মুখ খুললেই খেতে হয় কোপ!

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৭ এএম

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী। ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পাঁচটি সন্ত্রাসী গ্রুপ ও কিশোর গ্যাং তৎপর রয়েছে। এখানে মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রায়ই গোলাগুলি ও খুনের ঘটনা ঘটে। তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুললে কিংবা চাঁদা না দিলে শুরু হয় এলোপাতাড়ি কোপ। এতে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। পুরনো অপরাধীদের অনেককে গ্রেপ্তার করা হলেও তাদের জায়গা দখল করছে নতুনরা। ফলে অভিযান চালিয়েও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ছে।

কালশী কবরস্থানের নির্জন এলাকাজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে অবৈধ নানা কারবার। কালশী কবরস্থান কর্তৃপক্ষ ও  সরদার জানান, গোরস্তানের পূর্ব-দক্ষিণ কর্নারে মুশফিক, শিশির নামের কয়েকজনের একটি চক্র সন্ধ্যার পর থেকে সেখানে মাদক বিক্রি করে। এই চক্রের কিছু সদস্য মাঝেমধ্যে সুযোগ পেলে মোটর, বাসের চাটাই কবরস্থানের মূল্যবান মালামাল চুরি করে। গোরস্তানে মাদক বিক্রি ও চুরির ব্যাপারে পুলিশকে জানালে তারা রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্র্রভাবশালীদের ব্যাপারে অভিযোগ নেয়নি। পল্লবীর স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ বলছে, মামুন বাহিনীর প্রতিনিধি ইমন প্র্রতিদিন লেগুনাগুলো থেকে চাঁদা আদায় করে।

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস মোহাম্মদ ওসমান গণি দেশ রূপান্তরকে বলেন, মিরপুরে সাতটি থানা এলাকায় বিশেষ অভিযানে সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের তালিক করে এখন পর্যন্ত ৯ হাজার ৬১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে খুনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৯ জন। তদন্তে জানা যায়, মিরপুরে সাতটি থানা এলাকায় চাঁদা তোলেন ২০৪ জন। তাদের বড় অংশই রাজনৈতিক প্র্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন। তারা ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মী বলে পুলিশের তালিকায় উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন, চাঁদাবাজদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। পুলিশ সদস্যদের কারও বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারও এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, মিরপুরে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ৩৭টি মামলা হয়েছে। কিশোর গ্যাং নির্মূল করা হবে। এ ছাড়া গাবতলী, শাহ আলী, পল্লবী, কাফরুল, দারুস সালাম, রূপনগর ও ভাষানটেক থানা এলাকায় বিভিন্ন খাতে চাঁদাবাজি হয়ে থাকে। এর মধ্যে গাবতলী টার্মিনাল একটা গুরুত্বপূর্ণ স্পট। এর বাইরে বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাতের দোকান, মূল সড়কে অবৈধ বাস-ট্রাক পার্কিং, অটোরিকশার গ্যারেজ, লেগুনাস্ট্যান্ড, ভাঙারির দোকান, ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবসা, ময়লার ব্যবসা, পোশাক কারখানা, ঝুট ব্যবসা, ভবন নির্মাণ, ভ্রাম্যমাণ দোকান, সরকারি জমিতে কাঁচাবাজার, বস্তিঘর ও ফুটপাতে অবৈধ বিদ্যুতের সংযোগ, কয়লা ও ইট-বালুর ব্যবসা ইত্যাদিতে চাঁদাবাজি হয়।

বিদেশে থেকেও নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ : পল্লবীতে কয়েকটি পেশাদার অপরাধী চক্রের সক্রিয়তার কথাও গোয়েন্দা সূত্রে উঠে এসেছে। শাহাদাত গ্রুপ, কিলার আব্বাস গ্রুপ, ইব্রাহিম গ্রুপ, মামুন গ্রুপ, মুক্তার গ্রুপ এদের মধ্যে অন্যতম। এসব গ্রুপের নেতাদের কেউ কেউ বিদেশে অবস্থান করলেও স্থানীয় কর্মীর মাধ্যমে মাদক কারবার, জমি দখল ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, মিল্লাতের ক্যাম্প থেকে কালশী মোড় পর্যন্ত ফুটপাতের দোকান ও চলাচলকারী যানবাহন থেকে চাঁদা আদায়ের একটি নেটওয়ার্ক রয়েছে।

মিরপুরে শীর্ষ সন্ত্রাসী আশিক বাহিনীর হুমকিতে আছেন মিরপুর ১১ নম্বরের ইন্টারনেট ব্যবসায়ী নওশাদ। তিনি জানান, সরকার পরিবর্তনের পর থেকে তার ব্যবসা দখল করতে আশিক বিদেশ থেকে ফোন করে ১০ লাখ টাকা চাঁদা চায়, অন্যথায় ব্যবসা বন্ধ করতে বলে। ডিবির প্র্রধান মো. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মধ্যম পর্যায়ের সন্ত্রাসীদের তৎপরতা দেখা যায়। সন্ত্রাসীদের শক্তির উৎস তাদের পৃষ্ঠপোষক বা গডফাদাররা। নিম্ন আয়ের মানুষকে ব্যবহার করে যারা অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা করছে, তাদেরও নজরদারি করা হচ্ছে।

শুধু মুখ বদলায় : পল্লবীর বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালেও তাদের আতঙ্ক কাটেনি। প্র্রায় প্র্রতিটি খাতেই চাঁদাবাজির হচ্ছে। মুখ খুললেই চাঁদাবাজদের কোপের ঘটনা অহরহ। পরিবহন, ফুটপাত, মার্কেট, ট্রাকস্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন খাতে আগের মতোই চাঁদা তোলা হচ্ছে। চলতি মাসে পল্লবী এলাকায় এক ভাঙারি ব্যবসায়ী থেকেও অস্ত্র দেখিয়ে ২ লাখ টাকা নিয়ে যায় মামুন গ্রুপের সদস্যরা। তারা একসঙ্গে ৮ থেকে ১২ জনের বাহিনী নিয়ে দোকান থেকে চাঁদা তোলে। টাকা না দিলে এলোপাতাড়ি কোপ ও মারধর করে এবং টাকা দিতে বাধ্য করে।

পল্লবী থানার ওসি মো. হাসান বাসির দেশ রূপান্তরকে বলছে, শীর্ষ সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজের তালিকা করা হয়েছে। এতে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নামও রয়েছে। বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তারা বের হয়ে আবার একই অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। কিছুদিন আগে সন্ত্রাসী আশিককে গ্রেপ্তার করা হলেও সে বের হয়ে এখন ভারতে অবস্থান করছে। সেখানে বসেই এই বাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

ট্রাকস্ট্যান্ড ঘিরে মাদকের অভিযোগ : পলাশনগর-বাউনিয়াবাঁধ মোড়সংলগ্ন রেললাইনের পাশে  ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রয়েছে ট্রাকস্ট্যান্ড ও অসংখ্য ঘুপচি বসতি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাড়িওয়ালা বলেন, এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন ছোট ছোট গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতাও চলে। কবরস্তানে বাঁশ-চাটাই আনা-নেওয়ায় মুশফিক ও শিশিরের প্রভাবে খাতে খাতে চাঁদা দিতে হচ্ছে। না দিলে কোপের ভয়। ফোরস্টার গ্রুপের ইব্রাহিম বাউনিয়াবাঁধ এলাকার এক ব্যবসায়ী থেকে ৩ লাখ টাকা চাঁদা নিয়ে যান। এ ঘটনায় পল্লবী থানায় জিডি করার পর সিভিল পোশাকে তদন্ত কর্মকর্তা ব্যবসায়ীর দোকানে গেলে তার উপস্থিতিতে দোকানে হামলা চালায় ইব্রাহীম গ্রুপের লোকজন। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তৌহিদুল হক বলেন, রাজনৈতিক নেতারা প্রকাশ্যে সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানের কথা বললেও রাজনীতিতে বিভিন্ন সময় সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করা হয়েছে। নির্বাচন, রাজনৈতিক প্র্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণ কিংবা এলাকায় প্রভাব বিস্তারের কাজে তাদের ব্যবহার করা হয়।

‘ভইরা দে’ গ্যাংয়ের ত্রাস : পল্লবীতে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও উদ্বিগ্ন। গত ১৭ জুন পল্লবী এলাকায় অভিযান চালিয়ে কথিত কিশোর গ্যাং ‘ভইরা দে’ গ্রুপের তিন সদস্য শিশির আহম্মেদ ইমন, আব্দুল্লাহ ও আল-আমিনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৪। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই গ্যাংয়ের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ভিডিও নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। আশিকুর রহমান শান্ত ওরফে আশিক এই গ্রুপের নেতৃত্ব দেন।

গোলাগুলি ও গ্রেপ্তার : পল্লবী এলাকায় সংঘটিত একটি গোলাগুলির ঘটনায় কুখ্যাত সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত মো. আকাশ ওরফে ‘টান আকাশ’কে গ্রেপ্তার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পল্লবী ও আশপাশের এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, ডাকাতি ও আধিপত্য বিস্তারে তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়। তার বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদকসহ অন্তত ১৩টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। গত ৭ আগস্ট মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের বি-ব্লকের একটি চায়ের দোকানের সামনে বিএনপির নেতা ও মাছের আড়তদার আলমগীর হোসেন এবং এক পথচারী নারী গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনায় গুলির ঘটনায় পাঁচজন গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত