জনগণের মালিকানার অর্থনীতি চায় সরকার

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৬, ০২:৪৮ এএম

বর্তমান সরকার অর্থনীতিতে ঋণনির্ভরতা কমিয়ে জনগণের মালিকানা (অংশীদারত্বের) অর্থনীতি ও শিল্পায়ন চাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। এজন্য উদ্যোক্তাদের ব্যাংকঋণ কমিয়ে শেয়ারবাজার থেকে পুঁজি সংগ্রহে উৎসাহিত করেন তিনি। গতকাল রবিবার রাজধানীর স্থানীয় একটি হোটেলে পুঁজিবাজারবিষয়ক সেমিনারে উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।

শেয়ারবাজারের রিপোর্টারদের সংগঠন ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ) এই সেমিনারের আয়োজন করে। সেমিনারের বিষয় ছিল ‘শেয়ারবাজারের নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়।’ বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান খন্দকার রাশদে মাকসুদ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান।

অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ মাহমুদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, পুঁজিবাজারকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাত থেকে বের করে ‘সর্বজনের মালিকানা’ ও অংশগ্রহণের’ জায়গায় নিয়ে যেতে চাই। এর অংশ হিসেবে প্রবাসীদের জন্য বিশেষ ‘ইনভেস্টমেন্ট গেটওয়ে’ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এতে তারা সহজে দেশের বাজারে বিনিয়োগ করতে পারবে। তিনি বলেন, মুসলিম দেশগুলোর বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে ইসলামিক ফাইন্যান্স মার্কেট সম্প্রসারণ করার সুযোগ আছে। বাজারের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তথ্যপ্রযুক্তি এবং ‘ব্লকচেইন’ ব্যবহার করা হবে।

তিনি আরও বলেন, অডিট ব্যবস্থা, সম্পদ মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান এবং ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলোর কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। যারা ভালো করবে, তাদের জন্য পুরস্কার এবং যারা অনিয়ম করবে, তাদের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা থাকা দরকার। অডিটরদের প্রতিবেদন দেখেই বিনিয়োগকারীরা সিদ্ধান্ত নেন। অডিটররা প্রত্যয়ন করে কোম্পানি ভালো আছে। কিন্তু পরে তাদের সম্পদ বিক্রি করতে গিয়ে দেখা যায় কিছুই নেই। এজন্য অডিটররা যেন সঠিক ‘প্রত্যয়নপত্র’ দেয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। অর্থমন্ত্রণালয়, ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি), বিএসইসিসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো শক্তিশালী করার মাধ্যমে অডিটর জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের মাধ্যমে দেশের পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে। তার মতে, আগে দেশে যে অর্থনৈতিক মডেলটি ছিল, তা টেকসই ছিল না। কারণ এটি ছিল ‘ভোগনির্ভর’। টেকসই অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন ‘বিনিয়োগনির্ভর’ মডেল। বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত না থাকলে শুধু ঋণনির্ভর অর্থনীতি কখনো টেকসই হয় না। বর্তমান যে পরিস্থিতি চলছে, তা থেকে উত্তরণ জরুরি। এজন্য জনগণের বিশাল ম্যান্ডেট নিয়ে একটি রাজনৈতিক সরকার এসেছে। এ সরকার অর্থনীতিতে একটা বড় পরিবর্তন করতে চায়। এজন্য ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পুঁজিবাজারকে ‘ফ্রন্টিয়ার মার্কেট’ থেকে ‘ইমার্জিং মার্কেট’-এ উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ চলছে। তিনি জানান, পুঁজিবাজার নিয়ে তিনটি লক্ষ্য। প্রথমত, কাঠামোগত সংস্কার, ব্যবস্থাপনাগত সংস্কার এবং বাজারের চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণ।

পুঁজিবাজারে সাধারণ মানুষের অংশীদারত্ব বাড়ানো কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বাজার মূলধন জিডিপির মাত্র ১২ শতাংশ। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং পুঁজিবাজারের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে এনে একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। যাতে সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফিরে আসে এবং একটি কল্যাণধর্মী পুঁজিবাজার গড়ে ওঠে।’

সেমিনারে বক্তব্য দেন বিএসইসির কমিশনার মো. সাইফুদ্দিন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান, অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের প্রেসিডেন্ট রিয়াদ মাহমুদ এবং বাংলাদেশ মার্চেন্টস ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সাধারণ সম্পাদক সুমিত পোদ্দার।

সিএমজেএফ সভাপতি মনির হোসেনের সভাপতিত্বে সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পুঁজিবাজারের স্টক ব্রোকারদের সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সিনিয়র সহসভাপতি মনিরুজ্জামান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিএমজেএফের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব।

বক্তারা বলেন, পুঁজিবাজারকে দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা দূর করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে হবে। এজন্য ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে শক্তিশালী ও গভীর পুঁজিবাজার গড়ে তোলা জরুরি।

বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ বিগত ১৮ মাসের পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে বলেন, ‘আমরা ১২৬টি তদন্ত করেছি। এর মাধ্যমে ১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা জরিমানা করেছি, যা মধ্যে ৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা আদায় হয়েছে।’

আদায় কম হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘জরিমানা পরিশোধে ৯ মাস সময় পাওয়া যায়। অনেকে আদালতে যাওয়ায় কিছু আইনি বিষয় সামনে চলে এসেছে। এ ছাড়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে এনফোর্সমেন্টে তিনশোরও বেশি কেস নিষ্পত্তি করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো দুদকে ১৬টি মানি লন্ডারিং রিলেটেড কেসেস পাঠানো হয়েছে, যেগুলো আমরা মনে করছি যে শুধু জরিমানা যথেষ্ট নয়। ইতিমধ্যে দুদকে বেশ কিছু মামলাও হয়েছে।’

এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, ‘আমাদের আইন আছে অনেক কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। এটাই আমাদের বড় সমস্যা। আমরা কেন বাজারকে শক্তিশালী করতে পারলাম না এমন প্রশ্ন করে তিনি বলেন, পুঁজিবাজারের সিস্টেমে সমস্যা রয়েছে। যখন পুঁজিবাজারে ধস হয়, তখনো বাজারে কর প্রণোদনাগুলো ছিল। সুতরাং কর সুবিধা দিলেই বাজার ভালো হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।’

অতীতে অনেক কোম্পানির নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যারা বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিতে পারেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আগামীতে লভ্যাংশ দিতে পারবে না, এমন কোম্পানিকে অনুমোদন দেওয়া যাবে না। আমরা আগে এই জায়গাটিতে ফেল করেছি। একই সঙ্গে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে আগামীতে কোনো কোম্পানি মিথ্যা তথ্য দিয়ে যাতে বাজারে না আসতে পারে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত