কমপ্লায়েন্সে সম্পদে পরিণত হতে পারে ট্যানারি বর্জ্য

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩২ এএম

নিয়মতান্ত্রিকতা (কমপ্লায়েন্স) নিশ্চিতের মাধ্যমে ট্যানারি বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করার মতামত দিয়েছেন বিশিষ্ট জনরা। গতকাল মঙ্গলবার বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) এসএমই ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্কিং কমিটির (এসএমইডিডব্লিউসি) ১১তম সভায় তারা এমন মতামত তুলে ধরেন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুন নাসের খান এবং চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক। সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বিল্ডের পক্ষ থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুন নাসের খান বলেন, এলডিসি উত্তরণের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সরকার চামড়া খাতের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এ লক্ষ্যে চামড়া খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং সাভার ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেটে (এসটিআইই) অবস্থিত সিইটিপির বর্তমান ত্রুটিগুলো সংশোধনেও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, উদ্যোক্তাদের যা যা প্রয়োজন তা আমলে নিয়ে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেবে।

সিসিসিআইয়ের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে ইতিমধ্যে সিইটিপি রয়েছে। সাভারেও একই ধরনের সুবিধা গড়ে তোলা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রামের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। চট্টগ্রামে সিইটিপির বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা আবশ্যক।

বিল্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফেরদৌস আরা বেগম দি এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় প্রণীত ‘ট্যানারি সলিড ওয়েস্ট (টিএসডব্লিউ) ব্যবস্থাপনা : এসএমই পর্যায়ে রপ্তানি উন্নয়নে নীতিগত সহায়তা’ শীর্ষক একটি সমন্বিত নীতিপত্র (পলিসি পেপার) উপস্থাপন করেন। এতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের চামড়া খাতে সাভার ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেটে (এসটিআইই) প্রতিদিন আনুমানিক ২৩০ টন টিএসডব্লিউ উৎপন্ন হয়, যার কয়েকশ কোটি টাকার একটি বিশাল অব্যবহৃত অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে। অনানুষ্ঠানিক সংগ্রহ প্রক্রিয়া, উৎসেই বর্জ্য পৃথকীকরণের অভাব এবং নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতার কারণে এই সম্ভাবনা এখনো বহুলাংশে অব্যবহৃত রয়ে গেছে।

উপস্থাপনায় টিএসডব্লিউ-কে পরিবেশগত ঝুঁকি থেকে মূল্যবান সম্পদে রূপান্তরের একটি কৌশলগত পথরেখা তুলে ধরা হয়, যেখানে আনুষ্ঠানিক এসএমই অংশগ্রহণ বাড়ানো, অভিন্ন ক্লাস্টার-পর্যায়ের অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং শিল্প জেলটিন, প্রোটিন মিল, লেদার বোর্ড ও জৈব সারের মতো উচ্চমূল্যের উপজাত পণ্যের প্রসারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। মূল নীতিগত সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতীয় শিল্পনীতিতে টিএসডব্লিউ উপজাত পণ্যকে সুনির্দিষ্টভাবে স্বীকৃতি দেওয়া, ক্ষুদ্র প্রক্রিয়াকরণকারীদের জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবেশগত ছাড়পত্রের ব্যবস্থা চালু করা, মানসম্মত বর্জ্য পৃথকীকরণ প্রটোকল প্রতিষ্ঠা করা এবং জাতীয় রপ্তানি প্রস্তুতি বাড়াতে লক্ষ্যভিত্তিক গ্রিন ফাইন্যান্সিং ও মান সনদায়ন সহায়তা প্রদান করা।

সিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আমির হুমায়ুন এম চৌধুরী বলেন, সিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে আমরা চট্টগ্রামের ট্যানারিগুলোকে এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করব এবং তাদের ফিডব্যাক সংগ্রহের চেষ্টা করব। আমাদের জানামতে, গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ট্যানারি তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছে। তবে সামনের দিকে তাকাতে হবে। বর্জ্য থেকে পণ্য তৈরির ধারণা বৈশ্বিকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এবং বাংলাদেশের এই সুযোগ কাজে লাগানো প্রয়োজন। ট্যানারিগুলোর জন্য তহবিল প্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে আমাদের কাজ করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইএলইটি-র পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুজ্জামান চামড়া খাতসংশ্লিষ্ট কারিগরি সমস্যা সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যার মধ্যে রয়েছে চামড়াজাত পণ্যকে ঝুঁকিমুক্ত করতে ক্রোমিয়াম দূষণের সম্ভাবনা হ্রাস করা এবং এর ভিত্তিতে বিভিন্ন চামড়াজাত পণ্যের সম্ভাব্যতা যাচাই করা।

ডিটিআইইডব্লিউটিপিসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম শাহনেওয়াজ বলেন, ফ্লেশিং, সøাজ, শেভিং ডাস্টের মতো বিভিন্ন ট্যানারি কঠিন বর্জ্য থেকে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। একটি চীনা কোম্পানি ট্যানারি বর্জ্য থেকে জেলটিন, আঠা ও ক্যাপসুলের মতো উদাহরণযোগ্য পণ্য তৈরি করে দেখিয়েছে। এসব সুবিধা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে নির্দিষ্ট ছাতা নীতি সহায়তা, পর্যাপ্ত জমি ও ইটিপি প্রয়োজন। এ ছাড়া, নির্দিষ্ট কারিগরি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) যুগ্ম মহাপরিদর্শক মো. মতিউর রহমান উল্লেখ করেন, ৪৩টি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ খাতের মধ্যে ট্যানিং শিল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য এলাকার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ক্লিনিক স্থাপন করা প্রয়োজন, পাশাপাশি একটি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও শ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা প্রয়োজন।

ডিপিডিটির মহাপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আমাদের সততা সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে। ডিআইএফই কাঁচা চামড়া সংগ্রহকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু তারা এই প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহী নয়। তারা এটিকে একটি সম্মানজনক পেশা বলে মনে করে না।

ট্যানারি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ছাগলের চামড়া ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না এবং তার পরিবর্তে খ- খ- করে মূলত চীনে রপ্তানি করা হচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ট্যানারি শিল্প নিজেই একটি বর্জ্যনির্ভর খাতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, এই খাতে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান হ্রাস পাচ্ছে; প্রায় ১৫৫টি কারখানার মধ্যে সীমিতসংখ্যক কারখানা এখনো সচল রয়েছে, আর যেগুলো চালু আছে তাদের জন্য একটি নিরাপদ প্রস্থান কৌশল প্রয়োজন। ট্যানারি মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং শ্রমিকরা চাকরিচ্যুত হচ্ছেন, অন্যদিকে নীতি হালনাগাদের বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে । তিনি এসব সমস্যা একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানান এবং যোগ করেন যে, পরিবেশ মন্ত্রণালয় খাতটিকে যথাযথভাবে বিবেচনায় না নিয়েই বিভিন্ন বিধিবিধান প্রণয়ন করে যাচ্ছে, যার ফলে অর্থনীতি ও পরিবেশ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সুলতানা ইয়াসমিন সমীক্ষাটি পরিচালনা ও উপস্থাপনের জন্য বিল্ড ও দি এশিয়া ফাউন্ডেশনের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, আজকের সভায় উত্থাপিত সুপারিশগুলো মন্ত্রণালয় বিবেচনা করবে এবং সভার কার্যবিবরণী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে প্রেরণ করা হবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ও বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিলের পরিচালক ড. মোহাম্মদ রাজ্জাকুল ইসলাম জানান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও শিল্প মন্ত্রণালয় যৌথভাবে সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী একটি চামড়া খাত পথরেখা প্রণয়ন করছে। শিল্প মন্ত্রণালয় সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের (সিইটিপি) সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে এবং একই সঙ্গে কারখানা পর্যায়ের সুশাসনসংক্রান্ত সমস্যাগুলোরও সমাধান করছে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রিমিয়াম বাজারের দিকে অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যথাযথ সার্টিফিকেশনের অভাবে পণ্য প্রায়ই প্রকৃত মূল্যের একটি ক্ষুদ্র অংশে বিক্রি হয়, যা নির্দেশ করে যে উপজাত পণ্য নিয়ে একটি পৃথক ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন তহবিল রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ২ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্প এবং ৩ হাজার কোটি টাকার ক্লাস্টার ডেভেলপমেন্ট ফান্ড, যেখান থেকে টিএসডব্লিউ উদ্যোক্তারা তহবিল সংগ্রহ করতে পারেন। বাংলাদেশ ব্যাংক ডকুমেন্টেশন প্রক্রিয়া সহজীকরণের বিষয়টি বিবেচনা করছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) উপপরিচালক শরিফুল হক চামড়ার মান উন্নয়নে কৃষকদের সঙ্গে চলমান সমন্বয়ের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, কোরবানির পশুর চামড়ার একটি বড় অংশ যাদের হাত দিয়ে সংগৃহীত হয় সেই মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে, যাতে কাঁচামালের মান বৃদ্ধি পায়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত