মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশে জ্বালানি সংকট ও মূল্য বাড়তে পারে এমন গুজবে ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেল কেনার হিড়িক পড়েছে। ট্যাংক পূর্ণ করে তেল নিচ্ছেন অনেকেই। ক্রেতার চাপে কোথাও কোথাও বিক্রি সাময়িক বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটেছে।
ফিলিং স্টেশনের পাশাপাশি তেল ডিপোগুলোতেও গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ তেল বিক্রি হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বলছে, আপাতত বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা নেই। কৃত্রিম সংকট এড়াতে এরই মধ্যে তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে সংস্থাটি।
জ্বালানি তেল নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, বড় ধরনের সংকট না হলে আগামী মাস পর্যন্ত সরবরাহে কোনো সংকট হবে না। এমনকি জুন পর্যন্ত জ্বালানি তেল কেনার প্রস্তুতি রয়েছে তাদের।
বিপিসি সূত্রমতে, বর্তমানে ডিজেল ১০ দিন, অকটেন ২৮ দিন, পেট্রোল ১৩ দিন, ফার্নেস ৯০ দিন ও জেড ফুয়েল ৫২ দিনের মজুদ রয়েছে। ৩০ হাজার ও ২৭ হাজার টন জ্বালানি তেল নিয়ে দুটি জাহাজ চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে এসেছে। আরও জাহাজ আসছে। হরমুজ প্রণালির কারণে সৌদি আরবে দুটি জাহাজ আটকে গিয়েছিল। সেজন্য ইউপ্যাককসহ কয়েকটি কোম্পানিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ফলে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে।
তবে সংস্থাটির একটি সূত্র জানিয়েছে, চুক্তিবদ্ধ কোম্পানিগুলো যুদ্ধ সংকটকে পুঁজি করে প্রিমিয়াম বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
ফিলিং স্টেশনে অস্বাভাবিক ভিড় : গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি তেল বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে অস্বাভাবিক ভিড় দেখা গেছে। মালিবাগ, তেজগাঁও, আসাদগেট, নিউ মার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকার পাম্পে যানবাহনের দীর্ঘ সারি সড়ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। অধিকাংশ চালক ট্যাংক পূর্ণ করে তেল নিচ্ছেন, ফলে কিছু পাম্পে মজুদ দ্রুত কমে গেছে। পাম্পকর্মীরা জানান, অন্যান্য দিনের তুলনায় গাড়ির সংখ্যা অনেক বেশি। অনেক চালক নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল না নিয়ে সরাসরি ফুল ট্যাংক করতে চাইছেন। এতে প্রতিটি গাড়িতে তেল দিতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগছে এবং লাইনের চাপ বাড়ছে।
মালিবাগ মোড়ের ফিলিং স্টেশনে রাইড শেয়ারিং চালক ইকবাল জানান, সাধারণত দিনে দুই থেকে তিনবার অকটেন নেন। কিন্তু লোকজন বলছে দুদিন পর তেল পাওয়া যাবে না। তাই পুরো ট্যাংক ভরেছেন। এই পাম্পের ম্যানেজার নজরুল আলম জানান, সাধারণত তাদের কাছে ২০ থেকে ২৭ হাজার লিটার তেল মজুদ থাকে, কিন্তু অতিরিক্ত চাহিদায় তা দ্রুত কমে গেছে। তাই আপাতত শুধু গাড়িতে তেল দেওয়া হচ্ছে।
প্রাইভেট কারচালক কামাল জানান, গাড়ির মালিক তাকে বেশি করে তেল আনতে বলেছেন। শুনছি সামনে তেলের দাম বাড়তে পারে। তাই আগে থেকেই ট্যাংক ভরে নিচ্ছি। এতে অন্তত কিছুদিন নিশ্চিন্ত থাকা যাবে।
নিউ মার্কেট এলাকার একটি পাম্পের একজন কর্মী জানান, বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত গাড়ির চাপ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দেড় থেকে দুই গুণ বেশি ছিল। মজুদ কমে যাওয়ায় গতকাল বেলা ১০-১১টার পর অনেক পাম্পে তেল বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তেজগাঁওয়ের একটি পাম্পের কর্মী আমিনুল গতকাল দুপুরে জানান, ডিপো থেকে গাড়ি আসছে না। মজুদ কমে গেছে। তাই বিক্রি বন্ধ রেখেছেন।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আতঙ্কজনিত চাহিদা বেড়ে যাওয়াই মূলত এই পরিস্থিতির কারণ। বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, মার্চের ১-৪ তারিখ ডিজেল বিক্রি হয়েছে ৯৫ হাজার টন। যেখানে গত বছর একই সময়ে বিক্রি হয়েছে ৪৫ হাজার টন। অকটেন ও পেট্রোলের বিক্রিও বেড়েছে।
ভিড় ডিপোতেও : নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে গোদনাইল এলাকায় পদ্মা ও মেঘনা অয়েল ডিপোতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই শত শত ট্যাংকলরির দীর্ঘ সারি দেখা যায়। তেল সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া এবং সরবরাহে বিলম্ব হওয়ায় ডিপোর ভেতর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ট্যাংকলরির লাইন নারায়ণগঞ্জ-শিমরাইল সড়কে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। দুপুরের পর সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হলেও সড়কে তীব্র যানজট দেখা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় পেট্রোল পাম্প মালিক ও এজেন্টরা বেশি করে তেল সংগ্রহ করতে লরি নিয়ে ডিপোতে ভিড় করছেন। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সংকট হতে পারে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ায় তেলের চাহিদাও বেড়ে গেছে বলে মনে করছেন তারা।
গোদনাইলের মেঘনা অয়েল ডিপোর ব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী পাম্প মালিকদের ২০ শতাংশ এবং এজেন্টদের ৫০ শতাংশ কম তেল দিতে হচ্ছে। ডিপোতে পর্যাপ্ত তেল মজুদ রয়েছে, সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই। একই এলাকার পদ্মা অয়েল ডিপোর ব্যবস্থাপক আমিনুল হকও বলেন, ডিপোতে তেলের মজুদ স্বাভাবিক রয়েছে।