মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেলের সংকট হতে পারে এ আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে মানুষ ফিলিং স্টেশনে ভিড় করছে এবং বেশি বেশি তেল কিনছে। গতকাল সাপ্তাহিক ছুটির দিন সকাল থেকেই রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে ছিল ব্যাপক ভিড়। যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। আগের দিনের চেয়ে এ চাপ আরও বেড়েছে।
ঢাকার বাইরেও ফিলিং স্টেশনগুলোতে দেখা গেছে অস্বাভাবিক ভিড়। কোথাও সীমিত পরিমাণে তেল বিক্রি করা হচ্ছে, আবার কোথাও মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে পাম্প বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটছে। কোথাও কোথাও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে।
যদিও জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ ফুরিয়ে যায়নি। কৃত্রিম সংকট সামলাতে যানবাহনে তেল বিক্রির কোটা নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন।
এমন পরিস্থিতিতে গতকাল শুক্রবার রাজধানীতে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন পরিদর্শন করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এ সময় ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, অস্থির হওয়ার কোনো কারণ নেই। দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। সরকার পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছে। তেল নিয়ে অহেতুক আতঙ্ক না ছাড়াতে সবার প্রতি আহ্বানও জানান তিনি। মন্ত্রী বাড়তি তেল মজুদ না করতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানান।
পরীবাগের পেট্রোল পাম্প পরিদর্শন শেষে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দীর্ঘমেয়াদে যাতে দেশে জ্বালানির সংকট না হয়, সেজন্য আগামীকাল রবিবার থেকে রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল বিক্রি করা হবে। এ বিষয়ে লিখিত নির্দেশনা পেট্রোল পাম্পগুলোকে দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত ঘাটতির চেয়ে আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত চাহিদাই পরিস্থিতিকে বেশি চাপের মধ্যে ফেলছে। অনেকেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনে সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছে। এর ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে এবং পাম্পে দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হচ্ছে।
বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, মার্চের ১ থেকে ৪ তারিখ ডিজেল বিক্রি হয়েছে ৯৫ হাজার টন। যেখানে গত বছর একই সময়ে বিক্রি হয়েছে ৪৫ হাজার টন। অকটেন ও পেট্রোলের বিক্রিও বেড়েছে।
তবে দেশে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের মজুদ তুলনামূলকভাবে কমে এসেছে। গত বৃহস্পতিবারের তথ্য অনুযায়ী, ডিজেলের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ৬ লাখ ২৪ হাজার ১৮৯ টন। এর মধ্যে ব্যবহারযোগ্য মজুদ রয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার ৯৪০ টন, যা মোট সক্ষমতার প্রায় ২৯ শতাংশ। গত ১ থেকে ৪ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৪ হাজার ৪৭৮ টন ডিজেল বিক্রি হয়েছে।
তেল নিতে দীর্ঘ অপেক্ষা : বৃহস্পতিবার রাত ২টার দিকে কল্যাণপুরে খালেক পাম্পের সামনে দেখা যায় মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। এর ফলে এত রাতেও রাস্তায় তীব্র যানজট দেখা দেয়। সেই জট ছড়িয়ে পড়ে শ্যামলীর শিশুমেলা পর্যন্ত।
পরদিন অর্থাৎ গতকাল সকাল থেকেই ঢাকার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের সামনে যানবাহনের লম্বা লাইন চোখে পড়ে। আসাদগেট এলাকায় অবস্থিত তালুকদার ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায় একই চিত্র। সেখানে কথা হয় মোটরসাইকেল চালক আতিকুর রহমানের সঙ্গে। দেশ রূপান্তরকে তিনি জানান, অনেকেই ট্যাংকি ভর্তি করে তেল নিয়ে বাসায় রেখে আবার তেল নিতে আসছে। এতে করে সংকট তৈরি হয়েছে। আরেক চালক সালমান জানান, তিনি রাইড শেয়ার করেন। বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়েও তেল না পেয়ে বেলা ১১টার দিকে আবার তেল নিতে এসেছেন। দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর তখন পর্যন্ত তিনি তেল নিতে পারেননি।
ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার মো. আজম মিয়া জানান, শুক্র ও শনিবার ডিপো বন্ধ থাকে। তাই বৃহস্পতিবার তারা বাড়তি তেল কিনে রেখেছিলেন। গড়ে দুই-তিন গাড়ি তেল বিক্রি হয় প্রতিদিন। কিন্তু এখন বিক্রি অনেক বেড়ে গেছে। ক্রেতার অস্বাভাবিক চাপে তিনিও খানিকটা বিরক্ত।
পরিবাগে মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে হয়ে শাহবাগ মেট্রোরেলের নিচ পর্যন্ত মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বেশ কয়েকজন মোটরসাইকেল চালকের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হতে দেখা যায়। কে কার আগে যাবেন এ নিয়ে কেউ কেউ হাতাহাতিতেও লিপ্ত হন।
এখানে দাঁড়িয়ে কথা হয় প্রাইভেট কারচালক শামীম মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, ‘আগের দিন তেল নিতে পারিনি। সকালে এসে দেখছি লম্বা লাইন। দেখে মনে হচ্ছে বাংলাদেশেও যুদ্ধে লেগে গেছে।’
পাশ দিয়ে বাইক চালিয়ে যাওয়া এক যুবককে বলতে শোনা গেল, ‘আমরা আসলেই খারাপ জাতি। সরকার বারবার বলছে সংকট নেই। কিন্তু আমরা নিজেরাই বেশি বেশি তেল নিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছি। এরপর দোষ হবে সরকারের।’
ঢাকার একটি ফিলিং স্টেশনের এক কর্মকর্তা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দাম বাড়তে পারে বা সংকট হতে পারে এমন শঙ্কা থেকে আগেভাগেই বেশি করে জ্বালানি তেল কিনছেন অনেকে, যার ফলে সংকট তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, বেশি লাভের আশায় ফিলিং স্টেশন বা ডিপোগুলো তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে বলে অভিযোগ গ্রাহকদের।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশে জ্বালানি নিয়ে যে এক ধরনের ‘অস্থিরতা’ তৈরি হয়েছে, এটি বলাই যায়। এ ক্ষেত্রে ঘুরেফিরে একটি প্রশ্নই সামনে আসছে যে, ‘তেল-গ্যাসের দাম কি বাড়ছে?’
অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে জ্বালানি তেল মজুদ বা বাড়তি দামে বিক্রি করতে না পারে, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎমন্ত্রী। পাশর্^বর্তী দেশে জ্বালানি তেল পাচারের বিষয়েও সীমান্তে সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে।
তেলের দামের আন্তর্জাতিক মানদ- ব্রেন্ট ক্রুড শুক্রবার ব্যারেলপ্রতি ৮৬ ডলার ছাড়িয়েছে। ইরানে হামলার প্রথম দিনের সঙ্গে তুলনা করলে এ দাম ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে জ্বালানি পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে কি না, এমন ভীতি তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
এদিকে, চলমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি সাশ্রয়ের নির্দেশনা দিয়ে বৃহস্পতিবার একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। যেখানে ব্যক্তিগত যানবাহনের পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহার, রান্না ও অন্যান্য কাজে গ্যাসের সর্বোচ্চ সাশ্রয়ের পদ্ধতি অনুসরণ, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী পদক্ষেপ গ্রহণসহ নানা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট এড়াতে খোলাবাজার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি ক্রয় এবং জ্বালানি তেল কেনার বিষয়ে দেশের বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও আলোচনা করছে সরকার। এরই মধ্যে একাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি আমদানির পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও জানা গেছে।
তেল নেওয়ার সীমা বেঁধে দিল বিপিসি : তেল সরবরাহের সীমা বেঁধে দিয়ে গতকাল বিপিসির এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, একটি মোটরসাইকেলে দিনে ২ লিটার পেট্রোল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে নেওয়া যাবে ১০ লিটার তেল।
স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল বা এসইউভি (যা জিপ নামে পরিচিত) ও মাইক্রোবাস দিনে পাবে ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল। পিকআপ বা লোকাল বাস দিনে ডিজেল নিতে পারবে ৭০ থেকে ৮০ লিটার। আর দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা কনটেইনার ট্রাক দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার তেল নিতে পারবে।
এতে বলা হয়, কিছু কিছু ভোক্তা ও ডিলার ফিলিং স্টেশন হতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে অননুমোদিতভাবে মজুদ করার চেষ্টা করছেন মর্মে খবর পাওয়া গেছে, যা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বিপিসিসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে।
জনগণের আতঙ্ক কমানোর লক্ষ্যের কথা জানিয়ে নির্দেশনায় বলা হয়, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য বিদেশ হতে আমদানি কার্যক্রম নির্ধারিত রয়েছে। নিয়মিতভাবে চালান দেশে আনা হচ্ছে। পাশাপাশি ডিলারদের সাময়িকভাবে প্রধান স্থাপনা হতে সারা দেশের সব ডিপোতে নিয়মিতভাবে রেল ওয়াগন/ট্যাংকারের মাধ্যমে তেল পাঠানো হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশে জ্বালানি তেলের বাফার স্টক (পর্যাপ্ত মজুদ) গড়ে উঠবে।
তেল নিতে হবে রসিদ দেখিয়ে : ফিলিং স্টেশন থেকে ভোক্তাকে তেলের ধরন, পরিমাণ ও দাম উল্লেখ করে রসিদ দিতে হবে এবং প্রতিবার তেল কেনার সময় আগের রসিদ দেখাতে হবে বলে উল্লেখ করা হয় নির্দেশনায়।
বিপিসি আরও বলেছে, ডিলাররা বরাদ্দ ও ভোক্তার ক্রয় রসিদ গ্রহণ করে তেল সরবরাহ করবে। ফিলিং স্টেশনগুলো জ্বালানি তেলের মজুদ ও বিক্রির তথ্য ডিপোতে প্রদান করে জ্বালানি তেল গ্রহণ করবে।
ডিলারদের জ্বালানি তেল সরবরাহের আগে বর্তমান বরাদ্দ ও মজুদের তথ্য পর্যালোচনা করে সরবরাহ করা হবে এবং কোনো অবস্থায় বরাদ্দের চেয়ে বেশি তেল দেওয়া যাবে না বলেও উল্লেখ করেছে বিপিসি।
পাচার ঠেকাতে সীমান্তে কঠোর নজরদারি : এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কায় সীমান্ত দিয়ে পাচারের ঝুঁকি বেড়েছে বলে মনে করছে প্রশাসন। এ পরিস্থিতিতে যশোর সীমান্তে অতিরিক্ত টহল ও নজরদারি জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বেনাপোলসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অস্থায়ী চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহন তল্লাশি করা হচ্ছে।
আতঙ্কে কৃষক : জ্বালানি তেলের সংকটের আশঙ্কায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে কৃষি খাতে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডিজেল না পাওয়ায় বোরো মৌসুমের সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
চুয়াডাঙ্গা জেলার হাড়োকান্দি গ্রামের কৃষক নূরু মিয়া জানান, বোরো ধান চাষে সেচ দেওয়ার জন্য দুদিন ধরে ঘুরেও চাহিদামতো ডিজেল পাওয়া যায়নি। সময়মতো সেচ দিতে না পারলে ঠিকমতো ফলন হবে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বোরো মৌসুম দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ডিজেলের সরবরাহ ব্যাহত হলে শুধু কৃষকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, এর প্রভাব পড়তে পারে দেশের সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদনের ওপরও। তারা বলছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বিঘিœত হবে এবং উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য কৃষি খাতের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা চলছে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে। ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে যুদ্ধ। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় জ্বালানি তেল নিয়ে সংকটের আশঙ্কা রয়েছে।