শিক্ষক সংকটে জটের ঝুঁকি

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৭:৫৬ এএম

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) সমাজকর্ম এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে বর্তমানে ছয়টি ব্যাচের শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতিটি বিভাগে রয়েছেন মাত্র তিনজন করে শিক্ষক। এই তীব্র শিক্ষক সংকটের কারণে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আর শিক্ষকরা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনে হিমশিম খাচ্ছেন। এতে সেশনজটের ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষক স্বল্পতার কারণে নিয়মিত ক্লাস গ্রহণ, পরীক্ষা নেওয়া এবং খাতা মূল্যায়নে ব্যাপক বিলম্ব ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়সূচি অনুসারে পাঠদান সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এ দুই বিভাগের শিক্ষার্থীরা তীব্র সেশনজটের শঙ্কায় ভুগছেন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় কোর্স সমন্বয়, অ্যাসাইনমেন্ট মূল্যায়ন এবং ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিচ্ছে। এতে শিক্ষাজীবনে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষক রয়েছেন পাঁচজন। এর মধ্যে দুজন শিক্ষা ছুটিতে থাকায় গত তিন বছর ধরে তিনজন শিক্ষককে ছয়টি ব্যাচ সামলাতে হচ্ছে। অন্যদিকে সমাজকর্ম বিভাগে গত দুই বছর তিনজন শিক্ষক দিয়েই পাঠদান কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। শুধু এ দুই বিভাগ নয়, পুরো বিশ্ববিদ্যালয়েই তীব্র শিক্ষক সংকট বিরাজ করছে। এ অবস্থায় দুই বছর আগে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির পরও শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ২০২৪ সালের মার্চ ও জুন মাসে দুটি শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে বিভিন্ন বিভাগে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষক পদে ৬০টি শূন্য পদের কথা উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে ৫১টি পদ ছিল প্রভাষকের। তবে অধ্যাপক পদে ২৪ জন শিক্ষকের পদোন্নতির জন্য প্রকাশিত ৫১টি প্রভাষক পদের বিপরীতে গত ৭ জুলাই মাত্র ১০টি পদে পুনঃনিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে তড়িঘড়ি করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু অধ্যাপক পদের পদোন্নতি-সংক্রান্ত ইস্যুতে অডিট আপত্তি দিয়ে নিয়োগ ও পদোন্নতি স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছে ইউজিসি। ফলে এ দুই বিভাগে নতুন করে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী শুভব্রত মণ্ডল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিনজন শিক্ষক দিয়ে আমাদের ছয়টি ব্যাচের শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। এতে একেকজন শিক্ষককে ১০-১২টি কোর্সের ক্লাস নিতে হচ্ছে। ফলে সেমিস্টারগুলোতে যতগুলো ক্লাস নেওয়ার কথা, শিক্ষকরা তা নিতে পারছেন না। এভাবে শিক্ষার গুণগত মান ঠিক রাখা কখনোই সম্ভব নয়। বিভাগে দুজন শিক্ষকের পদ ছাড় হলেও প্রশাসন এখনো নতুন শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দাবি অতিদ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে বিভাগের এ সংকট দূর করার।’

সমাজকর্ম বিভাগের প্রভাষক মোস্তাকিম মিয়া দেশ রূপান্তরকে জানান, মাত্র তিনজন শিক্ষক দিয়ে একটি বিভাগ পরিচালনা করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও চ্যালেঞ্জিং কাজ। একটি সেমিস্টারে একজন শিক্ষককে একাধিক কোর্স পড়াতে হচ্ছে, যা কার্যকর ও মানসম্মত শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। একজন শিক্ষককে ১০-১২টি পর্যন্ত কোর্স নিতে হচ্ছে। ফলে গবেষণায় প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, পাশাপাশি মানসম্মত ও উপযুক্ত কোর্স ম্যাটেরিয়াল প্রস্তুত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। অতিরিক্ত ক্লাস ও ঘন শিডিউলের কারণে যথাযথ প্রস্তুতির সুযোগও সীমিত। শারীরিক ও মানসিক চাপের মধ্যেই দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক ফরহাদ উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে মাত্র তিনজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যেখানে ন্যূনতম ১০ জন শিক্ষক প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকটের বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আমাদের বিভাগের দুটি পদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু অন্য বিভাগে নিয়োগ সম্পন্ন করলেও আমাদের পদ দুটিতে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বর্তমানে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা গ্রহণ ও ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা অ্যাকাডেমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং তীব্র সেশনজটের শঙ্কা দিন দিন বাড়ছে।’

ববি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইউজিসির ফুল কমিশন মিটিংয়ে আমাদের জন্য ২৪টি পদ ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু ঝামেলার কারণে অফিস আদেশ এখনো হাতে পাইনি। তবে আশা করছি দ্রুতই পেয়ে যাব। অফিস আদেশ পেলে এসব বিভাগকে আগে বিবেচনায় রেখেই দ্রুত নিয়োগ সম্পন্ন করা হবে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত