প্রতিরোধ গড়েও বড় হার

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২৬, ০১:৪০ এএম

উত্তর কোরিয়ার কাছে বড় হারে অনেকেই হয়তো বাংলাদেশের পারফরম্যান্সকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। তবে নির্জলা সত্য হলো, এটাই হওয়ার কথা। সিডনির কমব্যাংক স্টেডিয়ামে শুরুতে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার পর যোগ করা সময়ে অধিনায়ক আফঈদা খন্দকারের জোড়া ভুলে জোড়া গোল হজম। তাতেই তালটা কেটে যায়। পরে কোরিয়ান আক্রমণের কাছে পুরোপুরি ধরাশায়ী হয়ে হার ৫-০ ব্যবধানে। টানা দুই হারে গ্রুপ রানার্স-আপ হয়ে এশিয়ান কাপের কোয়ার্টার ফাইনালের আশা শেষ। এই শেষ থেকেই অবশ্য বাংলাদেশের শুরু আসল অভিযান। পার্থে সোমবার উজবেকিস্তানকে হারালে মিলতে পারে শেষ আটের টিকিট। সেই স্বপ্ন সঙ্গী করে আজ সিডনি থেকে পার্থে উড়াল দেবে বাংলাদেশ দল।

চীনের বিপক্ষে ভয়ডরহীন ফুটবলের পর থেকেই উড়ছিল বাংলাদেশের মেয়েরা। ২-০ গোলে হারলেও লড়াই করে খেলার আত্মবিশ্বাসটা কুড়িয়ে নিয়ে তারা চেয়েছিল উত্তর কোরিয়াকেও ভড়কে দিতে। তবে এই দলটি এখানে এসেছে শিরোপায় চোখ রেখে। টানা তিন আসর নাম প্রত্যাহারের পর প্রত্যাবর্তন রাঙাতে খেলছে ছকে বাঁধা ফুটবল। শারীরিক গঠন, গতি, বল নিয়ন্ত্রণ, নিঁখুত ফিনিশিং সব কিছুর মিশেলে এই কোরিয়াকে রোখার সাধ্যি নেই বাংলাদেশের। সে পর্যায়টা ছুঁতে ঢের বাকি তাদের।

চীনের বিপক্ষে লড়াকু বাংলাদেশকে দেখে অবাক হয়েছিলেন কোরিয়ার কোচ রি সং হো। সেই ম্যাচ কাটাছেঁড়া করে বাংলাদেশের শক্তি ও দুর্বলতার দিকগুলো ঠিকই বের করে ফেলেন অভিজ্ঞ কোচ। তাই তো এই ম্যাচে শত চেষ্টা করেও বাংলাদেশের মেয়েরা তাদের সহজাত ফুটবলটা খেলতে পারেনি। পিটার বাটলার সবসময় চেয়েছেন আক্রমণকেই রক্ষণের বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে। কোরিয়া এমন এক প্রতিপক্ষ, যাদের বিপক্ষে চাইলেও সেটা করাতে পারেননি বাটলার। তাই তো ম্যাচ শেষে দলের হার বা পারফরম্যান্সে একেবারেই হতাশ হননি ব্রিটিশ কোচ। কোরিয়া ও বাংলাদেশের ব্যবধান তুলে ধরে বারবার বাস্তবতা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন কোচ।

তারপরও ম্যাচের গল্পটা অন্যরকম হতে পারত। অতীতে এতটা উঁচু র‌্যাংকিংয়ের দলের বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা ছিল না। তারপরও কোরিয়াকে পাক্কা ৪৫ মিনিট গোল করতে না দেওয়ার একটা কৃতিত্ব পাবেই মেয়েরা। প্রথমার্ধের প্রায় পুরোটা সময় কোরিয়দের বারবার হতাশ করেছে বাংলাদেশের গোলকিপার মিলি আক্তার ও রক্ষণভাগ। তিনবার বল জালে জড়ালেও ভিএআর প্রযুক্তিতে দুবার এবং অফসাইড ফাঁদ বাঁচিয়ে দেয় বাংলাদেশকে।

উজবেকদের ৩-০ ব্যবধানে হারানো উত্তর কোরিয়া শুরু থেকেই চাপ প্রয়োগ করে খেলতে থাকে। তবে এ ম্যাচেও নিজের জাত চিনিয়েছেন মিলি আক্তার। ম্যাচের পঞ্চম মিনিটে তাকে একা পেয়ে যান হান জিন হং। তার শট ডান দিকে ঝাঁপিয়ে রুখে দেন মিলি। সেই মুহূর্তেই অবশ্য বেঁজে ওঠে অফসাইডের বাঁশি।

এর পর মুহূর্তে ডান দিক থেকে আসা ক্রস ক্লিয়ার করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন কোহাতি কিসকু। তবে লাফিয়ে গ্লাভসে জমা করেন মিলি। ১৪ মিনিটে বাংলাদেশের পোস্টে প্রথম বল জমা করেছিল কোরিয়া।

কিম কিয়ং ইয়ংয়ের শট নবীরন খাতুনের পায়ের ফাঁক দিয়ে জালে জড়ালে গোল উদযাপন করে কোরিয়া। তবে ভিএআর প্রযুক্তিতে দেখা যায় আফঈদার ট্যাকলে ফেরা বল আগেই মিয়ং ইউ জংয়ের হাতে লেগেছিল। ২৬ মিনিটে কর্নার থেকে বল জটলায় আসলে কিম কিয়ং ইয়ংয়ের হেড এক হাতের থাবায় রুখে দিয়েছিলেন মিলি। তবে বল তার গ্লাভসের নিচে থাকতেই হান জিন হং চতুরতার সঙ্গে শট গোল করেন। পরে অবশ্য এই গোলই নস্যাৎ করে দেয় ভিএআর। চার মিনিট পর কিম কিয়ং ইয়ংয়ের শট জালে জড়ালেও সেটি বাতিল হয় অফসাইডে। ৩৮ মিনিটে ভাগ্য সহায় হওয়ায় সে যাত্রায়ও বেঁচে গিয়েছিল বাংলাদেশ। কিম কিয়ং ইয়ংয়ের হেড ক্রসবার কাঁপিয়ে ফিরে আসে। ওই হেডের সময় কোহাতির সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে যান ইয়ং। ভিএআর অবশ্য কোরিয়ার পেনাল্টির দাবি বাতিল করে দেয়। প্রথমার্ধের নির্ধারিত ৪৫ মিনিট শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনটি পরিবর্তন করেছিলেন পিটার বাটলার। চীনের ম্যাচের মতো শেষ মুহূর্তের বিপর্যয় রুখতেই তিনি দুই ফরোয়ার্ড শামসুন্নাহার জুনিয়র ও তহুরা এবং ডিফেন্ডার আইরিনকে তুলে স্বপ্না রানী, আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী ও উমহেলা মারমাকে নামান। তবে শেষ মুহূর্তের বিপর্যয় রুখতে পারেনি বাংলাদেশ। অন্তত প্রথম দুই গোলের দায় এড়াতে পারবেন না অধিনায়ক আফঈদা। বক্সের ভেতর হং সং ওকেকে পেছন থেকে জার্সি ধরে টান দিয়ে ফেলে দেন আফঈদা। পেনাল্টি থেকে মিলিকে পরাস্ত করেন মিয়ং ইউ জং। যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে কিম কিয়ং ইয়ংকে দুরূহ কোণ থেকে শট নিতে সুযোগ করে দেন আফঈদা, গায়ে গায়ে লেগে থেকেও শট নেওয়ার সময় কোনো চ্যালেঞ্জই জানাননি বাংলাদেশ কাপ্তান, বল দূরের পোস্টে জড়িয়ে যায়। দ্বিতীয়ার্ধেও সেভাবে খেলা নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি বাংলাদেশ। মাঝমাঠের দুই অস্ত্র মনিকা চাকমা ও মারিয়া মা-া পেরে ওঠেননি চৌকস কোরিয়ানদের সঙ্গে। পরে স্বপ্না রানী এসেও কিছুই করতে পারেননি। আর মধ্যমাঠ দখলে না থাকায় ওপরে খেলা ঋতুপর্ণারা সেভাবে বলে জোগানই পাননি, তাই একটিবারের জন্যও এ ম্যাচে প্রতিপক্ষের লক্ষ্যে শট করতে পারেনি বাংলাদেশ। এরপর অল্প সময়ে ব্যবধানে আরও দুই গোল হজম করে বাংলাদেশ। ৬২ মিনিটে হং সং ওকে’কে আটকাতে পোস্ট ছেড়ে বের হয়ে এসেছিলেন মিলি, আলতো চিপে সেই বল গোল মুখে বাড়ান ওকে। বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারান কোহাতি। ফাঁকা পোস্টে আলতো টোকায় বল জমা করেন চায়ে উন ইয়ং। পরের মিনিটে কিম কিয়ং ইয়ংয়ের জোরালো শট ঝাঁপিয়ে পড়ার পরও আটকাতে পারেননি মিলি। এরপরও থেমে থাকেনি উত্তর কোরিয়া। ম্যাচের যোগ করা সময়ে কিম হায়ে ইয়ং গোল করে বাংলাদেশকে ৫-০ গোলের হার নিশ্চিত করেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত