পার্থের রেকটেঙ্গুলার স্টেডিয়ামে ১১ বছর আগে খেলার সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ পুরুষ দল। স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের সেই ম্যাচে জামাল ভূঁইয়ারা হেরেছিলেন ৫-০ ব্যবধানে। একই মাঠে সোমবার আফঈদা খন্দকাররা ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটি খেলতে নামবেন। বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টায় এই ম্যাচে ৬২ ধাপ এগিয়ে থাকা উজবেকিস্তানকে হারালেই খুলতে পারে অনেক সম্ভাবনার দুয়ার। এশিয়ান কাপের অভিষেকেই তারা পা রাখতে পারে কোয়ার্টার ফাইনালে। যদি সেটা হয়, তবে ২০২৭ বিশ্বকাপ ও ২০২৮ অলিম্পিক গেমসে সরাসরি খেলার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
বি গ্রুপ থেকে ইতিমধ্যে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেছে উত্তর কোরিয়া ও চীন। উজবেকিস্তান ও বাংলাদেশ দুই ম্যাচ হেরে আছে তলানিতে। গোল হজমের হিসেবে উজবেকিস্তান খানিকটা এগিয়ে, তারা ছয় গোল হজম করেছে। বাংলাদেশ খেয়েছে সাত গোল। তাই সম্ভাবনার একেকটা দরজা খুলতে জয়ের বিকল্প নেই বাংলাদেশের সামনে। গত জুলাইয়ে মিয়ানমারকে হারিয়ে এশিয়ান কাপের টিকিট পেয়েছিল বাংলাদেশ। মিয়ানমার সে সময় ছিল বাংলাদেশের চেয়ে ৫৫ ধাপ এগিয়ে। বলতে গেলে অসম্ভবকে সম্ভব করেই ইতিহাস গড়েছিল বাংলাদেশ। অন্যদিকে উজবেকরা বাছাইয়ের শেষ ম্যাচে নেপালকে টাইব্রেকারে হারিয়ে মূলপর্বে এসেছিল। মধ্য এশিয়ার দলটি সব দিক থেকে এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশ যে ব্র্যান্ডের ফুটবল খেলে চীনের ঘাম ঝরিয়েছিল ছয় দিন আগে, তার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারলে আজ যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে।
যদিও বরাবরের মতো বাংলাদেশ দলের কোচ পিটার বাটলার আগেভাগে বড় কোনো স্বপ্ন দেখাতে চান না, ‘আমরা মাত্র দুটি শক্তিশালী দলের (চীন এবং উত্তর কোরিয়া) বিপক্ষে খেলেছি। আমরা কিছুটা রূঢ় অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি, তবে সেটি ইতিবাচক অর্থে। আগামীকাল (আজ) একটি কঠিন ম্যাচ হতে যাচ্ছে। প্রতিটি দিনই নতুন কিছু শেখার দিন। আমাদের দলের গড় বয়স সাড়ে ১৯ বছর। আমরা পূর্ণ আত্মবিশ্বাস এবং একই সঙ্গে সতর্ক হয়ে মাঠে নামব।’
এশিয়ান কাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ঢাকায় গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ইউরোপের দল আজারবাইজানের সঙ্গে একটি ম্যাচ খেলেছিল। হারলেও সে ম্যাচে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স প্রশংসা কুড়িয়েছিল। মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তানের খেলোয়াড়রাও আজারবাইজানের খেলোয়াড়দের মতো দীর্ঘকায় ও শক্তিশালী। বাটলার অবশ্য উজবেকদের চেয়ে আজারবাইজানকে অনেক এগিয়ে রাখছেন। একই সঙ্গে আজকের ম্যাচটি তার কাছে একটি ইঁদুর-বিড়াল লড়াইয়ের মতো রোমাঞ্চকর লড়াই মনে হচ্ছে, ‘আমার মনে হয় পরিস্থিতি এখন ভিন্ন, কারণ অ্যাথলেটিক প্রোফাইল এবং আজারবাইজান ও উজবেকিস্তানের গঠনগত দিক থেকে পার্থক্য আছে। আজারবাইজান অনেক বড় এবং শক্তিশালী দল ছিল, তবে আমরাও তাদের সমস্যায় ফেলেছিলাম। আমার মনে হচ্ছে আগামীকালের ম্যাচটি অনেকটা ‘ইঁদুর-বিড়াল’ লড়াইয়ের মতো হবে। আমরা যেভাবে খেলি তাতে তারা হয়তো কিছুটা সতর্ক থাকতে পারে। আমরা এমন দল নই যারা রক্ষণভাগ আগলে বসে থাকে, এটি আমাদের স্টাইল নয়। আমরা আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে পছন্দ করি। তবে আমাদের বল আরও নিয়ন্ত্রণে রাখা শিখতে হবে। আজারবাইজানের বিপক্ষে আমরা সেটি করতে পেরেছিলাম। আমরা ধৈর্য ধরেছিলাম এবং বলের সঠিক ব্যবহার করেছিলাম।’
গতকাল ছিল বিশ্ব নারী দিবস। নিজের শিষ্যদের সংগ্রামের গল্প খুব ভালো জানা বাটলারের। বিশেষ দিনটিতে তাই শিষ্যদের সম্মান জানাতে ভোলেননি বাটলার, “আমি সত্যিই গর্বিত এই মেয়েদের নিয়ে। আমি আফ্রিকায় আট বছর পুরুষ জাতীয় দলের কোচ ছিলাম। সামাজিক প্রেক্ষাপটে আফ্রিকা অনেকটা বাংলাদেশের মতোই, সবারই একটি করে গল্প আছে। আমি সবসময় নারীর অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানোয় বিশ্বাসী। আমি এই দলের হয়ে কাজ করতে পেরে গর্বিত। আমরা একটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি। আমি ‘আমি’র বদলে ‘আমরা’ বলতে পছন্দ করি। এমনকি আগামীকাল যদি আমরা নাও জিতি, তাতে কিছু যায় আসে না। কারণ আমরা শুধু জয়ের জন্য আসিনি।”
উজবেকিস্তানও একই লক্ষ্য নিয়ে আজ মাঠে নামবে। জিততে পারলে তাদের সামনেও খুলে যাবে সম্ভাবনার অনেক দুয়ার। তাই তাদের কোচ মিডোরি হোন্ডা ভরসা রাখছেন নিজ দলের ওপর, ‘দুই দলই প্রথম দুই ম্যাচে হেরেছে। আমরা শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে খেলেছি, তাই আমরা জানি আমাদের সামর্থ্য কী। আগামীকাল আমরা বাংলাদেশের মুখোমুখি হচ্ছি যারা একটি গতিশীল দল। আমাদের জন্য এটি সহজ ম্যাচ হবে না। অবশ্যই আমরা জেতার জন্যই মাঠে নামব।’ তারুণ্যনির্ভর বাংলাদেশের প্রতি সমীহ দেখিয়ে কোচ আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি তরুণ দল এবং তাদের অনেক সম্ভাবনা আছে। তাদের গোলকিপার চমৎকার খেলছে। মাত্র ১৯ বছর বয়সে সে গোলপোস্টের নিচে খুবই সাহসী। তাদের আক্রমণভাগেও বেশ কিছু ভালো খেলোয়াড় আছে। তবে দিনশেষে আমরা নিজেদের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।’
স্মরণীয় এই অভিযানের আজই ইতি ঘটবে, নাকি আরেকটি ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশ সিডনি ফিরবে সেটা সময়ই বলে দেবে।