দ্রুত নেক আমলে নিয়োজিত হোন

আপডেট : ১০ মার্চ ২০২৬, ০১:১৯ এএম

মসজিদে হারামের জুমার খুতবায় গত শুক্রবার শায়খ ড. ইয়াসির আদ-দাওসারি রমজান মাসের অবশিষ্ট সময়কে নেক আমলের মাধ্যমে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন। রমজান এমন একটি মাস, যেখানে আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য ইবাদত সহজ করে দিয়েছেন এবং এর মাধ্যমে জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা লাভের সুযোগ দিয়েছেন, আর রমজান দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে এবং ইতিমধ্যে এর অর্ধেকের বেশি সময় পার হয়ে গেছে, তাই তিনি অবশিষ্ট সময়ে ইবাদতে নিয়োজত থাকার জোর তাগিদ দিয়েছেন।

শায়খ বলেন, সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি রমজান মাসকে বিশেষ মর্যাদা ও অনুগ্রহের মাধ্যমে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন এবং তার বান্দাদের জন্য এমন ইবাদত সহজ করে দিয়েছেন, যার মাধ্যমে তারা জান্নাতে উচ্চমর্যাদা লাভ করতে পারে।

হে লোকসকল! আপনাদের সবাইকে তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ দিচ্ছি। যে ব্যক্তি তাকওয়া দ্বারা নিজেকে সজ্জিত করবে, সে সর্বোচ্চ মর্যাদা অর্জন করবে এবং যাবতীয় অনিষ্ট ও বিপদ-আপদ থেকে নিরাপদ থাকবে। যে ব্যক্তি মহান আল্লাহকে ভয় করবে, মহান আল্লাহ তার গুনাহসমূহ মোচন করবেন এবং তাকে মহাপুরস্কার দান করবেন।

হে মুসলিম উম্মাহ! দিন ও রাত কত দ্রুত অতিবাহিত হচ্ছে এবং মাস ও সময় কত দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে! এই তো রমজান মাসের অর্ধেকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেল। প্রকৃত সফল তো সেই ব্যক্তি, যে কোমর বেঁধে ইবাদতে আত্মনিয়োগ করেছে এবং নিষ্ঠার সঙ্গে অবশিষ্ট দিনগুলো কাজে লাগানোর সংকল্প করেছে। মনে হচ্ছে, যেন মাসটি এখনই বিদায় নিচ্ছে। তাই আপনারা এই মাসের গুরুত্ব অনুধাবন করুন। এর অধিকাংশ সময় চলে গেলেও এখনও এর শ্রেষ্ঠ অংশটি বাকি রয়েছে। রমজানের শেষ দশ দিন সন্নিকটে, যা তার কল্যাণ ও বরকত নিয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত। এটি ক্ষমা, নেয়ামত, মুক্তি, রহমত, দোয়া কবুল, নেকি বৃদ্ধি এবং গুনাহ মোচনের সময়। সেই ব্যক্তিই সফল, যে নেক আমলের মাধ্যমে এর ত্রুটি-বিচ্যুতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করবে। আর সেই ব্যক্তিই বঞ্চিত, যে অলসতা ও দীর্ঘ আকাক্সক্ষার বশবর্তী হয়ে ইবাদত থেকে বিমুখ থাকবে। অতএব, হে আল্লাহর বান্দারা, আপনারা দ্রুত নেক আমলের দিকে অগ্রসর হোন। কারণ এখনো সুযোগ আছে এবং কল্যাণের দুয়ার উন্মুক্ত। নিশ্চয়ই শেষ আমলের ওপরই সবকিছু নির্ভর করে।

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষ ১০ দিনে অন্য সময়ের চেয়ে বেশি ইবাদত করতেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষ ১০ দিনের ইবাদতে যে পরিমাণ পরিশ্রম করতেন, অন্য সময়ে তা করতেন না। (সহিহ মুসলিম)

আয়েশা (রা.) থেকে আরও বর্ণিত আছে, যখন রমজানের শেষ দশ দিন শুরু হতো, তখন নবী (সা.) তার লুঙ্গি কষে নিতেন (অর্থাৎ ইবাদতের জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নিতেন), রাত্রি জাগরণ করতেন এবং তার পরিবারবর্গকেও জাগিয়ে দিতেন। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)। সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-ও এই দশ দিনের মর্যাদা জানতেন, তাই তারা কল্যাণের দিকে দ্রুত ধাবিত হতেন। সায়েব ইবনে ইয়াজিদ (রা.) থেকে বর্ণিত, ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) উবাই ইবনে কাব ও তামিম দারি (রা.)-কে লোকদের নিয়ে এগারো রাকাত নামাজ পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ইমাম দীর্ঘ কেরাত পাঠ করতেন, এমনকি দীর্ঘ দণ্ডায়মানের কারণে আমরা লাঠিতে ভর দিতাম এবং ফজর হওয়ার আগ মুহূর্তে আমরা নামাজ শেষ করতাম। (সুনানে বায়হাকি) পূর্বসূরি নেককার ব্যক্তিরাও এই দশ দিনকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। তারা আল্লাহর কিতাব পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতে মগ্ন থাকতেন এবং ইবাদতে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতেন।

হে মুসলিম সমাজ, রমজানের এই শেষ ১০ দিনের বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানের কারণ হলো, মহান আল্লাহ একে লাইলাতুল কদর বা কদরের রাত দ্বারা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন। এই রাতের গুরুত্ব অপরিসীম, যা মানুষের হেদায়েতের জন্য এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে পবিত্র কোরআন নাজিলের রাত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি এটি এক বরকতময় রাতে নাজিল করেছি।’ (সুরা দুখান ৩) এই রাতে পরবর্তী এক বছরের সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও মানুষের আয়ু নির্ধারণ করা হয় এবং রিজিক বণ্টন করা হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘এই রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থির করা হয়।’ (সুরা দুখান ৪)

এটি অত্যন্ত বরকতময় ও নেকিতে ভরপুর এক রাত। এই রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি এটি কদরের রাতে অবতীর্ণ করেছি। আর কদরের রাত কী, সে সম্পর্কে আপনি কি জানেন? কদরের রাত হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।’ (সুরা কদর ১-৩) হাজার মাস হলো প্রায় তিরাশি বছর চার মাস। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশাল নেয়ামত ও পুরস্কার, যা থেকে কেবল দুর্ভাগা ও বঞ্চিত ব্যক্তিই বিমুখ থাকতে পারে। এই রাতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফজিলত হলো, যে ব্যক্তি একনিষ্ঠভাবে ও খাঁটি ইবাদতের মাধ্যমে এই রাত যাপন করবে, মহান আল্লাহ তার আগের সব গুনাহ মাফ করে দেবেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে কিয়াম করবে (নামাজ আদায় করবে), তার আগের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) এই রাতে আল্লাহর নির্দেশে অগণিত ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং ফজর পর্যন্ত পুরো রাতটি শান্তি ও নিরাপত্তায় পূর্ণ থাকে।

হে আল্লাহর বান্দারা! জেনে রাখুন, মুমিনের ইমানের সত্যতা ও আল্লাহর পক্ষ থেকে তওফিক লাভের লক্ষণ হলো, এই বরকতময় রাতের সুযোগ গ্রহণ করা। মহান আল্লাহর প্রতি সু-ধারণা ও আশা নিয়ে বিনয় ও কান্নাকাটির সঙ্গে অধিক পরিমাণে দোয়া ও ইবাদত করা উচিত। আয়েশা (রা.) একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি যদি জানতে পারি কোন রাতটি লাইলাতুল কদর, তবে আমি সেই রাতে কী বলব? তিনি বললেন, তুমি দোয়া করবে, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউয়্যুন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি।’ অর্থাৎ হে আল্লাহ, নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, অতএব আমাকে ক্ষমা করুন। (তিরমিজি)

নবীজি (সা.) রমজানের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর তালাশ করার নির্দেশ দিয়েছেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা রমজানের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) মহান আল্লাহ এই রাতের সঠিক তারিখ আমাদের কাছে গোপন রেখেছেন, যাতে আমরা এটি পাওয়ার জন্য ইবাদতে কঠোর পরিশ্রম করি। যে ব্যক্তি এই রাতে ইবাদত করবে, সে কদরের রাতের সওয়াব পেয়ে যাবে, চাই সে তা জানতে পারুক বা না পারুক।

হে আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহকে ভয় করুন এবং রমজানের অবশিষ্ট সময়টুকুকে আমল, জিকির, তওবা ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে কাজে লাগান। আল্লাহর কাছে নিজের অভাব ও বিনয় প্রকাশ করুন, কারণ এটাই জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন। কত মানুষ এই মাসে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করেছে, জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়েছে এবং জান্নাতের অধিবাসী হয়েছে। আপনারা কাজ করুন, চেষ্টা করুন এবং সুসংবাদ গ্রহণ করুন, কারণ আপনারা এখন রহমত ও ক্ষমার মৌসুমে রয়েছেন। সময়ের মূল্য বুঝুন এবং নিজের জন্য আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করুন। সেই ব্যক্তিই ভাগ্যবান, যে রমজান ফুরিয়ে যাওয়ার আগে এর প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগাতে পেরেছে। ধন্য সেই ব্যক্তি, যে ইমান ও সওয়াবের আশায় রোজা রেখেছে, নামাজ পড়েছে এবং আল্লাহর দিকে ফিরে এসেছে। আল্লাহ আমাকে ও আপনাদের পবিত্র কোরআনের মাধ্যমে বরকত দান করুন এবং এর আয়াত ও উপদেশের মাধ্যমে আমাদের উপকৃত করুন।

হে মুসলিম ভাইরা! একজন মানুষের জন্য রমজানের শেষ দশ দিনে নিজের অন্তর পরিশুদ্ধ করা, নিয়ত ঠিক করা এবং নতুন করে মহান আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়া কতই না সুন্দর। এটি সম্ভব আল্লাহর সঙ্গে নিজের সম্পর্ক দৃঢ় করা এবং একাগ্রচিত্তে তার ইবাদতে মশগুল হওয়ার মাধ্যমে। আর ইতিকাফ হলো এই লক্ষ্য অর্জনে বান্দার জন্য সবচেয়ে বড় সহায়ক। নবীজি (সা.)-এর সুন্নাহ ছিল রমজানের শেষ দশ দিনে মসজিদে ইতিকাফ করা এবং দুনিয়াবি সব কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মহান আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করা।

ইমাম ইবনে কাইয়ুম (রহ.) বলেন, নবীজি (সা.) আল্লাহর প্রতি পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করার জন্যই ইতিকাফ করতেন। নবীজি (সা.) ওফাত পর্যন্ত এই ইতিকাফ পালন করে গেছেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজির (সা.) ইন্তেকাল পর্যন্ত রমজানের শেষ দশ দিনে ইতিকাফ করতেন, তার পরে তার স্ত্রীরাও ইতিকাফ করেছেন। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) সাহাবায়ে কেরামও তার পরে দুনিয়ার যাবতীয় ব্যস্ততা ও ভোগবিলাস ত্যাগ করে মহান আল্লাহর স্মরণে ইতিকাফ করতেন। নিয়ম হলো, রমজানের ২০ তারিখ সূর্যাস্তের আগে মসজিদে প্রবেশ করা এবং মাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত (অর্থাৎ ঈদের চাঁদ দেখা বা ৩০ রোজা পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত) বের না হওয়া। যার পক্ষে পুরো দশ দিন সম্ভব নয়, সে যেন অন্তত কিছু সময় ইতিকাফের মাধ্যমে এই নেয়ামত ও পুরস্কার লাভের চেষ্টা করে। বিশেষ করে, আপনারা যারা এই পবিত্র মক্কায় অবস্থান করছেন, যেখানে স্থান ও কাল উভয়েরই বিশেষ মর্যাদা রয়েছে, তারা ইবাদতে বেশি অগ্রণী হোন। জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায়, জাকাত-সদকা প্রদান এবং গভীর মনোযোগ দিয়ে কোরআন তেলাওয়াত বজায় রাখুন।

হে আল্লাহর বান্দারা! আপনারা নবীজি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ করুন, যেমনটি মহান আল্লাহ আপনাদের নির্দেশ দিয়েছেন। হে আল্লাহ, আপনি আপনার নবীজি মুহাম্মদ (সা.), তার পরিবারবর্গ, উম্মুল মুমিনিন, চার খলিফা আবু বকর, ওমর, ওসমান ও আলি (রা.)-এর ওপর এবং সব সাহাবি ও তাবেয়িদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন।

হে আল্লাহ, রমজানের এই অবশিষ্ট দিনগুলোতে আমাদের বরকত দান করুন। আমাদের রোজা ও নামাজ কবুল করুন এবং আমাদের লাইলাতুল কদর নসিব করুন। আমাদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিন। হে আল্লাহ, ইসলাম ও মুসলমানদের সম্মান বৃদ্ধি করুন। এই পবিত্র শহর এবং অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোকে নিরাপদ ও শান্তিময় রাখুন। ফিলিস্তিনের ভাইদের সাহায্য করুন এবং মসজিদে আকসাকে কেয়ামত পর্যন্ত সুরক্ষিত রাখুন। আমাদের অসুস্থদের শেফা দান করুন এবং মৃতদের প্রতি রহমত করুন। হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ দান করুন এবং জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করুন।

১৩ মার্চ শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত