ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শাহজালাল বাদশা রিপন। শিক্ষক পরিচয়কে সামনে রেখে তিনি গড়ে তোলেন অ্যাগ্রো ও স্টার্টআপ ব্যবসা। শিক্ষকের প্রতি আস্থায় ভরসা করে তার বিভিন্ন প্রকল্পে টাকা ঢেলেছিলেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও তরুণ উদ্যোক্তারা। কেউ কয়েক লাখ, কেউ কোটি টাকা। বিনিয়োগের মেয়াদ শেষ লাভ দূরের কথা, মূল টাকাই ফেরত পাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। দিনের পর দিন ঘুরে কেউ আইনি নোটিস দিয়েছেন, কেউ মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সহকারী প্রক্টর বাদশহর বিভিন্ন প্রকল্পে আটকে আছে প্রায় ১৫ কোটি টাকা। তবে বাদশা নিজে দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেছেন, বিনিয়োগকারীরা তার কাছে প্রায় ৯ কোটি টাকা পাবে।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে মিলেছে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে শাহজালাল বাদশার স্বাক্ষরিত চুক্তিপত্র, স্ট্যাম্পে স্বাক্ষরিত দায় স্বীকারের নথি, বিনিয়োগকারীদের হিসাব, আইনি নোটিস এবং সম্পদ কেনার দলিল। এ সব নথি এবং দুই শতাধিক বিনিয়োগকারীর অভিযোগ একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের অ্যাগ্রো ব্যবসার আড়ালে প্রতারণার চিত্রকে সামনে এনেছে।
শুধু ‘অ্যাগ্রো নেক্সট’ প্রকল্পেই শাহজালাল বাদশার কাছে বিনিয়োগকারীদের পাওনা ৪ কোটি ২৯ লাখ ৯১ হাজার ৪৬৫ টাকা। অ্যাগ্রো নেক্সটসহ ৯টি প্রকল্পে ২০৮ বিনিয়োগকারী মাছ, ছাগল, হাঁস, গরুসহ বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করেন। গত ১২ জুন স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে সেই দায় স্বীকার করে ৪ মাসের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করেন বাদশা, যার কপি দেশ রূপান্তরের কাছে রয়েছে। ইতিমধ্যে আড়াই মাস পেরিয়ে গেছে, কিন্তু এক টাকাও ফেরত দেননি তিনি।
প্রগ্রেসিভ ট্রেড নামের আরেকটি স্টার্টআপ প্রোগ্রামে বিনিয়োগ করেছেন একদল বিনিয়োগকারী। বিনিয়োগকারীদের একজন বলেছেন, বাদশার কাছে তাদের পাওনা প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর আগে প্রগ্রেসিভ ট্রেড নামের স্টার্টআপ প্রোগ্রামে শিক্ষার্থী ও তরুণদের সঙ্গে শাহজালাল বাদশা রিপনের ব্যবসা-বিনিয়োগের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শুরুতে লেনদেন স্বাভাবিক থাকলেও ২০২৫ সালের শুরুর দিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজেস (আইএমএল)-এর প্রভাষক হিসেবে যোগদানের পর থেকে নিয়মিত হিসাব প্রদান ও পাওনা পরিশোধে গড়িমসি শুরু করেন বাদশা। এ প্রোগ্রামে বিনিয়োগকারীরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৫ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত রিপনের কাছে পাওনা প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা। গত কয়েক মাসে পাওনার পরিমাণ আরও বেড়েছে। তারা বলেন, ‘একই গরু, দোকান, পণ্য ও খামার একাধিক বিনিয়োগকারীকে দেখিয়ে অর্থ হাতিয়েছেন রিপন। গবাদি পশুর ওষুধ ও খড় কেনার প্রকল্পে একই পণ্য দেখিয়ে একাধিক প্ল্যাটফর্মের কাছ থেকে বিনিয়োগ নিয়েছেন রিপন। খামার ভর্তি দেখাতে সাময়িকভাবে অন্যের গরু খামারে এনে নিজের বলে আমাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের ৬ শিক্ষার্থী ৬০ লাখ ৬০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেন বাদশার প্রকল্পে। ৬ লাখ টাকা ফেরত পেলেও বাকি টাকা পাননি তারা। এ নিয়ে ঢাকায় বাদশা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হাতাহাতি হয়েছে; দ্রুততম সময়ে টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছাড়া পান তিনি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া লালমনিরহাট জেলার শতাধিক শিক্ষার্থী ২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন বাদশার প্রকল্পে। বিনিয়োগের পর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন বাদশা। দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদকের কাছে বাদশা স্বীকার করেন, তার কাছে প্রগ্রেসিভ ট্রেড ৩ কোটি ৩৩ লাখ, ইলিশের বাড়ি ৩০ লাখ, ঢাবি সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের কৌশিক ৫০ লাখ, মনিরুজ্জামান ৯ লাখ, রোকন ৩ লাখ, আরও কয়েকজন বিনিয়োগকারী ৫০ লাখসহ বিভিন্ন প্রজেক্টে ৮ কোটি টাকা পাবে। অ্যাগ্রো নেক্সটের ৪ কোটি ২৯ লাখ ৯১ হাজার ৪৬৫ টাকাসহ ৯ কোটির বেশ টাকা পাবে বিনিয়োগকারীরা। বিভিন্ন নথি ও পাওনাদারদের দাবি অনুযায়ী বাদশার কাছে বিনিয়োগকারীদের পাওনা ১৫ কোটি টাকার বেশি।
বাদশা বলেছেন, ‘আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর ব্যবসায় অব্যবস্থাপনা শুরু হয়। অনেক জায়গায় বিনিয়োগ করে মূল টাকাই তুলতে পারছি না। বর্তমানে আমার বাবা ও ভাই ব্যবসা দেখাশোনা করেন লালমনিরহাটে। আমরা দ্রুত পাওনাদারদের টাকা পরিশোধ করে দেব।’
তিনি জানান, ‘আমাদের এ মুহূর্তে ৫টা প্রজেক্ট চলমান আছে, সবগুলো লালমনিরহাটে। ৫ কোটি টাকার বেশি সম্পত্তি আছে। পাওনা টাকা পরিশধ করব।’
বাদশার প্রতারণা থেকে বাদ যায়নি তার ব্যাচমেটও। তার ব্যাচমেট বলেন, ‘একসঙ্গে জহুরুল হক হলে একই রুমে ছিলাম। আমাকে জানাল তার গরুর ব্যবসায় ইনভেস্ট করতে, আমাকে ৪০% লাভ দেবে। সে অনুযায়ী আমি প্রথম দফায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেই। কয়েক মাস পর ৮ হাজার টাকা লাভ দেয় এবং বলে সামনে কোরবানি, অনেক অর্ডার আছে ভালো লাভ হবে, আরও টাকা ইনভেস্ট করো। তার কথামতো আরও ১ লাখ টাকা ইনভেস্ট করি। ঈদের পরে ওর কোনো খোঁজ পাই না, ফোন বন্ধ পাই। অনেক টেক্সট মেসেজ দেওয়ার পর সে আমাকে বলে কিছুদিন পরে টাকা দেবে। কিন্তু সেই টাকা আর ব্যাক দেয়নি। পরে শুনলাম, আমাদের হলের অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে আর ব্যাক দেয়নি।’
জানা গেছে, টিউশনের টাকা জমিয়ে মাত্র ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে অ্যাগ্রো ব্যবসায় নামেন বাদশা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকাকালে তার ব্যবসায়িক পলিসিতে আগ্রহী হয়ে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়তে থাকে। একের পর এক প্রজেক্ট চালু করেন তিনি। মাত্র ৫ বছরে তার বিভিন্ন প্রজেক্টে বিনিয়োগের পরিমাণ ১০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ২০২৪ সাল থেকে ব্যবসায়িক অংশীদারদের সঙ্গে প্রতারণা শুরু করেন বাদশা। শর্ত লঙ্ঘন করে বিনিয়োগের টাকায় বাবা, মা, ভাই ও স্ত্রীর নামে সম্পত্তি কেনা শুরু করেন। প্রজেক্ট থেকে ধীরে ধীরে টাকা সরিয়ে নিজের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে নিয়ে যান ও পারিবারিক সম্পত্তি বাড়াতে থাকেন। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকায় তার ও স্ত্রীর নামে ফ্ল্যাট ও প্লট রয়েছে।
সরেজমিনে আমাদের লালমনিরহাট প্রতিনিধি সদর উপজেলার ফকিরের তকেয়া গ্রামে গিয়ে দেখেন, বাদশার মূল গরুর খামারটি প্রায় শূন্য। তার পরিবারের বিভিন্ন সদস্য ও কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের প্রজেক্টের অধীনে মালামাল ও সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি টাকার সামান্য বেশি। এ ছাড়া, ডিলারশিপের ব্যবসায় প্রায় ২ কোটি টাকা বাজারে বকেয়া। পরিবারের দাবি, ১০টি গরু থেকে তাদের ৪০০ গরু হয়েছিল, ব্যবসায় উন্নতি ছিল। বাদশার মা সুলতানা রাজিয়া বলেন, পাওনাদারদের টাকা পরিশোধ করতে সব গরু বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এখন পুকুরগুলো ও অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো চলছে কোনো রকমে। রিপনের বাবা শামছুর রহমান বলেন, বর্তমানে টাকা-পয়সা কমে যাওয়ায় ব্যবসায় টান পড়েছে। মার্কেটের বকেয়া টাকাও উঠছে না।
বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, ঢাকায় বাদশা তার স্ত্রী, মা ও পরিবারের সদস্যদের নামে জমিসহ বিভিন্ন সম্পদ কিনেছেন। তার ব্যবসার বড় শক্তি ছিল তার পরিচয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এর সঙ্গে অ্যাগ্রো ব্যবসা ও স্টার্টআপের আকর্ষণীয় পরিকল্পনা। নতুন বিনিয়োগকারীদের কাছে ব্যবসাটি ছিল নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য। প্রগ্রেসিভ ট্রেড ও অ্যাগ্রো নেক্সট প্রজেক্টে বিনিয়োগকারীদের একজন বলেন, ‘আমরা তো কোনো অপরিচিত লোককে টাকা দিইনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিত মানুষ, পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এ কারণেই তাকে বিশ্বাস করেছি। এ বিশ্বাসের ওপর ভর করেই একেক জনের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে লাখ থেকে কোটি টাকা। কেউ দিয়েছেন ব্যক্তিগত সঞ্চয়, কেউ ব্যবসা বন্ধক রেখে টাকা দিয়েছেন।’
বিনিয়োগকারীদের বলা হয়েছিল, তাদের টাকা দিয়ে গরু কেনা হবে, খামার পরিচালনা করা হবে এবং নির্দিষ্ট সময় পর লাভসহ টাকা ফেরত দেওয়া হবে। কেউ কেউ দাবি করেছেন, বিনিয়োগকারীদের দেখানোর জন্য বাইরে থেকে গরু এনে খামারে রাখা হয়েছে।
চবি উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান বলেন, ‘অভিযোগ পেলে এ বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’