ব্যবসায়ীদের সংযমী হতে হবে

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২৬, ০৯:২২ এএম

আত্মিক উৎকর্ষ সাধনের মাস রমজান। এ মাসটি মুমিনের জীবনে আসে আত্মসংযম ও সহমর্মিতার বার্তা নিয়ে। তবে আমাদের প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় রমজান আসার সঙ্গে সঙ্গেই এক ধরনের কৃত্রিম অস্থিরতা চারপাশ ঘিরে ধরে। বিশেষ করে, বাজারের দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং একশ্রেণির ব্যবসায়ীর অধিক মুনাফা লাভের লিপ্সায় ভোগান্তি নেমে আসে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো মানুষের কষ্ট লাঘব করা এবং হালাল উপায়ে ব্যবসা পরিচালনা করা। মজুদদারি বা মানুষকে জিম্মি করে সম্পদ বৃদ্ধির চেষ্টা পরকালে শুধু লাঞ্ছনাই বয়ে আনবে। আর সংযমের শিক্ষা শুধু পেটে নয়, বরং আমাদের মনন ও কর্মেও প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। ভোগবিলাসের ঊর্ধ্বে উঠে স্রষ্টার স্মরণে ডুবে থাকাই হলো এই মাসের প্রকৃত সার্থকতা।

বিশ্বের অন্য মুসলিম দেশগুলোতে দেখা যায়, ব্যবসায়ীরা ১১ মাস ব্যবসা করলেও রমজান মাসে মানুষের সেবা করেন। পক্ষান্তরে আমাদের দেশে দেখা যায় পুরো ভিন্ন চিত্র। এ মাসে নিত্যপণ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার ফলে একশ্রেণির মজুদদার, মুনাফাখোর, অসাধু ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার আশায় পণ্য মজুদ রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারমূল্য বাড়িয়ে দেয়। সংযমের মাসে তারা হয়ে ওঠে অসংযমী। এজন্যই ইসলাম মানুষের অযাচিত হস্তক্ষেপ থেকে বাজারব্যবস্থাকে রক্ষার জন্য মজুদদারি, অত্যধিক মুনাফাখোরি ও প্রতারণা নিষিদ্ধ করেছে। অধিক মুনাফার আশায় পণ্য মজুদ করাকে ইসলাম অবৈধ ঘোষণা করেছে। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ৪০ দিন খাদ্যদ্রব্য মূল্যবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে গুদামজাত করে রাখবে সে আল্লাহর হেফাজত হতে বেরিয়ে যাবে। আর আল্লাহ তার ওপর থেকে তার দায়িত্ব তুলে নেবেন।’ (মুসনাদে আহমাদ ৪৮৮০)

সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে সম্পদশালী হয়ে গেলেও কোনো লাভ নেই। এ সম্পদে তার কোনো বরকত হবে না। বরং দুনিয়াতেই এ সম্পদ তার জন্য অভিশাপ হবে। নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘কেউ যদি খাদ্য গুদামজাতের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, আল্লাহতায়ালা তাকে দুরারোগ্য ব্যাধি ও দারিদ্র্য দ্বারা শাস্তি দেবেন।’ (ইবনে মাজাহ ২১৫৫)

মজুদদারি না করে সৎ নিয়তে ব্যবসা করা ইবাদত। এমন ব্যক্তির উপার্জনে আল্লাহ বরকত দান করেন। তাকে অপ্রত্যাশিত রিজিক দেন। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘খাঁটি ব্যবসায়ী রিজিকপ্রাপ্ত হয় আর পণ্য মজুদকারী অভিশপ্ত হয়।’ (ইবনে মাজাহ ২১৫৩)

এ কারণে মুসলিম ব্যবসায়ীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো, রমজানে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা। মানুষ কষ্ট পায় যেসব কাজের দ্বারা, সেসব থেকে বিরত থাকা।

আরেকটি বিষয় হলো, বাজার স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি ভোক্তাদেরও এ বিষয়ে দায়িত্ব রয়েছে। সবার উচিত রমজানে কেনাকাটায় মিতব্যয়ী হওয়া এবং মাত্রাতিরিক্ত দ্রব্যসামগ্রী না কেনা। রমজান আসার আগে থেকেই একশ্রেণির মানুষ কেনাকাটার পেছনে বেশি সময় ব্যয় করতে থাকে। আর রমজানের শেষদিকে তো হাট-বাজার ও মার্কেটগুলো থাকে লোকে-লোকারণ্য। নামাজ-রোজা বাদ দিয়ে চলে কেনাকাটা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, রমজান ও ঈদ আমাদের সামনে আসে শুধু কেনাকাটার জন্যই।

রমজানের বাজার-সদাই ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রমজান শুরুর আগেই শেষ করা উচিত। যেসব বাজার ফ্রিজে রেখে দেওয়া যায়, সেগুলো রমজানের আগেই কিনে ফ্রিজে রেখে দেওয়া। নতুন নতুন জামাকাপড়, প্রসাধনী এবং বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার পেছনে পড়ে ইবাদতের সময় নষ্ট না করা।

রমজান ইবাদতের মাস, কেনাকাটার মাস নয়। কেনাকাটা করতে গিয়ে যেন ইবাদতের মহাসুযোগ হাতছাড়া না হয়ে যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। রমজানের শেষ দশকে রয়েছে লাইলাতুল কদরের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাত। রয়েছে ইতিকাফের মতো বরকতময় ইবাদত। এসব বাদ দিয়ে মার্কেটে মার্কেটে ঘুরে বেড়ানো ও কেনাকাটায় সময় ব্যয় করা কাম্য নয়।

দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, রমজান যত বাড়তে থাকে আমাদের ইবাদত-বন্দেগির পরিমাণ তত কমতে থাকে। রমজানের প্রথমদিকে মসজিদে যে পরিমাণ মুসল্লি পাওয়া যায়, রমজানের শেষদিকে তা আর পাওয়া না। এ সময় দেখা যায়, মানুষ নামাজের সময় নামাজ বাদ দিয়ে কেনাকাটা ও দুনিয়াবি কাজকর্মে মশগুল থাকে। অনেকে কেনাকাটা করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে রোজাও ছেড়ে দেয়, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ মুসলিম কাউন্সিল

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত