সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত ও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া রোধে চালু হওয়া ‘স্কুল ফিডিং’ কর্মসূচির খাবার নিয়ে শ্রীমঙ্গলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরবরাহ করা বনরুটিতে সুচ ও ব্লেড পাওয়ার অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা। পরপর দুটি ঘটনায় অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার উপজেলার রাজঘাট ইউনিয়নের কেজুরিছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বনরুটির ভেতর দুটি লম্বা সুই পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। এর দুই দিন আগে একই ইউনিয়নের টিপড়াছড়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বনরুটির ভেতর একটি ধারালো ব্লেড পাওয়ার অভিযোগ করে।
কেজুরিছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রীতি শুক্ল বৈদ্য স্কুল থেকে পাওয়া বনরুটি বাড়িতে নিয়ে যায়। ছোট বোনের সঙ্গে ভাগ করে খাওয়ার জন্য প্যাকেটটি খোলার পর রুটির মাঝ বরাবর দুটি সুচ দেখতে পাওয়ার অভিযোগ করেছে তার পরিবার।
প্রীতির বাবা কার্তিক বৈদ্য বলেন, কয়েক দিন আগে পাশের টিপড়াছড়া বিদ্যালয়ে বনরুটিতে ব্লেড পাওয়ার অভিযোগের ঘটনা জানার পর তিনি সন্তানদের রুটি পরীক্ষা করে খেতে বলেছিলেন। বৃহস্পতিবার মেয়ে বনরুটি নিয়ে বাড়িতে এলে তিনি প্যাকেট খুলে রুটির ভেতরে একটি পুরনো ও একটি তুলনামূলক নতুন সুচ দেখতে পান। তিনি বলেন, প্যাকেটটি না খুলে তার মেয়ে নিজে রুটি খেলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন তিনি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বিষয়টি স্থানীয় ইউপি সদস্য বৈশিষ্ট গোয়ালা ও প্রতিবেশীদের জানানো হয়। পরে ইউপি সদস্যসহ স্থানীয় কয়েকজন বনরুটিটি বিদ্যালয়ে নিয়ে গিয়ে শিক্ষকদের কাছে অভিযোগ করেন।
স্থানীয় চা-শ্রমিক রবি বোনার্জি বলেন, তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং প্যাকেট খোলার পর রুটির মধ্যে দুটি সুচ দেখতে পান। পরে বিষয়টি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে জানানো হয়।
শিক্ষার্থীর মা শোভা শুক্ল বৈদ্য বলেন, শিশুদের খাবারের মধ্যে সুচ পাওয়ার ঘটনায় তারা আতঙ্কিত। তার মেয়ে না দেখে সেটি খেয়ে ফেললে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে শাস্তির দাবি জানান তিনি।
রাজঘাট ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য বৈশিষ্ট গোয়ালা বলেন, শিশুদের খাবারে এ ধরনের বস্তু পাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষকদের জানানো হয়েছে এবং ইউএনওকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
কেজুরিছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুরেন্দ্র তাঁতী বলেন, বৃহস্পতিবার এক অভিভাবক ও স্থানীয় ইউপি সদস্য বনরুটিটি বিদ্যালয়ে এনে দেখান। রুটির মাঝ বরাবর দুটি সুচ ছিল বলে তারা জানান। পরে বিষয়টি প্রধান শিক্ষকসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। প্রধান শিক্ষক রমা রানী দেব ছুটিতে রয়েছেন।
এর আগে গত সোমবার একই ইউনিয়নের টিপড়াছড়া চা-বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বনরুটির ভেতর ধারালো ব্লেড পাওয়ার অভিযোগ করে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ইমন। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুধন বুনার্জি বলেন, অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
তবে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির খাবার সরবরাহের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইসলাম ট্রেডার্স অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানের শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি আহমেদ বাবু বলেন, কেজুরিছড়া বিদ্যালয়ের বনরুটি নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তাদের এখনো কেউ অবহিত করেননি আর টিপড়াছড়া বিদ্যালয়ে ব্লেড পাওয়ার অভিযোগটি তদন্ত করে তারা কোনো সত্যতা পাননি।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কেজুরিছড়া বিদ্যালয়ের বনরুটিতে সুচ পাওয়ার বিষয়টি প্রধান শিক্ষক তাকে জানিয়েছেন। ঘটনাটি ইউএনও ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জানানো হয়েছে। লিখিতভাবেও প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হবে। টিপড়াছড়া বিদ্যালয়ে ব্লেড পাওয়ার অভিযোগের বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বলেন, বিষয়টি তিনি অবগত হয়েছেন এবং ঘটনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় পরিচালিত ‘স্কুল ফিডিং’ কর্মসূচিটি শ্রীমঙ্গল ও কুলাউড়া উপজেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি) যৌথভাবে কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করছে। শ্রীমঙ্গল উপজেলা ও পৌরসভার ১৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ২২ হাজার শিক্ষার্থী এ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে।