দুই বছরে গ্যাস সংকটের সমাধান, কতটা সম্ভব?

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০৫ এএম

রাজধানীর সিএনজি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানো চালক থেকে শুরু করে দেশের শিল্পোদ্যোক্তা গ্যাস, বিদ্যুৎ সংকটের চাপে হিমশিম খাচ্ছেন। চাপে পড়েছে অর্থনীতির নানা স্তর। এর মধ্যে সরকার বলছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে অন্তত ২ বছর লাগতে পারে। কিন্তু দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন যখন কমছে, বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে এবং শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, তখন ২ বছর পর পরিস্থিতি কতটা সামাল দেওয়া যাবে, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

গতকাল বেলা ১১টা। ঢাকার রামপুরা বাজার। সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছেন বারেক মিয়া। কারওয়ান বাজারে যাবেন কি না জানতে চেয়ে ভাড়া কত জিজ্ঞেস করলে বলেন ২০০ টাকা। ৮ কিলোমিটার দূরত্বের এই রাস্তায় গ্যাস সংকটের আগে ভাড়া ১৫০ টাকার  বেশি চাইতেন না কোনো চালক। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ভাড়া বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। বেশি ভাড়া চাওয়ার কারণ জানতে চাইলে অটোরিকশাচালক বলেন, ‘কী করমু, একবার গ্যাস নিতেই ৪ ঘণ্টা লাগে। তাও আবার পাই ১৩০ টাকার গ্যাস। লাইনে তো গ্যাস নাই। প্রেসার নাই। ৪ ঘণ্টার বেশি চালানো যায় না। ৪ ঘণ্টায় কোনো রকমে জমাটা ওঠে। নিজের খাওয়াটা চলে। সংসার চালামু ক্যামনে?’

রামপুরা বাজারের হাজীপাড়া সিএনজি স্টেশনে দেখা গেল দীর্ঘ লাইন। সিএনজি অটোরিকশা নিলে লাইনে আছেন চালক রফিকুল ইসলাম। জানালেন, ২ ঘণ্টার ওপর দাঁড়িয়ে আছেন। তার গাড়ির ট্যাঙ্কে একবারে ৬৫০ টাকার গ্যাস ঢোকে। কিন্তু এখন গ্যাসের চাপ কম থাকায় সর্বোচ্চ ৩০০ টাকার গ্যাসের বেশি নেওয়া যায় না। একবার উত্তরা আসা-যাওয়া করলে এই গ্যাস শেষ হয়ে যায়। ফলে আবার তাকে লাইনে দাঁড়াতে হয়। গ্যাস সংকট নিয়ে চিন্তিত রফিকুল ইসলাম জানতে চাইলেন, ‘সরকার বলছে এই সংকট কাটতে নাকি ২ বছর লাগবে। এই ২ বছর কি আমাদের এভাবে লাইনে দাঁড়াতে হবে?’

দেশের শীর্ষ শিল্পোদ্যোক্তা শওকত আজিজ রাসেলের ১ দশমিক ৬ মিনিটের একটি ভিডিও ক্লিপ সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। দেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন ‘আমি যখন ঘোষণা পাইলাম আগামী ২ বছরে গ্যাস-বিদ্যুৎ স্বাভাবিক হবে না, আমি কিন্তু আজকে সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছি আমাদের পার্টিকেল বোর্ড (আসবাব তৈরির কারখানা) মিলটি বন্ধ করে দেওয়ার। আমাদের স্পিনিং মিল পাঁচটা, পাঁচওটা বন্ধ হয়ে গেছে অলরেডি। আর বাকি যেগুলো আছে, সেগুলো কনসলিডেটেড (একত্রিত করা) করব।’ তিনি বলেন, ‘সুবিধা হলো জানতে পেরেছি বসে বসে বেতন আর দিতে হবে না। ব্যাংক লায়াবিলিটি (দায়) আর বাড়বে না। যেখানে আছে, সেখানে হয়তো থাকবে। রিপেমেন্ট করার চেষ্টা করব সব কিছু বিক্রি করে। আমার যদি সক্ষমতা না থাকে, তাহলে আমি যদি বিদেশ থেকে ইমপোর্ট (আমদানি) করতে থাকি। তাহলে আমার দেশে পণ্য হবে না, কর্মসংস্থান হবে না, চাকরিও হবে না। তো এগুলো যদি এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে আমরা খুব একটা ভয়াবহ অবস্থার দিকে যাচ্ছি।’

জ্বালানি সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ এবং শিল্প উৎপাদনে বড় রকমের ধাক্কা লেগেছে। দেশের কোনো কোনো এলাকায় ১২ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হচ্ছে।

সংকট নিয়ে কী বলছে সরকার : চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট সম্পর্কে কথা বলেছেন দুই মন্ত্রী। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির গত ১৫ আগস্ট বলেছেন গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট স্থায়ীভাবে কাটাতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রায় ২ বছর সময় লাগতে পারে। আর ১৬ আগস্ট অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা ছয় মাস বা এক বছরে সমাধান সম্ভব নয় এবং নতুন অবকাঠামো  তৈরি করতে অন্তত ২ বছর লাগতে পারে। এ ব্যাপারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে এই মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের পরই উপরোল্লেখিত দুই মন্ত্রী এসব বক্তব্য দিয়েছেন।

সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত বুধবার জাতীয় সংসদে জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণে সরকারের পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, সাইসমিক জরিপ, বাপেক্সকে শক্তিশালী করা, সাগরে তেল গ্যাস অনুসন্ধান এবং এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, এলএনজি সরবরাহ বাড়াতে মহেশখালীতে একটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে, যা ২০২৮ সালের ডিসেম্বর থেকে গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে। যাতে আমদানি সক্ষমতা ৬০০ এমএমসিএফডি বাড়বে। তিনি জানান, একই সঙ্গে পায়রা, মোংলা বা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আরও এক-দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচির আওতায় এরই মধ্যে ৩০টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে। এতে জাতীয় গ্রিডে ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট এমএমসিএফডি গ্যাস যুক্ত হয়েছে; চলমান আরও সাতটি কূপের কাজ শেষ হলে যোগ হবে ৮৫ এমএমসিএফডি। পাশাপাশি ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সিইসমিক সার্ভে এবং ৪ হাজার ২০০ লাইন কিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়াতে দুটি নতুন রিগ কেনার প্রক্রিয়া চলছে।

বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চাহিদা ও ঘাটতি : সরকারের হিসাব বলছে, এখন দেশে গ্রীষ্মের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট। এর বিপরীতে গড় চাহিদা ১৫ হাজার মেগাওয়াটের মতো। এখন গড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। তবে দিনভেদে কোনো কোনো দিন যেমন লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ৪ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তেমন ১ হাজার মেগাওয়াটেও নেমে আসে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে জ্বালানির সংস্থান না থাকা। বিশেষ করে প্রধান জ্বালানি গ্যাসের তীব্র সংকট  তৈরি হওয়া।

গত ৩০ আগস্ট দেওয়া পেট্রোবাংলার প্রতিবেদন অনুসারে, এখন দেশে গ্রিড-সংযুক্ত গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের দৈনিক চাহিদা ২ হাজার ৫২৫ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে ওই দিন সরবরাহ করা হয়েছে ৮৫২ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদার ৩৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ সরবরাহ করা হয়েছে। বাকি ৬৬ দশমিক ২৬ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হয়নি।

একই দিনে গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে ২ হাজার ৩০৭ মিলিয়ন ঘনফুট। দেশে কেবল বিদ্যুৎকেন্দ্রে যে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে, তাই পূরণ করতে পারে না পেট্রোবাংলা। বাণিজ্য, আবাসিক এবং পরিবহনের সঙ্গে যোগ করলে চাহিদা দাঁড়ায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটে। চাহিদা থেকে সরবরাহ ঘাটতি ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

দুই বছর পর বিদ্যুতের চাহিদা কত হবে : প্রতি বছর দেশে ১০ শতাংশ করে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এই হিসাব করলে এখন চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট হলে ২ বছর পর তা বেড়ে হবে ২১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। কোনো রকম উৎপাদন না বাড়ানো হলে এখনকার মতো ১৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন হলে তখন ঘাটতি তৈরি হবে ৬ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের।

বর্তমান অবকাঠামোয় এই সংকট মেটানোর মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এলে দেশে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু এরপরও আরও ৫ হাজার ৩০০ মেগাওয়াটের ঘাটতি থেকে যাবে।

গ্যাসের বদলে তরল জ্বালানি দিয়ে এই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গেলে ভর্তুকির চাপ এতটা বাড়বে, যা বহন করা সরকারের পক্ষে কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দুই বছর পর গ্যাসের ঘাটতি আরও বাড়বে : বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্প এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ঠিক রাখার একমাত্র উপায় হচ্ছে দেশে গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধি করা। কিন্তু সেটি করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। চাইলেই গ্যাসের সরবরাহ হঠাৎ বাড়ানো সম্ভব নয়। এর জন্য হয় দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে, নয়তো আমদানি করার মতো অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের উদ্যোগ গ্রহণের তথ্য এসেছে। গত ২৬ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির বৈঠকে একটি চীনা কোম্পানি সিএমইসিকে মহেশখালীতে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের একটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। সিএমইসি জানিয়েছে, চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার ২১ মাস পর টার্মিনালটি উৎপাদনে আসতে পারে।

ঘাটতির আশঙ্কা কেনো? : সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদি আর কোনো গ্যাস সংযোগ দেওয়া না হয়, তাহলেও গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। কারণ দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ক্রমশ কমছে।

পেট্রোবাংলার প্রতিবেদন বলছে, ২০২০ সালের জানুয়ারিতে দেশে গ্যাসের উৎপাদন ছিল ৩ হাজার ১৬৮ মিলিয়ন ঘনফুট। তখনও দেশে এলএনজি সরবরাহ করার জন্য দুটি টার্মিনাল ছিল। ওই সময়, ২০২০ সালের ২১ জানুয়ারি এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হয়েছে ৫৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। ওই দিন দেশীয় উৎস থেকে সরবরাহ করা হয়েছে ২ হাজার ৫৭৮ মিলিয়ন ঘনফুট।

সেখানে গত ৩০ আগস্ট সরবরাহ করা হয়েছে ২ হাজার ৩০৭ মিলিয়ন ঘনফুট। এদিন আরএলএনজি থেকে সরবরাহ করা হয়েছে ৬৮২ মিলিয়ন ঘনফুট। আর দেশীয় খনির গ্যাস ছিল ১ হাজার ৬২৫ মিলিয়ন ঘনফুট।

এই ৬ বছরের ব্যবধানে দেশীয় উৎসের সরবরাহ কমেছে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এটি ক্রমাগতভাবে কমছে। আগামী ২ বছরে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন যে পরিমাণ কমবে, তা মেটাতে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের এই টার্মিনালকে ব্যস্ত রাখতে হবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন : জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, ‘লোডশেডিং হলে মানুষ কষ্ট করতে পারে। কিন্তু শিল্পে বিদ্যুৎ না থাকলে, গ্যাস না থাকলে কারখানা বন্ধ হবে। মানুষ বেকার হবে। এসব মানুষের সংসার কীভাবে চলবে, এদের দায় কে নেবে? এটা খুব উদ্বেগজনক বিষয়। এভাবে চলতে পারে না।’এই সংকট সামাল দিতে সরকারের যা করা উচিত তাও করতে পারছে না।

বুয়েটের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘জ্বালানি সংকটে শিল্প বন্ধ হবে, এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এরপর সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে ২ বছরের আগে সমস্যার সমাধান হবে না। তাহলে কি ২ বছর দেশে নতুন করে কোনো বিনিয়োগ হবে না? এ বিষয়ে সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া দরকার।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত