উত্থানপতনে চলছে শেয়ারবাজার

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৭:৩৯ এএম

দীর্ঘমেয়াদি আস্থার সংকটে থাকা দেশের শেয়ারবাজারে নতুন ইস্যু যোগ হয়েছে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী ইসরায়েলের যুদ্ধ। এ যেন সিঁদুরে মেঘ দেখছেন বিনিয়োগকারীরা। একদিন উত্থান হলে পরদিন ঢালাও দরপতন হচ্ছে লেনদেনে অংশগ্রহণ করা শেয়ার ও ইউনিটের। গতকাল মঙ্গলবার প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) মোট ৩৯১টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে দাম বেড়েছে ৩১টির, কমেছে ৩৪৯টির এবং অপরিবর্তিত আছে ১১টির। প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স আগের দিন সোমবারের তুলনায় ২০৯ পয়েন্ট হারিয়েছে। তবে সোমবার সূচকটি ৭২ পয়েন্ট যোগ হয়েছিল। এর আগের দিন রবিবার সূচকে ধস নেমেছিল। ওইদিন ১৩৮ পয়েন্ট হারিয়েছিল ডিএসইএক্স।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুদ্ধ যে দেশেই হোক এর প্রভাব বিশে^র সব অঞ্চলে পড়বে। এর আংশিক প্রভাব দেশের শেয়ারবাজারে গত কয়েক দিন লক্ষ করা যাচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকারের দপ্তর বণ্টনকে কেন্দ্র করে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের প্রভাবিত করছে। সরকারি দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে পুঁজিবাজারে গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদলের আশা করছেন তারা। বিশেষ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসই) শীর্ষ কর্তাদের রদবদলের গুঞ্জন ব্যাপকভাবে রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ বর্তমান কমিশনের পরিবর্তন চাচ্ছে বলে জানা গেছে।

কমিশনের পদত্যাগের আলোচনার মধ্যেই গতকাল বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সভাপতিত্বে কমিশন সভা হয়েছে। এর মাধ্যমে কমিশনের পদত্যাগের বিষয়টি আপাতত অনিশ্চিত মনে হচ্ছে। তবে এ তথ্য জোরালো হয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন পদত্যাগের মাধ্যমে। গতকাল দুদক চেয়ারম্যান ছাড়াও সংস্থাটির দুই কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবর আজিজী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদও পদত্যাগ করেছেন।

জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ফলে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছিল। ৮ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। চলতি বছর ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হয়। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মাসরুর রিয়াজকে। কিন্তু এ নিয়োগের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি গ্রুপ তার বিরুদ্ধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সঙ্গে সখ্যের অভিযোগ তোলে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়। বিষয়টি ইস্যু করে মাসরুর রিয়াজের বিষয়ে বিএসইসির কর্মকর্তারাও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে আপত্তি জানান। যদিও পরে সেই আপত্তি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে মাসরুর রিয়াজ বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদানের অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে সাবেক ব্যাংকার রাশেদ মাকসুদকে কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে কমিশনের পদত্যাগের দাবিতে দফায় দফায় আন্দোলন করেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ কোন্দল লেগেই ছিল কমিশনে। কর্মকর্তাদের দ্বন্দ্বের কারণে কয়েকজনকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতিও দেওয়া হয়েছে।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ইরানে হামলার খবরে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস গত রবিবার শেয়ারবাজারে বড় পতন হয়, এর এক দিন পর সোমবার কিছুটা উন্নতি হলেও পরদিন গতকাল ফের ধস নামে লেনদেনে। তবে এদিন পতনের ইস্যু যুদ্ধ নয়, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুনর্গঠন। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে পুঁজিবাজারে পতন ঘটাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) আগের কার্যদিবসের চেয়ে টাকার পরিমাণে লেনদেন কিছুটা বেড়েছে। তবে উভয় পুঁজিবাজারে লেনদেনে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের দাম কমেছে।

ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, গতাকাল ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ২০৮ দশমিক ৯৮ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৩২৫ পয়েন্টে অবস্থান করছে। ডিএসইএস শরিয়াহ সূচক ৩৬ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৬৩ পয়েন্টে এবং ডিএস৩০ সূচক প্রায় ৮৬ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ৫০ পয়েন্টে নেমেছে। আলোচ্য সময়ে ডিএসইতে ৩৯১টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে দাম বেড়েছে ৩১টির, কমেছে ৩৪৯টির এবং অপরিবর্তিত আছে ১১টির। এদিন ডিএসইতে ৮৮৫ কোটি ১২ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৭৭৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।

অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সিএসসিএক্স সূচক আগের দিনের চেয়ে ২৭০ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৯ হাজার ২২৮ পয়েন্টে। সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৪১৪ পয়েন্ট কমে ১৫ হাজার ৮৫ পয়েন্টে, শরিয়াহ সূচক ২৬ পয়েন্ট কমে ৯০১ পয়েন্টে এবং সিএসই ৩০ সূচক প্রায় ৪৭৯ পয়েন্ট কমে ১৩ হাজার ৪৭১ পয়েন্টে অবস্থান করছে।

সিএসইতে ২১৪টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে ৪৫টি কোম্পানির, কমেছে ১৫৩টির এবং অপরিবর্তিত আছে ১৬টির।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত