‘দায়সারা’ কাজ করেই অর্ধকোটি টাকা নয়ছয়

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২৬, ১২:৩৮ এএম

গাইবান্ধায় সওজ বিভাগের দুইটি লেবার শেড সংস্কার কাজে প্রায় অর্ধকোটি টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ উঠেছে। কাগজ-কলমে কাজ সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে দায়সারাভাবে কাজ করা হয়েছে। সওজ বিভাগের প্রকৌশলী ও ঠিকাদার নিজেদের মধ্যে যোগসাজশ করে এই টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটিয়েছেন।

তথ্য বাতায়ন অধিকার আইনে দেওয়া তথ্যে জানা যায়, গাইবান্ধা সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের দুটি লেবারশেড (শ্রমিকদের থাকার ঘর) রয়েছে। একটি গাইবান্ধা জেলা শহরের শাপলাপাড়া এলাকায় এবং আরেকটি পলাশবাড়ী উপজেলা সদরে অবস্থিত। শেড দুইটি সংস্কারের জন্য চারটি অর্থবছরে চার দফায় ৪৯ লাখ ৯১ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরমধ্যে শাপলাপাড়া এলাকার শেড সংস্কারের জন্য মোট ৩২ লাখ ৪১ হাজার টাকা বরাদ্দ আসে। এরমধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে ১০ লাখ টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সাড়ে ৭ লাখ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫ লাখ ৪১ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

পলাশবাড়ী উপজেলা সদরের শেডের জন্য বরাদ্দ আসে মোট সাড়ে ১৭ লাখ টাকা। এরমধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১০ লাখ টাকা এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে সাড়ে ৭ লাখ টাকা। লেবারশেড দুইটি সংস্কারের দায়িত্ব পান গাইবান্ধার ঠিকাদার মোস্তাক আহমেদ।

তথ্য বাতায়নে আরও বলা হয়, শাপলাপাড়া এলাকার শেডে সাতজন এবং পলাশবাড়ীর শেডে ছয়জন কর্মচারী বসবাস করেন। শাপলাপাড়া এলাকার শেডে বসবাসকারীদের কাছ থেকে ২০২৫ সালের মে ও জুন মাসের ভাড়া বাবদ ১১ হাজার ৬৫০ টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পলাশবাড়ীর শেডে বসবাসকারীদের কাছ থেকে ৯ হাজার টাকা আদায় করা হয়।

গাইবান্ধা সওজ বিভাগের দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তথ্য প্রদানের মন্তব্যের ঘরে লেখা, শাপলাপাড়া এলাকার শেডসমূহ বসবাসের অনুপোযোগী ছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আংশিক মেরামতের কারণে ২০২৫ সালের মে মাসে বসবাসের উপযোগী হয়। কিন্তু এই শেড সংস্কারের জন্য ২০২০-২১ অর্থবছরে ১০ লাখ টাকা এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে সাড়ে ৭ লাখ বরাদ্দ দেওয়া হয়। একই মন্তব্য করা হয় পলাশবাড়ী সদরের শেডের ক্ষেত্রেও। এই শেড সংস্কারের জন্য ২০২১-২২ অর্থবছরে ১০ লাখ টাকা এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে সাড়ে ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

গাইবান্ধা নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক বিশিষ্ট আইনজীবী সিরাজুল ইসলাম বলেন, লুটপাটের জন্যই প্রকৌশলী ও ঠিকাদার যোগসাজশ করে সরকারি আবাসিক ভবন সংস্কারের নামে তদবির করে বরাদ্দ আনেন। এসব অভিযোগ সুষ্ঠু তদন্ত করে লুটপাটে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা উচিত। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেন ঠিকাদার মোস্তাক আহমেদ। তিনি মুঠোফোনে বলেন, ‘কাজ না করে বিল তোলা যায় না। কাজ হয়েছে মর্মে স্বাক্ষর নেওয়া আছে। কাজ বুঝে দিয়েই বিল পেয়েছি।’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, গাইবান্ধা জেলা শহরের শাপলাপাড়া এলাকা থেকে খানকা শরিফস্থ খাদ্যগুদামে যাতায়াত সড়ক ঘেঁষে লেবারশেড। ভেতরে ঢুকতেই ফাঁকা মাঠ। মাঠের বাঁয়ে একটি পুকুর। মাঠের চারদিকে চারটি আধাপাকা টিনশেড ঘর। ঘরগুলো অনেকটাই জরাজীর্ণ। কোনোটির প্লাস্টার উঠে যাচ্ছে, কোনটির দেয়ালের রং উঠে গেছে। ঘরগুলোর দরজা-জানালা নড়বড়ে। লেবারশেড ঘুরে মেরামত কাজের কোনো নমুনা দেখা যায়নি।

শাহাদত হোসেন নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘এসব ভবনে তিন-চার বছরের মধ্যে কাজ করতে দেখিনি। শুনেছি একই ভবন মেরামতের জন্য প্রতিবছর লাখ টাকা বরাদ্দ আনা হয়। কিন্তু মেরামত করতে দেখি না।’

অর্থ নয়ছয় ও লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করেন গাইবান্ধা সওজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিয়াস কুমার সেন। তিনি মুঠোফোনে বলেন, ‘আমি আসার আগে কি কাজ হয়েছে, তা আমি বলতে পারব না। এ সব কাজ হলো এমন কাজ যে, এক বছর বা দুই বছর পার হলে কি কাজ হয়েছে, দেখে তা বোঝা যায় না।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত