স্বস্তির কেনাকাটায় জমজমাট প্রস্তুতি

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৬, ০৮:১২ এএম

রমজানের প্রথম সপ্তাহ পেরোতেই রাজধানীর চেহারা বদলাতে শুরু করেছে। ইবাদত ও সংযমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উৎসবের প্রস্তুতির ব্যস্ততা। সন্ধ্যা নামলেই ঝলমল করে উঠছে বিপণিবিতান, ফুটপাত ও অলিগলি। দরদামের শব্দ, নতুন পোশাকের গন্ধ, হাতে হাতে শপিংব্যাগ সব মিলিয়ে শহর যেন ঈদের আগমনী বার্তা ঘোষণা করছে।

তবে এবারের ঈদবাজারে শুধু উৎসবের উচ্ছ্বাসই নয়, চোখে পড়ছে আরেকটি বড় পরিবর্তন স্থিতিশীলতার অনুভূতি। দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা শঙ্কার পর এবার তুলনামূলক শান্ত পরিবেশে পরিবার নিয়ে বের হচ্ছেন নগরবাসী। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরে আসায় ঈদের কেনাকাটা হচ্ছে স্বস্তির সঙ্গে।

রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী নিউ মার্কেট এলাকায় বিকেল গড়াতেই ভিড় বাড়তে থাকে। ইফতারের পর দোকানগুলো যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। ব্যবসায়ী সমিতির এক নেতা বলেন, ‘গত কয়েক বছর মানুষ সন্ধ্যার পর বের হতে দ্বিধা করত। এবার পরিবার নিয়ে আসছে, সময় নিয়ে কেনাকাটা করছে। এটা বাজারের জন্য বড় ইতিবাচক সংকেত।’

মিরপুর থেকে পরিবার নিয়ে এসেছেন চঞ্চল ও অনামিকা। দুই সন্তানের পোশাক কিনতেই বাজেটের বড় অংশ শেষ হয়ে গেছে। চঞ্চল বলেন, ‘বাচ্চাদের জন্য কিনলেই শান্তি লাগে। নিজেদের জন্য খুব বেশি খরচ করব না। সবকিছু হিসাব করে করতে হয়।’

নিম্নআয়ের মানুষদের একটি অংশ এখনো অপেক্ষায় রয়েছে বেতন বা ঈদ বোনাস হাতে পাওয়ার পরই তাদের কেনাকাটা জমবে। রোজার মাঝামাঝি থেকে শেষ দশকে তাদের উপস্থিতি বাড়বে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। কবির হোসেন নামের এক ক্রেতা বলেন, ‘আমার বোনাস এখনো হাতে আসেনি। তাই পুরো পরিবারের জন্য সবকিছু একসঙ্গে কিনতে পারছি না। বাচ্চাদের জন্য কয়েকটা জামা আর সামান্য দরকারি জিনিসই এই মুহূর্তে যথেষ্ট। দাম ও মান দুটোই দেখতে হচ্ছে। তবে ঈদে পরিবারের জন্য নতুন পোশাক কিনতে পারাটা আনন্দের অন্যরকম অনুভূতি দেয়।’

কেনাকাটার জন্য অনেকের পছন্দ বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ, নিরাপত্তা ও এক ছাদের নিচে বিভিন্ন ব্র্যান্ড পরিবারগুলোর কাছে এটা স্বস্তির জায়গা। অন্যদিকে যমুনা ফিউচার পার্কেও ইফতার-পরবর্তী সময়ে উপচেপড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। তবে বড় শপিংমলে পছন্দ দেখে শেষ পর্যন্ত অনেকে ফিরে যাচ্ছেন সাশ্রয়ী বিকল্পে পুরান ঢাকার চাঁদনি চক বা গুলিস্তানের ফুটপাতের দোকানে। গুলিস্তানের এক বিক্রেতা বলেন, ‘ক্রেতারা আগে ব্র্যান্ড দেখে। পরে আমাদের কাছে এসে ডিজাইন মিললে কিনে নেয়। দামই এখন সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর।’

বাজার ঘুরে দেখা যায়, নারীদের থ্রি-পিস বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার টাকার মধ্যে। দেশীয় কটন ও লনের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। জমকালো কাজের পোশাকের দাম তুলনামূলক বেশি হলেও মাঝারি দামের পণ্যই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে।

শাড়ির বাজারেও দামের বৈচিত্র্য দেখা যায়। সাধারণ শাড়ি মিলছে ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৮-১০ হাজার টাকার মধ্যে; কাপড় ও কারুকাজের মান অনুযায়ী দাম বাড়ছে।

পুরুষদের পাঞ্জাবির ক্ষেত্রে সাধারণ কটন ও হালকা এমব্রয়ডারির পাঞ্জাবিই বেশি জনপ্রিয়। মূল দামের পরিসর ১ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে।

শিশুদের পোশাকের বাজার সবচেয়ে প্রাণবন্ত। ফ্রক, লেহেঙ্গা, পাঞ্জাবি-পায়জামা সেট ৮০০ থেকে ২,৫০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। মেয়েদের পাকিস্তানি ফারসি ড্রেস ও ছেলেদের রঙিন পাঞ্জাবির চাহিদা চোখে পড়ার মতো।

ক্লাস ফাইভের শিক্ষার্থী নুসরাত বলে, ‘তিনটা জামা কিনেছি। এখন ম্যাচিং জুতা আর ব্যাগ কিনব।’ 

শিশুদের এমন উচ্ছ্বাসের ভেতরেই যেন ঈদের প্রকৃত আনন্দ লুকিয়ে আছে। তাই ঈদবাজার কেবল উৎসবের প্রস্তুতি নয় এটি শহরের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মানসিকতার প্রতিফলন; যেখানে প্রতিটি পরিবারের গল্প আলাদা, কিন্তু আনন্দের সুর একই।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত