মাহাত্ম্যপূর্ণ ইবাদত ইতিকাফ। এটি আত্মশুদ্ধি, ইবাদতের প্রতি একাগ্রতা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের অনন্য মাধ্যম। রমজান মাসে ইতিকাফ করা অতি পুণ্যের কাজ। ইতিকাফ মানুষকে দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে দূরে সরিয়ে ইবাদতের পরিবেশে নিয়ে যায় এবং গভীর আত্মিক পরিবর্তন সৃষ্টি করে। ইতিকাফ আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ আবদ্ধ করা, আবদ্ধ থাকা বা অবস্থান করা। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় ইবাদতের উদ্দেশ্যে দুনিয়ার সব সম্পর্ক ছিন্ন করে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মসজিদে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলে। যিনি ইতিকাফ করেন, তাকে মুতাকিফ বলে। রমজানের শেষ ১০ দিনে (২০ রমজান সূর্যাস্তের পূর্ব থেকে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা পর্যন্ত) ইতিকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা আলাল কিফায়াহ।
ইবাদতের প্রধান কেন্দ্র মসজিদ। মসজিদের বিশেষ আমল হলো ইতিকাফ। তাই মহল্লার কয়েকজন পুরুষ ইতিকাফের নিয়ত করে মসজিদে অবস্থান করবেন। আর নারীরা ইতিকাফের নিয়তসহ নির্দিষ্ট ঘরে বা নির্ধারিত কক্ষে ইতিকাফ করবেন। প্রত্যেক মসজিদে অন্তত একজন হলেও ইতিকাফ করতে হবে। অন্যথায় মসজিদের আশপাশের সবাই গুনাহগার হবে। যারা ইতিকাফ করবেন তারা বিশেষ সওয়াবের অধিকারী হবেন। বিনা প্রয়োজনে অর্থাৎ গোসল, খাবার, প্রস্রাব-পায়খানা ছাড়া অন্য কোনো অজুহাতে ইতিকাফের স্থান ত্যাগ করা যাবে না। অজু-ইস্তিঞ্জা বা পবিত্রতার জন্য বাইরে বের হলেও কারও সঙ্গে কথা বলবেন না। ইতিকাফ অবস্থায় অনর্থক কথা ও কাজ পরিহার করে নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির-আজকার, তাসবিহ-তাহলিল, তওবা-ইস্তিগফার, দোয়া-দরুদ পাঠ, নফল নামাজ, এসব ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকতে হবে।
ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে শবেকদর প্রাপ্তির মাধ্যমে মহান আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য লাভ। বান্দা যখন দুনিয়ার সব সম্পর্ক ছিন্ন করে মহান আল্লাহর ঘর মসজিদে এসে মহান আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করে, তখন আল্লাহর সঙ্গে বান্দার একটি বিশেষ সম্পর্ক স্থাপন হয়। ইতিকাফের মাধ্যমে মসজিদে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখার কারণে দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসার ছেদ পড়ে এবং আত্মিক উন্নতির অভিজ্ঞতা অনুভূত হয়। ইতিকাফ করার কারণে ফেরেশতারা দোয়া করতে থাকে, ফলে ইতিকাফকারী ব্যক্তি আধ্যাত্মিকতার পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
ইতিকাফকারী মসজিদের পরিবেশে থাকার কারণে হৃদয়ে সত্যিকারের এক প্রশান্তি অর্জন করেন। কারণ তারা মহান আল্লাহর স্মরণে নিজেদের নিয়োজিত রাখেন এবং তাসবিহ-তাহলিল ও জিকির-আজকারে মশগুল থাকেন। ফলে তাদের হৃদয়ের উৎকর্ষ সাধন হয় ও প্রশান্তি অর্জন হয়। ইতিকাফ করার কারণে জামাতের সঙ্গে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ে অভ্যস্ত হওয়া যায় এবং অধিক পরিমাণে নফল ইবাদতের সুযোগ পাওয়া যায়। বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াতের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
ইতিকাফের কারণে সময়কে সুন্দরভাবে কাজে লাগানো যায়। ইতিকাফকারী গুনাহ থেকে বিরত থাকে। এ ছাড়া ইতিকাফকারী যতক্ষণ মসজিদে থাকবে ততক্ষণ তার সওয়াব হতে থাকবে। অধিকন্তু ইতিকাফকারীর জন্য রয়েছে প্রভূত কল্যাণ ও পুরস্কার। হাদিসে বর্ণিত আছে, ‘যে ব্যক্তি একনিষ্ঠমনে সওয়াবের আশায় ইতিকাফ করবে, তার সব সগিরা গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’
মুমিনের জীবনে ইতিকাফ যে পরিবর্তন আনে তা জানিয়েছেন যুগে যুগে আল্লাহপ্রেমী বুজুর্গরা। ইমাম আলাউদ্দিন কাসানি (রহ.) বলেছেন, ‘ইতিকাফ হলো দুনিয়ার সবকিছু থেকে বিমুখ হয়ে নির্জনে আল্লাহর ঘরে বসে তার নৈকট্য অর্জন করা এবং তার অবারিত রহমত ও ক্ষমা লাভের প্রত্যাশায় একান্তভাবে তার দিকে ধাবিত হওয়া।’ (বাদায়িউস সানায়ে ২/১০৮)
ইমাম হাসান ইবনে আম্মার (রহ.) বলেছেন, ‘ইতিকাফ যদি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর জন্য হয় তাহলে তা উত্তম ইবাদত। ইতিকাফের বৈশিষ্ট্য নানাবিধ। ইতিকাফকারী তার অন্তরকে দুনিয়া ও তার যাবতীয় বিষয়াদি থেকে মুক্ত করে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করে এবং নিজেকে মহাবিশ্বের অধিপতির দরবারে ফেলে রাখে।’ (মারাকিল ফালাহ ১/২৬৮)
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ইতিকাফকারী সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত থাকে এবং তার আমলনামায় এত বেশি নেকি লেখা হয় যেন সে নিজে সব নেক কাজ করেছে।’ (মিশকাত)
ইতিকাফের গুরুত্ব ও ফজিলতের কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এক দিন ইতিকাফ করবে, মহান আল্লাহ তার থেকে জাহান্নামকে তিন খন্দক দূরে সরিয়ে দেবেন। এক খন্দক হলো, আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী দূরত্বের চেয়েও বেশি দূরত্ব।’ (মুজামুল আওসাত ৭৩২৬)
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে নেকির প্রত্যাশায় ইতিকাফ করবে, তার পেছনের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (জামে সগির)
হুসাইন ইবনে আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানের শেষ ১০ দিনে ইতিকাফ করবে, সে দুটি হজ ও দুটি ওমরাহর সওয়াব পাবে।’ (শুয়াবুল ইমান)
ইতিকাফ মূলত আল্লাহর প্রতি একান্ত আত্মসমর্পণের একটি অনন্য ইবাদত। এই ইবাদতের মাধ্যমে মানুষ দুনিয়ার কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে এনে মহান আল্লাহর ঘরে অবস্থান করে তার স্মরণে সময় অতিবাহিত করে। এতে মানুষের অন্তর পরিশুদ্ধ হয়, ইমান দৃঢ় হয় এবং আখেরাতের প্রতি গভীর মনোযোগ সৃষ্টি হয়। যারা ইতিকাফের সৌভাগ্য লাভ করেন তারা আল্লাহর বিশেষ রহমতের অধিকারী হন। ইতিকাফের একটি বড় তাৎপর্য হলো, এটি মানুষকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং সময়কে কল্যাণময় কাজে ব্যয় করার শিক্ষা দেয়। মসজিদের পরিবেশে অবস্থান করার কারণে মানুষ জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায়ে অভ্যস্ত হয়, কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হয় এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত ইতিকাফের গুরুত্ব অনুধাবন করা এবং সুযোগ পেলে এই মহান ইবাদতে অংশ নেওয়া।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক
