জুলাই সনদ ও গণভোটের বৈধতা প্রশ্নে হাইকোর্টের রুল

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৭:৪০ এএম

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়ে চিঠি কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল বলে ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল দিয়েছে উচ্চ আদালত। পাশাপাশি গণভোট অধ্যাদেশের ৩ ধারা ও তফসিল সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় কেন তা অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, রুলে তাও জানতে চেয়েছে হাইকোর্ট। এ সংক্রান্ত পৃথক দুটি রিট আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি মো. আনোয়ারুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ এ রুল দেয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইন সচিব, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব, প্রধানন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ সংশ্লিষ্টদের চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলেছে হাইকোর্ট।

গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রীয় সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় গত বছরের ১৭ অক্টোবর রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে ঐকমত্যের রাজনৈতিক দলিল হিসেবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ স্বাক্ষরিত হয়। পাশাপাশি সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের মতামত নিতে গত বছরের ১৩ নভেম্বর গণভোট অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে গণভোট হয়। এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়।

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ এবং গণভোট অধ্যাদেশের ৩ ধারা ও নির্বাচনের তফসিলের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী চৌধুরী মো. রেদোয়ান ই খোদা। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রুলের আরজির পাশাপাশি রুল বিচারাধীন অবস্থায় গণভোট অধ্যাদেশের ৩ ধারা ও তফসিলের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার অন্তর্বর্তী নির্দেশনার আরজি জানান রিটকারী আইনজীবী।

অন্যদিকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্যের শপথের জন্য গত ১৬ ফেব্রুয়ারি দেওয়া চিঠির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত সপ্তাহে একটি রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী গাজী মো. মাহবুব আলম। তিনিও রুলের আরজির পাশাপাশি রুল বিচারাধীন অবস্থায় জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ এবং এর আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যের শপথের ১৬ ফেব্রুয়ারির চিঠির কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে হাইকোর্টের নির্দেশনা চান।

গত সোমবার দুটি রিট আবেদনের ওপর শুনানি শেষে আদেশের জন্য মঙ্গলবার (গতকাল) দিন ধার্য করেছিল হাইকোর্ট। আবেদনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম, সৈয়দ মামুন মাহবুব এবং আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। রিট মামলায় পক্ষভুক্ত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।

অ্যাডভোকেট মামুন মাহবুব সাংবাদিকদের বলেন, হাইকোর্টের এই রুলের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোটের অধ্যাদেশের বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন বিষয় হয়ে গেল। তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল যুক্তি ছিল যে, রাষ্ট্রপতি অধিকারবলে গণভোটের অধ্যাদেশটি করেছেন। আমাদের সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদে বলা আছে রাষ্ট্রপতি এমন কোনো অধ্যাদেশ করতে পারবেন না যে বিষয়বস্তু সংবিধানে নেই। বর্তমান সংবিধানে গণভোটের কোনো বিধান নেই।’ তিনি বলেন, ‘১৯৭২ সালে সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর থেকে প্রেসিডেন্ট অর্ডার বলে কোনো কিছু রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোতে নেই। কাজেই দুটি বিষয় কেন অবৈধ হবে না, এ মর্মে রুল দিয়েছে হাইকোর্ট।’ আগামী ঈদুল ফিতরের পর রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি হবে বলে জানান তিনি।

অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, দুটি ফরমায়েশি রিট পিটিশনের অংশ হিসেবে রুল জারি করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরে সংস্কার কর্মকা- পরিচালনা করার জন্য যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেই উদ্যোগকে রাজনৈতিক মতৈক্যের বাইরে নিয়ে এসে আদালতের সাবজেক্ট ম্যাটার বানানো হলো। অতীতেও রাজনৈতিক সমাধানের যে সব বিষয়কে আদালতে আনা হয়েছে তার কোনোটারই ভাল কিছু আমরা দেখতে পাইনি। শিশির মনির বলেন, ‘এই রিট মামলাগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের একাংশের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা দেখা যাচ্ছে। ফলে আমরা ধরে নিতে পারি সরকার এই সংস্কার প্রস্তাবকে সংসদকে পাশ কাটিয়ে আদালতের মাধ্যমে সমাধান করে এক ধরনের স্থিতাবস্থা বা সুবিধা নেওয়ার জন্য চেষ্টা করছে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত