যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করে গত শনিবার। জবাবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি, দূতাবাস এবং কনস্যুলেটে হামলা করেছে ইরান। এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ রয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান রপ্তানি পণ্য জ্বালানি তেলের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তে শুরু করেছে জিনিসপত্রের দাম। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের বাজারে। এ পরিস্থিতির সমাধানে দ্রুত বিকল্প বাজার থেকে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
অন্যদিকে ইরানের ড্রোন হামলার পর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) উৎপাদন স্থগিত করেছে কাতার। ফলে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলো এই পরিস্থিতির বড় ভুক্তভোগী হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে গত মাসে (৯ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির আওতায় গ্যাস আমদানির মাধ্যমে দেশের জ্বালানি সংকটের নির্ভরযোগ্য সমাধান হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
আশঙ্কাজনকভাবে এ যুদ্ধ সীমিত না হয়ে ক্রমে ছড়িয়ে পড়ছে। গত বুধবার শ্রীলঙ্কার কাছে সাবমেরিন থেকে চালানো যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ সাগরে তলিয়ে গেছে। অন্যদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে তাদের নৌবাহিনী উত্তর উপসাগরে একটি মার্কিন ট্যাংকারে আঘাত হেনেছে। আইআরজিসি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের সমর্থনকারী ইউরোপীয় দেশগুলোর সামরিক-বাণিজ্যিক জাহাজকে এই পথে চলাচল করতে দেওয়া হবে না। আইআরজিসি বলেছে, ‘এ ধরনের কোনো জাহাজ দেখা গেলে অবশ্যই তা লক্ষ করে আঘাত হানা হবে।’
আইআরজিসি যুদ্ধের শুরুর দিকে জানিয়েছিল, আন্তর্জাতিক আইন ও প্রস্তাবের ভিত্তিতে যুদ্ধের সময়ে হরমুজ প্রণালিতে যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার ইরানের রয়েছে। ফলে প্রণালিটিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ড্রোনাল ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র সমরিক সহায়তায় জাহাজ চলাচলের ঘোষণা দিয়েছেন। প্রয়োজনে বীমা কোম্পানির দায়ভার যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন বহন করবে বলেও নিশ্চয়তা দিয়েছেন তিনি। এরপরও হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহনের লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন দি ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির বিষয়ে আগামী সপ্তাহে একটি মূল্যায়ন সভা ডাকা হবে। যেখানে আমদানি-রপ্তানি খাত-সংশ্লিষ্টরা থাকবেন এবং করনীয় নিয়ে আলাপ হবে। এ ছাড়া যুদ্ধের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে যেসব চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, সেসব বিষয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
গতকাল এফবিসিসিআইয়ের এক অফিস আদেশে এফবিসিসিআই কার্যালয়ে বৈদ্যুতিক বা ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার সীমিত রাখার জন্য বলা হয়েছে। প্রয়োজন ছাড়া অফিস কক্ষের লাইট, এয়ার কন্ডিশনার, কম্পিউটারসহ অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যাবে না। এসব যন্ত্রাংশ সীমিত করার নির্দেশসহ চারটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা জারি করেছে সংগঠনটি। তবে সংগঠনটির সদস্যদের এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
আদেশে বলা হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাতজনিত কারণে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তেল, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে এফবিসিসিআই কার্যালয়ে বৈদ্যুতিক বা ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার সীমিত রাখার জন্য বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সমস্যা ছাড়া তো যুদ্ধ হয় না। যুদ্ধ যেখানেই হোক, তার প্রভাব সারা বিশ্বে পড়বে। আমাদের পণ্য (তৈরি পোশাক) পরিবহনে ওই অঞ্চল ব্যবহার না হলেও, সেখান থেকে তো জ্বালানি আসে। আর তার মাধ্যমে কারখানা চলে। এখন জ্বালানি সংকট তৈরি হলে, উৎপাদন ব্যাহত হবে। সময়মতো রপ্তানি করতে পারব না। আর রপ্তানি না হলে বৈদেশিক আয় কমে যাবে। তবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ক্রেতাদের সঙ্গে আমাদের সবসময় যোগাযোগ রয়েছে। এখন পর্যন্ত যেসব ক্রয়-আদেশ রয়েছে, সেসব সময়মতো আমরা পৌঁছাতে পারব। তবে, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে জ্বালানি সংকট তৈরি হবে। সমাধানে বিকল্প ব্যবস্থা করতে না পারলে, রপ্তানি খাতের সঙ্গে অন্যান্য বেসরকারি খাতে চরম বিপর্যয় নেমে আসবে।’
তিনি বলেন, ‘সরকারের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে, যত দ্রুত সম্ভব বিকল্প বাজার থেকে জ্বালানির ব্যবস্থা করা। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের জ্বালানি সরবরাহের জন্য আগ্রহ দেখিয়েছে। তাদের কাছ থেকে অথবা অন্য কোনো উৎস থেকে অর্থাৎ যেখান থেকেই হোক, পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হলে যেকোনো উপায়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে।’
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রথমদিকে মনে হয়েছিল, আগের বছরের মতো (২০২৫-এর জুলাই ইসরায়েল-ইরানা সংঘাত) হয়তো যুদ্ধটা স্বল্পমেয়াদি হতে পারে। তবে ইরানের শীর্ষ নেতাদের নিহতের ঘটনায় যুদ্ধ ভিন্ন মোড় নিতে শুরু করেছে। বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে ইরানের আক্রমণ ও হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণায় বিশ্বব্যাপী একটি নেতিবাচক বার্তা পৌঁছে গেছে। যুদ্ধের মেয়াদ কেমন হবে তা বলা মুশকিল। তবে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের মতো বছরের পর বছর এ যুদ্ধ চলবে বলে মনে হচ্ছে না। যাই হোক, এ যুদ্ধ এক মাসের মতো দীর্ঘায়িত হলে আমাদের মতো অনেক দুর্বল অর্থনীতির দেশে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। জ্বালানি সংকট বেশি হবে। অন্যান্য খাতেও সমস্যা তৈরি হবে।’
তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে, রোজার পরই জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সংকটের কারণে বিদ্যুৎ সমস্যা দেখা দেবে। লোডশেডিং হবে। সেজন্য সরকারের উচিত হবে, জ্বালানি এবং বিদ্যুতের সংকট মোকাবিলায় রেশনিংয়ের মাধ্যমে উৎপাদনশীল খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে, রপ্তানি ও কৃষি খাতকে। এতে সাধারণ মানুষের সাময়িক সমস্যা হলেও খাদ্য ও ব্যবসা স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হতে পারে। সেজন্য আমি বলব, সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে যেসব পর্যায়ে জ্বালানি সাশ্রয়ী হওয়া সম্ভব, তা করতে হবে। বিলাসিতা পরিহার করে কৃচ্ছ্রসাধনের মনোভাব তৈরি করতে হবে।’
আসন্ন সংকট মোকাবিলায় কী করণীয় এমন প্রশ্ন অর্থনীতির এই বিশ্লেষক বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ নিয়ে অনেক সমালোচনাও আছে। তবে আপাতত চুক্তির আওতায় আমরা আমেরিকা থেকে এলএনজি (তরল প্রাকৃতিক গ্যাস) কিনতে পারব। চুক্তিতে পাঁচ বছরের এলএনজি কেনার বিষয়ে তাদের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তাদের আগ্রহের কারণেই, জ্বালানি কেনার বিষয়টি চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে আমাদের নীতিনির্ধারণী মহল থেকে এ বিষয়ে তাদের অবহিত করা উচিত। যাতে ইউএস চুক্তির আওতায় জ্বালানি সরবরাহ করে। এতে আসন্ন সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।’
হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে বিশ্বের অনেক দেশ ওই পথে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনে সতর্কতা অবলম্বন করছে। কারণ বীমা কোম্পানিগুলো বলেছে, যুদ্ধকালীন সময়ে তারা কোনো বীমা দাবি পরিশোধ করবে না। তবে ড্রোনাল ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, তার প্রশাসন থেকে বীমা দাবি পরিশোধ করবে এবং তাদের নৌবাহিনী জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দেবে। ফলে এ ঘোষণার আওতায় বাংলাদেশের যেসব জাহাজ জ্বালানি নিয়ে হরমুজে আটকা পড়েছে, ইউএসের সহায়তায় বাংলাদেশের জাহাজগুলো নিরাপত্তা দিয়ে দেশে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
বর্তমানে ঢাকা সফরে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর। সরকারের উচিত হবে, তার সঙ্গে এসব সমস্যার বিষয়ে আলাপ করা এবং সমাধানে তাদের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি আদায় করা, বলেন জাহিদ হোসেন।
জ্বালানি সমস্যার সমাধান না হলে, বিশেষ করে রপ্তানি খাতে বেশি প্রভাব পড়বে। সময়মতো রপ্তানি আদেশ না পৌঁছালে ক্রয় আদেশ অন্যত্র চলে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। যদিও অন্যান্য প্রতিযোগী দেশকেও প্রায় কাছাকাছি সমস্যার মধ্য দিয়ে সামনের দিনগুলো যেতে হবে।