শুক্রবার ছুটির দিনে বইমেলা শুরু হয়েছে শিশু প্রহরের মধ্য দিয়ে। কিন্তু শিশুপ্রহরে আসা শিশুদের মন ভেঙে গেছে পরিচিত শিশু চত্বর দেখতে না পেয়ে। বাবা-মায়ের সঙ্গে বইমেলায় এসেছে শিহাব। টিএসসির দিকের প্রবেশ পথ দিয়ে মেলায় এসে বাবা-মায়ের হাত থেকে ছুটে, মুক্ত মঞ্চের পেছনের ইট বাঁধানো পথ ধরে দৌড়ে রমনা মন্দিরের পাশে শিশু চত্বরের পুরনো স্থানটিতে এসে হতাশ হয়ে পড়ে সে। তাকে অনুসরণ করে দেখা যায়, তার চেহারায় হতাশা স্পষ্ট। ততক্ষণে বাবা-মাও এসে পৌঁছেছেন। তারা মেলার অন্য দর্শনার্থীদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন, এবারের শিশু চত্বর মেলার অন্যান্য প্রকাশনীর সঙ্গেই একীভূত হয়ে আছে। ফলে দূর থেকে বোঝা যায় না। বিগত বছরগুলোর বইমেলায় শিশুদের জন্য খেলার ব্যবস্থা থাকত। নাটক প্রদর্শন বা গল্প শোনার সেশন থাকত।
এবারও শিশুদের জন্য পুতুল নাটক ও বায়োস্কোপ প্রদর্শনের ব্যবস্থা থাকলেও তার পরিসর অপ্রতুল। পাপেট শোর মঞ্চের এক পাশে পানির পাইপের গভীর গর্ত থাকায় ওই অংশটি হয়ে উঠেছে শিশুদের জন্য বিপজ্জনক। এবারের বইমেলায় শিশু চত্বরকে পৃথক স্থান না দিয়ে অন্যান্য স্টলের সঙ্গে একীভূত করার কারণ সম্পর্কে দেশ রূপান্তর জানতে চায় অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এর সদস্য সচিব ড. মো. সেলিম রেজার কাছে। তিনি জানান, শিশুদের জন্য বই প্রকাশ করে এমন অনেক প্রকাশকই প্রথমে এবারের বইমেলায় অংশগ্রহণ করতে চাননি। স্থানের তুলনায় অংশগ্রহণকারী কম মনে হওয়ায় মুক্তমঞ্চের বিপরীতে শিশু চত্বরের আয়োজন করা হয়েছে। এখানে শিশুদের জন্য পুতুল নাটক ও বায়োস্কোপের প্রদর্শনী চলছে। এগুলোর সামনের ভিড় দেখে বোঝা যায় শিশুরা সুন্দরভাবে এ আয়োজন গ্রহণ করেছে।
ছুটির দিন থাকায় শুক্রবার সাধারণ দর্শনার্থীদের আগমনও তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। এবারের বইমেলার অন্যান্য দিনের তুলনায় শুক্রবার নবম দিনে দর্শনার্থী বেশি ছিল। অন্যান্য বছরের মেলার তুলনায় লোকসমাগম কম হলেও, তা নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করতে দেখা গেল না বাড্ডা থেকে আসা ফাহাদের কথায়। তিনি বললেন, প্রতি বছর তো পাঠকের থেকে বেশি কনটেন্ট ক্রিয়েটর আর টিকটকার আসে। এবার রোজার মাস হওয়ার কারণে পাঠক ছাড়া অন্য দর্শনার্থীদের ভিড় নেই। এতে পাঠকরা স্বস্তি নিয়ে বই দেখতে পারছে, কিনতে পারছে।
মেলায় লোকসমাগম না থাকায় খুশি হতে পারছেন না প্রকাশকরা। এক রঙা এক ঘুড়ি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী নীল সাধু জানালেন, অন্য বইমেলার তুলনায় এবারের বইমেলায় মানুষ কম আসছে, এটা যে কারও চোখে পড়বে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, বইমেলার প্রথম দুই সপ্তাহে লোকসমাগম এমনই থাকে। শেষের দুই সপ্তাহে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। বইমেলায় লোকসমাগম কম হওয়ার কারণ হিসেবে সার্বিক পরিস্থিতিকে দায়ী করলেন এ প্রকাশক। বললেন, সাধারণত নভেম্বর ডিসেম্বর থেকেই প্রকাশক ও লেখকদের মধ্যে একটা সাজ সাজ রব পড়ে যায়। এবার সেটি ছিল না। জাতীয় নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে সবার নজর ছিল। একটা সময় তো ২০২৬ সালের বইমেলা নিয়ে অনিশ্চয়তাও দেখা গিয়েছিল। তারপরও সব বাধা অতিক্রম করে বইমেলার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা গেল, সেটি মন্দের ভালো। জানালেন, অন্য বছর এক রঙা এক ঘুড়ি থেকে ৫০-৬০টি বই প্রকাশিত হলেও এবার নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে মাত্র নয়টি। শেষ মুহূর্তে স্টল ভাড়া মওকুফ করা সরকারের একটি ভালো উদ্যোগ উল্লেখ করে তিনি জানান, এর ফলে অনেক প্রকাশকের পক্ষে সম্ভব হয়েছে এবারের মেলায় অংশগ্রহণ করা।
রমজান মাসের কারণে এবারের বইমেলায় যুক্ত হয়েছে ভিন্নমাত্রার আবহ। বিগত বছরের বইমেলায় খাবারের দোকান আর ভ্রাম্যমাণ হকারদের দৌরাত্ম্য দেখা গেছে। এবার রোজার কারণে ইফতারের আগপর্যন্ত তাদের পদচারণা দেখা যায়নি বললেই চলে। মাগরিবের আজানের সঙ্গে সঙ্গে ছোট ছোট দলে মেলার দর্শনার্থীদের একসঙ্গে ইফতার গ্রহণের দৃশ্য এবারের মেলার অন্যতম আকর্ষণ। লেখক ও পরিব্রাজক ইমাম হোসেইন বললেন সে কথাই। রমজানের কারণে মেলায় দর্শনার্থী নেই এ কথা মানতে নারাজ তিনি। ইফতার উপলক্ষে বাৎসরিক যে পুনর্মিলনী হয় এবারের বইমেলা সেখানেও স্থান করে নিয়েছে জানালেন তিনি। সে কারণে মেলায় এমন অনেকে আসছেন যারা অন্যসময় হয়তো বইমেলায় আসতেন না। এর ফলে পাঠক বাড়ছে বলে তার ধারণা। এবারের বইমেলায় এসেছে তার দ্বিতীয় বই ‘পথের গল্প’। দীর্ঘদিন ধরে তারা সীমান্তবর্তী জেলাগুলো দল বেঁধে ভ্রমণ করছিলেন। সেই ভ্রমণের অভিজ্ঞতাই বইতে উঠে এসেছে জানালেন তিনি।
বইমেলা নিয়ে ইতিবাচক কথা শোনালেন কিন্ডার বুকস ও বেঙ্গল বুকসের প্রকল্প প্রধান আজহার ফরহাদ। তিনি জানালেন, বেঙ্গল বুকসের স্টলে দর্শনার্থীদের সমাগম আশানুরূপ। স্বভাবতই ইফতারের সময় স্টল খালি হয়ে যায়। কিন্তু ইফতারের পর দর্শনার্থীদের আগমন ও বইয়ের বিক্রি থাকে দিনের যেকোনো সময়ের থেকে বেশি। রাশি রাশি হতাশাব্যঞ্জক মন্তব্যের ভিড়ে কীভাবে এমন ইতিবাচক ফল পাচ্ছেন জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, সারা বছর ধরে কোনো প্রকাশক যদি বইয়ের কনটেন্ট নিয়ে কাজ করেন, বইয়ের প্রচার ও বিপণনে মনোযোগী হন, বইমেলায় তার হতাশা থাকার কথা নয়।
কবিতার বইয়ের আধিক্য, বিক্রি কম
গতকাল শুক্রবার বইমেলার নবম দিনে নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে ১৯৯টি। এ নিয়ে ৯ দিনে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৫৭৩টি। এ পর্যন্ত প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে কবিতার বই। এর পরের অবস্থানে রয়েছে উপন্যাস, গল্প, গবেষণা ও শিশুতোষ বই। তবে বিক্রির ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম বিক্রি হচ্ছে কবিতার বই।
বাংলা একাডেমির তথ্য অনুযায়ী, বইমেলায় এ পর্যন্ত ১৫৬টি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে গতকালই এসেছে ৪৪টি। তাছাড়া গল্পের বই ৭৫টি, উপন্যাস ৯৫টি, প্রবন্ধ ২১টি, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি, নাটক ২টি এবং বিজ্ঞান নিয়ে ২টি বই প্রকাশিত হয়েছে। দর্শনার্থীদের পছন্দের বইয়ের মধ্যে উপন্যাস, থ্রিলার, সাহিত্য, অনুবাদধর্মী বই উল্লেখযোগ্য।
প্রকাশকদের মতে, নতুন বইয়ের তালিকায় কবিতার বইয়ের সংখ্যা বেশি হলেও এর পাঠক তুলনামূলক কম। সাধারণত নির্দিষ্ট কয়েকজন পরিচিত কবির বইয়ের খোঁজ নেন পাঠকরা। অন্যদের ক্ষেত্রে মূলত লেখকের আত্মীয়স্বজন, বন্ধু বা শুভানুধ্যায়ীদের ক্রেতা হিসেবে দেখা যায়।
অবসর প্রকাশনীর বিক্রয় বিভাগের ব্যবস্থাপক মাসুদ রানা বলেন, কবিতার বইয়ের প্রধান ক্রেতা অনেক সময় কবি ও লেখকরাই হয়ে থাকেন। তাদের ভক্ত ও অনুসারীরাও কিছু বই সংগ্রহ করেন। তবে অন্য ধারার তুলনায় কবিতার বইয়ের বিক্রি অনেক কম। মেলার আরও কয়েকজন বিক্রয় প্রতিনিধিও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান।
বিক্রেতাদের মতে, কবিতার বইয়ের মধ্যে পাঠকদের আগ্রহ তুলনামূলক বেশি দেখা যায় ইমতিয়াজ মাহমুদের বইয়ে। যদিও এবার তার নতুন বই এখনো মেলায় আসেনি। এর আগে দিব্য প্রকাশ থেকে প্রকাশিত তার কবিতার বইয়ের খোঁজে পাঠকরা ওই স্টলে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
মেলার স্টলগুলোতে ইতিমধ্যে বেশ কিছু নতুন কবিতার বই এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে লুৎফর হাসানের ‘জীবন ফুরিয়ে যাচ্ছে তোমাকে পাচ্ছি না’ (অন্য প্রকাশ), মাজহার সরকারের ‘রূপ ঝরে রাধাজাগে’ (চন্দ্রবিন্দু), মোয়াজ্জম হোসেনের ‘গুলবাগিচার জুঁই’ (প্রতিবিম্ব), মো. আলী হোসেনের ‘জীবনের প্রত্যাশা’ (ঝিঙেফুল) এবং সৌরভ দেবনাথের ‘প্রতিবিম্বের সত্তা’ (চারু সাহিত্যাঙ্গন)।
এ ছাড়া প্রকাশনা সংস্থা বাঙালি থেকে আরিফ মঈনুদ্দীনের ‘নিজের ভেতর থেকে উত্থান’ প্রকাশিত হয়েছে। কাব্যকথা থেকে তার আরেকটি কাব্যগ্রন্থ ‘বহুদূর থেকে ভেসে আসার সুর’ও এসেছে। বৃত্তকলা একাডেমি প্রকাশ করেছে রাকিব হাসানের ‘অপূর্ব প্রেম’ এবং আমিনুর রহমানের ‘কষ্টের একুরিয়াম’। ঐতিহ্য প্রকাশ করেছে দেওয়ান মাজহারুল ইসলামের ‘সুরভিত দ্রোহ’ এবং জালালুদ্দিন রুমির কবিতার অনুবাদগ্রন্থ ‘কারণ, আমি ঘুমাতে পারি না’। সিদ্দিকীয় পাবলিকেশনস থেকে এসেছে মোহাম্মদ সোলয়মান সহজের ‘হেরাগুহার ধ্যান’।
গতকাল মেলার সময়সূচি বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মেলায় ছিল শিশুপ্রহর। আজ তথ্যকেন্দ্রে মেলার নতুন বই জমা পড়েছে ১৯৯টি।
শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতা : গতকাল সকাল ১০টায় বাংলা একাডেমির সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ সভাগৃহে অমর একুশে শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে ‘ক’ শাখায় ১০ জন, ‘খ’ শাখায় ১০ জন এবং ‘গ’ শাখায় ১০ জন প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করে। বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন নাসিম আহমেদ, টিটো মুনশী এবং অনন্যা লাবণী পুতুল।
বেলা ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় জন্মশতবর্ষ : কলিম শরাফী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অণিমা রায়। আলোচনায় অংশ নেন সাইম রানা। সভাপতিত্ব করেন সাধন ঘোষ।
অণিমা রায় বলেন, কলিম শরাফী সেই বিরল প্রতিভার অন্তর্গত, যার কণ্ঠস্বর সংগীতের সুষমা বহনের পাশাপাশি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের সংকটময় মুহূর্তে হয়ে উঠেছিল অস্তিত্ব-সংরক্ষণের উচ্চারণ। তিনি যেমন দীর্ঘকাল সংগীত সাধনা করেছেন, তেমনি সংগীতকে প্রতিষ্ঠিত করতে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। রাষ্ট্রীয় আগ্রাসন ও সাংস্কৃতিক অবদমনের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল অনমনীয়।
লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন মৃদুল মাহবুব ও এহসান মাহমুদ। বিকেল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন শাহীন রেজা। আবৃত্তি পরিবেশন করেন শওকত আলী, রবিউল মাশরাফী, রূপশ্রী চক্রবর্তী এবং মোহাম্মদ কামাল হোসেন। সংগীত পরিবেশন করেন মহাদেব চন্দ্র ঘোষ, মো. হারুনুর রশিদ, সঞ্চিতা রাখি, মো. রমজান হোসেন, শিরিন জাহান, রতন কুমার সাহা ও নূরতাজ পারভীন।
আজকের সময়সূচি : আজ ৭ মার্চ শনিবার মেলা শুরু হবে বেলা ১১টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। মেলায় বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত থাকবে শিশুপ্রহর। একই সঙ্গে বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে শিশুকিশোর সংগীত প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হবে।
বেলা ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে জন্মশতবর্ষ : নূরজাহান বেগম শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ইসরাইল খান। আলোচনায় অংশ নেবেন সোহরাব হাসান। সভাপতিত্ব করবেন লুভা নাহিদ চৌধুরী। বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।