ম্যাচ শেষে দর্শকদের কাছে সারি বেঁধে ছুটে গেলেন দলের সব ফুটবলার। গ্যালারিতে থাকা লাল-সবুজের সমর্থকদের ভালোবাসায় সিক্ত হলেন। হাত মেলালেন, অটোগ্রাফের আবদারও মেটালেন কেউ কেউ। আন্তর্জাতিক ফুটবলে বিরল এক দৃশ্য। পরাজিত দলকে এভাবে সম্মান জানাতে, ভালোবাসতে দেখা যায় না সেভাবে। সেই ভালোবাসাটাই মঙ্গলবার আদায় করে নিয়েছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। এশিয়ান কাপের অভিষেকে ৯ বারের শিরোপা জয়ী চীনের চোখে চোখ রেখে লড়েছে পুরোটা সময়। হারের ব্যবধানটা ২-০। প্রথমার্ধের তিন মিনিট বাদে এই ম্যাচ আফঈদা খন্দকারদের স্মরণীয় করে রাখবে বহুদিন। প্রথমার্ধের ৪২ মিনিট পর্যন্ত নিজেদের পোস্ট সুরক্ষিত রাখা, এরপর ছোট্ট দুটি ভুলে দুই গোল হজম। বিরতি থেকে ফিরে চীনকে আগ্রাসী হতে না দেওয়া। অনেক প্রাপ্তি এই ম্যাচে। যা বাংলাদেশকে আরও বড় স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
বিশ্ব র্যাংকিংয়ে ৯৫ ধাপ এগিয়ে চীন। এশিয়ান কাপের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দল, ৯ শিরোপার মালিক। শেষবারও হয়েছে চ্যাম্পিয়ন। সেই চীনকেই ঘাম ঝড়াতে হয়েছে বাংলাদেশের বিপক্ষে জয় পেতে। এটাই তো বড় প্রাপ্তি অনেক প্রতিকূলতায় বেড়ে ওঠা একঝাঁক লড়াকু মেয়েদের।
সিডনির কমব্যাংক স্টেডিয়ামে শুরুর দশ মিনিট চীন ছিল ভয়ংকর আগ্রাসী। শুরুতে চেপে ধরে তারা চেয়েছিল একাধিক গোল আদায় করে নিতে। তবে বাংলাদেশ তা হতে দেয়নি। যদিও শঙ্কা ছিল ম্যাচের আগে থেকেই। শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে প্রকাশিত স্টার্ট লিস্ট দেখে অনেকেরই শঙ্কাটা বড় হয় শুরুর একাদশে পরীক্ষিত গোলকিপার রূপনা চাকমাকে না দেখে। এই আসরের গড় উচ্চতার হিসেবে চীন ১২ দলের সবার ওপরে। সেখানে সবার নিচে বাংলাদেশ। রূপনা এই উচ্চতার কারণেই সুযোগ পাননি একাদশে। তার বদলে অনভিজ্ঞ মিলি আক্তার ভুলের মালা গাঁথবেন, এ রকমটাই ধারণা ছিল। তবে সবার ধারণাকে মিথ্যে প্রমাণ করে বাটলারের আস্থার প্রতিদান পুরো ম্যাচ জুড়েই দিয়েছেন মিলি। অসাধারণ সব সেভে দলকে বড় ব্যবধানে হারের লজ্জা থেকে মুক্তি দেন।
শুরুর চাপ সামলে বাংলাদেশই প্রথম গোলের সেরা সুযোগ তৈরি করে। বড় মঞ্চের তারকাখ্যাত ঋতুপর্ণা চাকমার বাঁ পায়ের জাদুতে ১৪ মিনিটে চীনের গোলের দরজা প্রায় খুলেই গিয়েছিল। কাউন্টার অ্যাটাক থেকে দ্রুত বল নিয়ন্ত্রণে ছুটছিলেন ঋতু ও চীনের উ হাইয়ান। দীর্ঘকায় হাইয়ানকে পেছনে ফেলে বলের নাগাল পেয়ে যান এই উইঙ্গার। প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে বাঁ পায়ের শট নেন, যা পৌঁছে যাচ্ছিল পোস্টে। শেষ মুহূর্তে চীনের গোলকিপার চেন চেন ফিস্ট করে কর্নারের বিনিময়ে দলকে রক্ষা করেন।
ম্যাচের ২৪ মিনিটে চীনের গোল বাতিল হয় ভিএআর প্রযুক্তিতে। বাঁ দিক থেকে জিন জুনের ক্রসে ওয়াং সাংয়ের হেড জাল খুঁজে নিয়েছিল। ভিএআর প্রযুক্তিতে বারবার বিশ্লেষণ করে সেই গোল বাতিলের বাঁশি বাজান থাই রেফারি। এ আসরে অভিষেকের মতো প্রথম ভিএআর প্রযুক্তিতে খেলার সুবিধা পেয়ে যায় বাংলাদেশ। ম্যাচের ৪১ মিনিটে মারিয়া দূর থেকে গড়ানো শট নিয়ে চেয়েছিলেন নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করতে। পোস্ট ঘেঁষে তার শট বাইরে যায়। দুমিনিট পর ডিফেন্ডার কোহাতি কিসকু অসাধারণ ডিফেন্সে দলের পোস্ট সুরক্ষিত রাখেন। তবে ৪৩ মিনিটে আর পারেনি বাংলাদেশ। সতীর্থের বাড়ানো বল ধরে বক্সের বেশ বাইরে থেকে বাঁ পায়ের শট নেন ওয়াং সাং। মিলিকে সুযোগ না দিয়ে সে বল ভাসতে ভাসতে জালে জড়ায়। দীর্ঘ প্রতিরোধ ভেঙে যাওয়ার রেসেই দ্বিতীয় গোল হজম করে বাংলাদেশ। যোগ করা সময়ে সমন্বিত আক্রমণে বারবার বল রক্ষণে বাধা পেয়ে ফিরছিল। এর মধ্যেই ঝ্যাং রুইয়ের গড়ানো শট কোহাতির পায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে গোলের পথ ধরে। গোললাইনে আফঈদা ছিলেন। তবে বাংলাদেশ অধিনায়ক সে বল রুখতে পারেননি। তার পায়ের ফাঁক দিয়ে বল জালে জড়ায়।
বিরতি থেকে ফিরে অবশ্য ছকে বাঁধা ফুটবল খেলেছে বাংলাদেশ। ঘর সামলে তারা চেষ্টা করেছে আক্রমণ গড়ার। ৫৮ মিনিটে আফঈদার ফ্রি-কিকে শামসুন্নাহার জুনিয়র মাথা ছোঁয়ালেও লক্ষ্যে থাকেনি বল। ৬৮ মিনিটে অসাধারণ সেভে চীনের গোল বাড়তে দেননি মিলি। বক্সের ঠিক বাইরে থেকে ঝ্যাং চ্যাংউর ডান পায়ের শট ফিস্ট করে রুখে দেন এই কিপার। ৭৭ মিনিটে বদলি স্বপ্নারানী বক্সের বাইরে থেকে চেষ্টা করেছিলেন। তবে পোস্ট ঘেঁষে তার শট বাইরে যায়।
শেষ দিকে চীন আরও গোলের আশা ছেড়ে দিলে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করেই মাঠ ছাড়তে পারে। যারা সরাসরি বা বোকা বাক্সে ম্যাচ দেখেননি। তারা ম্যাচের পরিসংখ্যান দেখলেও বুঝবেন কতটা লড়াই করেছে বাংলাদেশের মেয়েরা। অসম লড়াইয়ে সেয়ানে সেয়ানে লড়াইয়ে পাল্টে দিতে বল পজেশনে চীনকে প্রায় ছুঁয়েই ফেলেছিল বাংলাদেশ। চীনের পায়ে বল ছিল পুরো ম্যাচে ৫৯ শতাংশ। বাংলাদেশের ৪১। সফল পাস, কর্নার, গোলমুখী শটের হিসাবেও আছে বাংলাদেশের অস্তিত্ব। এমন লড়াইয়ের পর হেরেও তাই ঋতুরা পেয়েছেন মানুষের ভালোবাসা ও অকুণ্ঠ সমর্থন। এটাই সামনের দুই ম্যাচে বড় শক্তি হয়ে উঠবে তাদের। ৬ মার্চ উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ম্যাচ বাংলাদেশের, যারা উজবেকিস্তানকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে এই গ্রুপের প্রথম খেলায়।