রাজধানীর উত্তরার সাপ্পোরো ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে শেষবর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে ইন্টার্নশিপের জন্য অপেক্ষা করছেন ফয়সাল আহম্মেদ। একই কলেজের শেষবর্ষের শিক্ষার্থী কাজী জহুরুল ইসলাম ওরফে সৌমিক মিলে গড়ে তোলেন লাশ চুরির পর কঙ্কাল পাচারের একটি চক্র। তারা কয়েক বছর ধরেই কলেজের শিক্ষার্থীদের কাছে এবং অনলাইনে নিজেদের গ্রুপের মাধ্যমে কঙ্কাল বিক্রি করতেন। এ কাজে জড়িত অন্তত সাতজনের একটি সক্রিয় চক্রকে শনাক্ত করা হয়েছে। চক্রের পাঁচ সদস্য কবর থেকে লাশ চুরির পর প্রক্রিয়া শেষে কঙ্কাল বিক্রি করতেন ফয়সাল ও সৌমিক।
গত সোমবার রাতে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের মণিপুরীপাড়া, তেজগাঁও কলেজ ও উত্তরা এলাকা থেকে ফয়সাল, সৌমিকসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৪৭টি মাথার খুলি ও বিপুলসংখ্যক মানবদেহের হাড়সহ কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়।
প্রথমে সৌমিককে আটকের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদে এর সঙ্গে জড়িত আরও বেশ কয়েকজনের নাম পাওয়া যায় এবং দুজন কঙ্কালসহ তেজগাঁও কলেজের সামনে অবস্থা করছে বলে তথ্য দেয়। পরে সেখান থেকে আবুল কালাম ও আসাদুল মুন্সী ওরফে জসিম ওরফে এরশাদকে দুটি মানব কঙ্কালসহ গ্রেপ্তার করা হয়।
গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ ইবনে মিজান।
তিনি বলেন, ‘রমজানের শুরু থেকে কঙ্কাল পাচারের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চলছে। সোমবার রাতে তেজগাঁও থানা-পুলিশ জানতে পারে তেজগাঁও মণিপুরীপাড়ার একটি জায়গায় মানব কঙ্কাল বিক্রির চেষ্টা হচ্ছে। পুলিশ সেখানে গিয়ে সৌমিকের সন্দেহজনক চলাচল দেখে জিজ্ঞাসাবাদ করে। একপর্যায়ে তার হেফাজত থেকে একটি মানব কঙ্কাল জব্দ করা হয়। তিনি আরও বলেন, সৌমিক উত্তরার একটি বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতালের শেষবর্ষের শিক্ষার্থী। তবে বাকি দুজন শিক্ষার্থী নয়। তাদের মধ্যে আবুল কালামের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালে কঙ্কাল উত্তোলনের অভিযোগেও মামলা হয়েছিল। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে মাদকসহ মানব কঙ্কাল উত্তোলন ও চুরির ঘটনায় বিভিন্ন থানায় ২১টি মামলা রয়েছে। আর আসাদুল মুন্সীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা রয়েছে।
ইবনে মিজান বলেন, গ্রেপ্তার তিনজনকে থানায় নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তারা একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে দেশব্যাপী এটা পরিচালনা করে আসছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানান, জব্দ করা তিনটি কঙ্কাল ছাড়াও উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরে সাপ্পোরো ডেন্টাল কলেজের হোস্টেলের একটি কক্ষে ৪৪টি মাথার খুলি ও মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের হাড় রয়েছে। পরে সেখান থেকে বিভিন্ন ব্যাগ ও বস্তায় রাখা আরও ৪৪টি মাথার খুলি ও মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের হাড় উদ্ধারসহ চক্রের হোতা ফয়সাল আহম্মেদকে আটক করা হয়। তিনি সাপ্পোরা ডেন্টাল কলেজ থেকে ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে ইন্টার্নশিপের জন্য অপেক্ষা করছেন। জিজ্ঞাসাবাদে ফয়সাল জানায়, বোনস সেলিং (হাড় বিক্রি) নামে তাদের একটি অনলাইন গ্রুপ আছে। সেখানে তাদের ৭০০ জন কাজ করে। গ্রুপটিতে ২০ হাজার সদস্য রয়েছে। কয়েক বছর ধরে দুই শিক্ষার্থী এই কঙ্কাল বিক্রির সঙ্গে জড়িত। এখন পর্যন্ত তারা কেউ ৫০টি, কেউ ২০টি কঙ্কাল বিক্রি করেছেন। তাদের সঙ্গে আরও অনেকে জড়িত রয়েছেন, যারা কবর থেকে লাশগুলো উত্তোলন করেন। তারা মূলত গাজীপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও জামালপুর অঞ্চল থেকে এসব কঙ্কাল নিয়ে আসেন।
ডিসি ইবনে মিজান আরও বলেন, মাঠপর্যায় থেকে তারা ছয় থেকে আট হাজার টাকায় কঙ্কালগুলো কেনেন। পরে সেগুলো ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। তারা কঙ্কাল বিক্রি করেন, তাদের কলেজে শিক্ষার্থীরা জানতেন। যখন কেউ অনলাইনে কঙ্কাল কেনার জন্য বুকিং দেয় তখন তারা এক-দুই সপ্তাহ সময় নেন। শিক্ষার্থীদের কাছে এবং যারা বিক্রি করত তাদের কাছেই তারা এসব কঙ্কাল বিক্রি করতেন। গ্রেপ্তার চারজনই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। লাশ কবরস্থ করার এক বছর পর তারা সেটা পর্যবেক্ষণ করে তুলে নিয়ে আসেন। এ ক্ষেত্রে অরক্ষিত কবরগুলোতেই এই কাজগুলো করতেন। যেসব কবরে সিসি ক্যামেরা নেই, পর্যাপ্ত আলো নেই, নিরাপত্তা নেই- সেসব কবর থেকেই তাদের লোকবল দিয়ে কঙ্কালগুলো সংগ্রহ করতেন। পরে কেমিক্যালের মাধ্যমে সেগুলো প্রক্রিয়া করে শিক্ষার্থীদের কাছে বিক্রি করতেন।
কোনো পরিবার বা স্বজন যদি তাদের স্বজনদের লাশের জন্য অভিযোগ করেন, তাহলে সেগুলো ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হবে বলে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।
