অধীনদের প্রাপ্য আদায়ের তাগিদ

আপডেট : ১০ মার্চ ২০২৬, ০৯:৫৬ এএম

রমজান সহানুভূতি ও সহমর্মিতার মাস। এ মাস মানুষের হৃদয়ে অন্যের প্রতি মমতা জাগিয়ে তোলে, দায়িত্ববোধকে জাগ্রত করে এবং সমাজে ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেয়। রোজা শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার নাম নয়, বরং এটি মানুষের অন্তরকে কোমল করে, অন্যের কষ্ট অনুভব করার শক্তি দেয়। তাই রমজানের শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সমাজের দুর্বল ও শ্রমজীবী মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করা। মানুষের জীবন একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। সমাজের প্রতিটি স্তরে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যাদের শ্রম, সেবা ও দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে অন্যদের জীবন সহজ হয়ে ওঠে। কর্মচারী, শ্রমিক কিংবা অধীন যেই হোক, তাদের পরিশ্রমের বিনিময়েই সমাজের চাকা সচল থাকে। তাই তাদের প্রতি সদাচার প্রদর্শন, ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা, প্রাপ্য আদায় করা এবং প্রয়োজনের সময় সহমর্মিতা দেখানো জরুরি। ইসলাম এ বিষয়ে জোর তাগিদ দিয়েছে।

স্বাভাবিক নিয়মে শ্রমিকরা কাজ করে বেতন-বোনাসসহ তার প্রাপ্য সে লাভ করবে, এটা তার অধিকার। সেখানে কোনো ধরনের টালবাহানা, দেন-দরবার, আন্দোলন-সংগ্রাম ও ছলচাতুরী কাম্য নয়। কিন্তু বাস্তবতা যেন সেটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণমাধ্যমের খবরে দেখা যায়, ঈদের সরকারি ছুটি শুরু হওয়ার আগেই সব প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মীদের বেতন ও উৎসব ভাতা পরিশোধ করতে মালিকপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। সরকারি এ নির্দেশই প্রমাণ করে, ঈদের আগে বেতন-বোনাস নিয়ে নানাবিধ সমস্যা সৃষ্টি হয়, যেমনটা আমরা অতীতে দেখেছি।

মনে রাখতে হবে, দেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে বৈষম্য প্রকট হচ্ছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে বিপুলসংখ্যক মানুষ। খুবই স্বল্পসংখ্যক মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত হয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থবৃত্ত। ঈদের সর্বজনীনতার পথে এই বৈষম্য পথের কাঁটা। সেটাকে দূর করতে হবে সহানুভূতির চর্চা এবং দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার মধ্য দিয়ে। ঈদের সময় বিভিন্ন সেক্টরের প্রচুর শ্রমজীবী মানুষ তাদের প্রাপ্য অধিকার বেতন-বোনাস থেকে বঞ্চিত থাকেন, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। রমজান সহমর্মিতার মাস। এ মাসে নিজের অধীন ও কর্মচারীদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানো মুমিন বান্দার দায়িত্ব ও কর্তব্য। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের পার্থিব কষ্ট দূর করে দেয়, আল্লাহতায়ালা কেয়ামতের দিন তার কষ্ট দূর করে দেবেন।’ (সহিহ মুসলিম ৭০২৮)

এ ছাড়া রোজাদারের প্রতি সম্মান ও রমজানে কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অধীন গৃহকর্মীদের প্রতি সদয় ও সদাচারের দাবি হলো, তার কাজ কমিয়ে দিয়ে পারিশ্রমিক বেশি দেওয়া। তাহলেই আপনি সুসংবাদপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি এ মাসে নিজের অধীনদের কাজের চাপ কমিয়ে দেয়, আল্লাহতায়ালা তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন।’ (শুয়াবুল ইমান ৩৩৩৬)

ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমিকরা মালিকের পরিবারভুক্ত। ইসলাম শ্রমিককে ‘ভাই’ স্বীকৃতি দিয়ে তার জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করতে বলেছে। হাদিসের আলোকে ‘অধীন’ যে কেউ ভালো ব্যবহার পাওয়ার যোগ্য। সেই সঙ্গে শ্রমিকের মর্যাদাপূর্ণ জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব মালিকের। আর বেতন ও পারিশ্রমিক কর্মজীবীর অধিকার, ইসলাম দ্রুততম সময়ে তা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ঘাম শুকানোর আগেই শ্রমিকের পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ ২৪৪৩০)

শ্রমিককে বেতন-ভাতা ও প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা ভয়ংকর অপরাধ। নবী কারিম (সা.) বলেন, ‘কেয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির বিপক্ষে থাকব। (তার মধ্যে একজন হলো) যে কাউকে শ্রমিক নিয়োগ দেওয়ার পর তার থেকে কাজ বুঝে নিয়েছে, অথচ তার প্রাপ্য দেয়নি।’ (সহিহ বুখারি ২২২৭)

ইসলাম সাধারণভাবেই দুর্দিনে অভাবগ্রস্ত ও অসহায় মানুষের পাশে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। আর অসহায় ও অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি যদি হয় তার সেবাদানকারী শ্রমিক, তবে এ দায়িত্ব বেড়ে যায় বহুগুণ। কেননা, রাসুলুল্লাহ (সা.) মালিকপক্ষকে শ্রমিকের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করার তাগিদ দিয়েছেন। শ্রমিক ঠকানো ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্যতম পাপ। নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘যে জাতির দুর্বল লোকেরা জোরজবরদস্তি ছাড়া তাদের পাওনা আদায় করতে পারে না, সেই জাতি কখনো পবিত্র হতে পারে না।’ (ইবনে মাজাহ ২৪২৬)

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ মুসলিম কাউন্সিল

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত