। গণহারে বদলিও হয়েছে। ফলে ডিএমপির কাঠামোতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল। গত ১৭ মাসে ডিএমপি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। সরকার চায় এখন এই ছন্দ ভেঙে না যাক। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বদল হলেও কনস্টেবল, এসআই, এসি, ডিসিদের গুরুত্বপূর্ণ না হলে পরিবর্তন করা উচিত নয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত