অভিষেক শর্মাকে ফাইনালের একাদশে রাখতে বারণ করেছিলেন সুনীল গাভাস্কার। গৌতম গম্ভীর যদি বাধ্য ছেলের মতো কিংবদন্তির কথাটা শুনতেন, তাহলে কী হতো? হয়তো আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়াম ভারতের সবচেয়ে অপয়া ক্রিকেট ভেন্যু হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত হয়ে যেত। বিয়েবাড়ির উৎসবের আমেজ বদলে যেত শ্রাদ্ধবাড়ির শোকাচ্ছন পরিবেশে। ভাগ্যিস সুনীলের কথা কেউ রাখেনি। রাখলে অভিষেকের ফাইনালের একাদশে থাকা হয় না, ২১ বলে ৫২ রানের টর্নেডো ইনিংসটাও খেলা হয় না। শুরুতে অভিষেকের ব্যাটের অমন রুদ্ররূপে সেই যে চুপসে গেল কিউইরা, গোটা ফাইনাল ম্যাচে তাদের আর মাঠে খুঁজেই পাওয়া গেল না। একপেশে ফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে ৯৬ রানে হারিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপটা জিতে নিল স্বাগতিক ভারত। এবারই প্রথম কোনো স্বাগতিক দল জিতল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা, সেই সঙ্গে পরপর দুইবার শিরোপা জেতার নজিরও তারা গড়ল প্রথমবারের মতো।
আহমেদাবাদের বিশাল গ্যালারির নীল সাগরকে চুপ করিয়ে দিতে চেয়েছিলেন মিচেল স্যান্টনার। টসে জিতে ভারতকে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়ে নিজেরাই চুপ হয়ে যাওয়ার পথে প্রথম কদমটা বাড়ালেন। একাদশে কোল ম্যাকনকিকে বসিয়ে তিন সপ্তাহ পর একাদশে ফেরানো হলো জ্যাকব ডাফিকে। ভারতের ব্যাটিং অর্ডারে বামহাতি ব্যাটসম্যানদের সংখ্যা বেশি, তারা অফস্পিনে দুর্বলÑএটা পরিসংখ্যানে প্রমাণিত। সেই তথ্যে বিশ্বাস না করে ফাস্ট মিডিয়াম ডাফিকে একাদশে আনাটা আরেকটা ঐতিহাসিক ভুল। অভিষেকের সামনে প্রথম ওভারে গ্লেন ফিলিপসকে এনেছিলেন স্যান্টনার, পরের ওভারে আনলেন ডাফিকে। তাকে পরপর দুটো চার মেরেই যে আত্মবিশ্বাসটা পেলেন অভিষেক, তারপর থামলেন রীতিমতো ঘূর্ণিঝড় তুলে। ১৮ বলে হাফসেঞ্চুরি, যার ভেতর ডাফির পরের ওভারেই নিয়েছেন ২০। পাওয়ার প্লে শেষে ভারতের রান বিনা উইকেটে ৯২! এখান থেকে তিনশ রানকেও মনে হচ্ছিল সম্ভব। কারণ অন্যপ্রান্তে সঞ্জু স্যামসনও যে করে যাচ্ছিলেন তার কাজটা। পরপর তিনটা ‘নকআউট’ ম্যাচ; ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সুপার এইটের শেষ ম্যাচ, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল আর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ফাইনাল। এই ৩ ম্যাচে সঞ্জুর রান ২৭৫, খেলেছেন ১৩৮ বল, স্ট্রাইকরেট ১৯৯.২৭। কিউইদের বিপক্ষে সঞ্জু করেছেন ৪৬ বলে ৮৯, ৫টা চার আর ৮ খানা ছক্কায়। ইশান কিশান দুই রূদ্রমূর্তির মাঝে নেমে কখন যে ২৫ বলে ৫৪ রান করে ফেললেন সেটা টেরই পাওয়া গেল না। মাঝে ৪ ওভারে নিউজিল্যান্ডের কিঞ্চিৎ প্রতিরোধ, ১ উইকেটে ২০৩ থেকে ৪ উইকেটে ২০৪, এরপর ৫ উইকেটে ২২৬। সম্ভাব্য তিনশ থেকে আড়াইশর ঘরে তাতে আটকানো গেল ভারতকে। শেষবেলায় শিভাম দুবের ৮ বলে ২৬ রানের ক্যামিওতে ভারতের রান ৫ উইকেটে ২৫৫ যা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেরই তৃতীয় সর্বোচ্চ দলীয় ইনিংস, ফাইনালের তো বটেই।
এই রানের হিমালয় ডিঙাতে হলে জ্যাকব বেথেলের মতো কাউকে নিঃসঙ্গ শেরপার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে আসতে হতো। সেটা সেমিফাইনালের সেঞ্চুরিয়ান ফিন অ্যালেন, কিংবা গ্লেন ফিলিপসের মতো কেউ, যার ব্যাটে সেই বারুদ আছে পাহাড়কে গুঁড়িয়ে দেওয়ার। অ্যালেন করেছেন ৯, ফিলিপস ৫। দ্বিতীয় ইনিংসটা আসলে ভারতের বিজয় উদযাপনের অপেক্ষার প্রহরকেই দীর্ঘ করেছে। একটা মুহূর্তের জন্যও মনে হয়নি নিউজিল্যান্ডের পক্ষে এই রানটা তাড়া করে জেতা সম্ভব। সেইফার্ট ২৬ বলে ৫২ আর স্যান্টনার ৪৩ করেছেন বটে, সেসব তাদের রানের খাতায় কটা দাগ মাত্র। অভিষেক শর্মা এলেন বল করতে, ম্যাচের ১৯তম ওভারে। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে তাকে ১ ওভার করিয়েছিলেন সূর্যকুমার, আর আনলেন ফাইনালে। যখন প্রতি বলে ছক্কা হজম করলেও ভারত জিতবে। অভিষেকের বলে উড়িয়ে মারতে গিয়েই বাউন্ডারি লাইনে তিলক বর্মার হাতে ধরা পড়লেন জ্যাকব ডাফি, তাতেই নীল সাগর উন্মাতাল করে তিরঙ্গা হাতে মাঠে দৌড়ে নেমে এলো একঝাঁক কিশোর। মাঠের সাউন্ড সিস্টেমে তখন ‘চাক দে ইন্ডিয়া’ বেজে উঠেছে ফুল ভলিউমে। ক্লোজআপে দেখা যাচ্ছে ভারতের ক্রিকেটারদের হাসিমুখ, গ্যালারিতে নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটারদের সুন্দরী বান্ধবীদের হতাশ চেহারা।
সতীর্থদের এমন রান উৎসবের পর বুমরার মনে হলো বল হাতেও কিছু করা দরকার। ১৫ রানে ৪ উইকেট নিয়ে রানপাহাড়ের চাপে চিড়েচ্যাপ্টা কিউইদের আরও বিপদ বাড়িয়েছেন আলাদিনের প্রদীপের দৈত্য হয়ে ওঠা বুমরা। ১৪ উইকেট নিয়ে বুমরা শীর্ষ উইকেটশিকারি, যার ৭টাই তিনি পেলেন সবশেষ ৩ ম্যাচে। ওভারপ্রতি গড়ে মাত্র ৬.২১ রান খরচায়।
আসরের সেরা খেলোয়াড় হয়েছেন সঞ্জু স্যামসন। শুরুতে একাদশের বাইরে ছিলেন। পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচে জায়গা হয়নি। এসে শুরুতে একটু আক্ষেপ ধরালেও পুষিয়ে দিয়েছেন শেষ ৩ ম্যাচে। পর্দার ‘সঞ্জু’র মতোই ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ইনিংসে তার একের পর এক সুপার হিট।
নিউজিল্যান্ডের স্থানীয় সময় রাত ২টা ৩০ মিনিটে উঠে খেলাটা দেখার জন্য অনুরোধ করে ঘড়িতে অ্যালার্ম দিতে অনুরোধ করেছিলেন স্যান্টনার। যারা উঠেছেন, নিঃসন্দেহে প্রথম ইনিংসের পর ঘুমিয়ে পড়েছেন। মাঠেও হয়তো অনেকের ঘুম পাচ্ছিল। ভিআইপি দর্শকরা খোশগল্প করছিলেন। কারণ এমন একপেশে ফাইনাল যে হবে, তাও টি-টোয়েন্টিতে সেটা কেউ ভাবতেই পারেননি!