ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সংঘাতে লিপ্ত ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের গ-ি পেরিয়ে বিশ্বম-লে ছড়িয়েছে, বিশেষ করে বিশ্ব জুড়ে তেলবাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে শুধু তেল খাতই নয় এই যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে দৈনন্দিন জীবনেও। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা এবং জবাবে তেহরানের পাল্টা আঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়ছে, বাতিল হচ্ছে বন্ধকী চুক্তি এবং খাবার থেকে শুরু করে স্মার্টফোন সবকিছুরই দাম বাড়ছে। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আঘাতের ফল এরই মধ্যে টের পেতে শুরু করেছেন ভোক্তারা। গতকাল শুক্রবার প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হবে বিশ্বের দরিদ্র মানুষকে।
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোর একটি হরমুজ প্রণালী। সেখানে তেল পরিবহন কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা তাদের মজুদ থেকে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি পরিমাণ জ্বালানি ছাড় করার পর তেলের দামে যে সাময়িক স্বস্তি এসেছিল, তা যে ক্ষণস্থায়ী সেটা প্রমাণিত হয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চল জুড়ে পরিবহন অবকাঠামোগুলোয় হামলা আরও তীব্র হয়েছে। তবে এই যুদ্ধের প্রভাব সব জায়গায় সমানভাবে পড়ছে না। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এশিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলো তাদের নিজেদের দেশের ওপর পড়া প্রভাব নিয়ে মেতে থাকলেও অন্য দেশগুলোকে তার চেয়ে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। এই যুদ্ধের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র ও অসহায় ব্যক্তিরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এই যুদ্ধ নতুন একটি মানবিক সংকট তৈরি করেছে। ইরান ও লেবাননে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্টের তথ্যমতে, দেশটির বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের পাশাপাশি ১৭ হাজারেরও বেশি আবাসিক ভবন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতি বিদ্যমান সংকটগুলোকেও আরও গভীর করছে। এই যুদ্ধ শুরু হয়েছে এমন এক সময়ে যখন যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপকভাবে বিশ্বব্যাপী সহায়তা কমিয়েছে, আন্তর্জাতিক সহায়তায় লাগাম টেনেছে যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য দেশও। এর ফলে বিশ্বের লাখ লাখ মানুষ আরও দুর্দশার মধ্যে পড়েছে। ইসরায়েল সীমান্ত পারাপারের জায়গাগুলো বন্ধ করে দেওয়ার পর গাজায় খাবারের দাম বেড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস এবং বিভিন্ন দেশের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিসহ অন্যান্য সংস্থাগুলো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল থেকে জরুরি ত্রাণ পাঠাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। মানবিক ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে দুবাই, মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় কনটেইনার টার্মিনাল সেখানে। আকাশে ধ্বংস করা একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ার পর ওই টার্মিনালে আগুন ধরে যায়।
কোম্পানিগুলো এখন কনটেইনারপ্রতি প্রায় ৩ হাজার ডলার জরুরি সারচার্জ বা অতিরিক্ত মাশুল আরোপ করছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডাব্লিউএফপি) জানিয়েছে যে, এই সংকটের কারণে ভারত থেকে সুদান পর্যন্ত তাদের পণ্য পরিবহনের পথে অতিরিক্ত ৯,০০০ কিলোমিটার দূরত্ব বেড়ে গেছে। সুদান বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে শুধু ত্রাণ পরিবহনের খরচই বেড়ে যায় না, বরং অন্যান্য অনেক খরচও বেড়ে যায়। যেমন ক্লিনিকগুলোয় জেনারেটর চালানোরও খরচও এতে বেড়ে যায়। স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সুদানের চাহিদার প্রায় অর্ধেক সার মধ্যপ্রাচ্য থেকে যায়। অনেক দেশে প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স কমেছে। ধনী প্রবাসীদের মতো ওই শ্রমিকদের উপসাগরীয় অঞ্চল ছেড়ে যাওয়ার সামর্থ্য নেই, উল্টো তারা পর্যাপ্ত কাজ পেতেও সংগ্রাম করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের স্যাম ভিগারস্কি একটি ঘনীভূত ‘বহুমাত্রিক সংকটের’ বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, এই সংকট ক্ষুধার্তদের আরও জরুরি পরিস্থিতির দিকে এবং যারা ইতিমধ্যেই জরুরি অবস্থার মধ্যে আছেন, তাদের দুর্ভিক্ষের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। লাখো মানুষের জন্য এই অর্থনৈতিক ধাক্কা শুধু দারিদ্র্য নয়, বরং এটি তাদের জন্য বাঁচা-মরার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে। আকাশপথে চলাচলে বিধিনিষেধের মধ্যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে মানবিক ত্রাণসামগ্রী নিরাপদে পারাপারের সুযোগ তৈরি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য জাতিসংঘ ও অন্যরা যৌক্তিকভাবেই চাপ দিচ্ছে। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এই ধ্বংসাত্মক ও বেআইনি যুদ্ধের অবসান। যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা এমন একটি সংঘাতের জন্য অর্থ দিচ্ছেন, যার কোনো যৌক্তিকতা তারা দেখতে পাচ্ছেন না। অন্তত ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দ্রুত এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চাপ দেওয়ার মতো সম্মিলিত ক্ষমতা তাদের রয়েছে। এই সংঘাতের একটি বাস্তব সমাপ্তি টানা বেশ কঠিন বলেই প্রমাণিত হতে পারে। অন্যদিকে, যারা আরও অনেক বেশি অর্থনৈতিক কষ্টের মধ্যে পড়ছেন, তাদের শুধু ভোগান্তি পোহানো এবং অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।
