২০২৬ সালের মার্চ মাস। বিশ্ব রাজনীতির ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র যেন এক উত্তাল সাগর। ইউক্রেনের মাটিতে রাশিয়ার সামরিক অভিযান থামার কোনও লক্ষণ দেখাচ্ছে না; বরং তা ক্রমশ দীর্ঘস্থায়ী এক সংঘাতে পরিণত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিনের ছায়াযুদ্ধ এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাবকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা এই মুহূর্তে চরমে পৌঁছে গেছে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তাইওয়ান ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক তৎপরতা বাড়ছে। ঠিক এমন এক সন্ধিক্ষণে 'এন্ডগেম' অনুষ্ঠানের ২৫৮তম পর্বে উপস্থিত হয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণের জীবন্ত কিংবদন্তি, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্বের 'আক্রমণাত্মক বাস্তববাদ' (Offensive Realism) ধারার প্রধান স্থপতি অধ্যাপক জন মিয়ারশেইমার শেয়ার করলেন তার বিশ্লেষণ। তিনি এই ভূ-রাজনৈতিক জটিলতাকে নিজস্ব তাত্ত্বিক কাঠামোতে ব্যাখ্যা করেছেন। তার বিশ্লেষণ শুধু ঘটনার বিবরণ নয়, বরং পশ্চিমা নীতির অন্তর্নিহিত ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে এবং এক বহুমেরু বিশ্বে শক্তির নতুন সমীকরণ নিয়ে আমাদের সতর্ক করে দেয়।
গীতা বীরজাওয়ানের সঞ্চালনায় এই সাক্ষাৎকারটি নিছক একটি সাক্ষাৎকার নয়; এটি এক তাত্ত্বিকের চোখে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার এক গভীর অটোপসি, যেখানে ঘটনার পৃষ্ঠভাগে যা দেখা যায়, তার নিচের স্তরে স্তরে লুকিয়ে থাকা শক্তি, স্বার্থ ও কৌশলের জটিল জালকে উন্মোচন করেন মিয়ারশেইমার। তার বিশ্লেষণের ভিত্তি 'বাস্তববাদ' (Realism) তত্ত্বের এই বিশেষ শাখাটি রাষ্ট্রের আচরণকে মূলত শক্তি সঞ্চয় ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের অনিবার্য প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখে। এই প্রবন্ধে আমি সেই সাক্ষাৎকারের গভীরে প্রবেশ করে এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করব—তার তাত্ত্বিক ভিত্তি, পরাশক্তিদের ভূমিকা এবং বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ওপর এর প্রভাব, পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের অভিমত।
সাক্ষাৎকারটির তাৎপর্য এখানেই যে এটি প্রচলিত পশ্চিমা-কেন্দ্রিক ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং মার্কিন-চীন দ্বন্দ্বের একটি বিকল্প, অত্যন্ত যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা দিতে পেরেছে। মিয়ারশেইমারের বক্তব্য অনেকের কাছে অস্বস্তিকর ও বিতর্কিত মনে হলেও, তা উপেক্ষা করার মতো নয়, বিশেষ করে যখন বিশ্ব সত্যিই এক বৃহত্তর সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
বাস্তববাদের চোখে বিশ্ব ও মিয়ারশেইমারের তাত্ত্বিক ভিত্তি
মিয়ারশেইমার 'আক্রমণাত্মক বাস্তববাদে' বিশ্বাসী। এই মতবাদ অনুসারে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা নৈরাজ্যময় (Anarchic); এখানে কোনও কেন্দ্রীয় সরকার নেই যা রাষ্ট্রগুলোর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে প্রতিটি রাষ্ট্রকেই নিজের নিরাপত্তা নিজেকে নিশ্চিত করতে হয়। এই অনিশ্চয়তায় রাষ্ট্রগুলো শুধু নিরাপদ থাকতে চায় না, তারা আঞ্চলিক আধিপত্য অর্জনের চেষ্টা করে, কারণ তারা মনে করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এটাই একমাত্র পথ। এই তত্ত্বের আলোকে তিনি যুক্তি দেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯১ সালের পর থেকে একমাত্র বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে এবং অন্য কোনও আঞ্চলিক শক্তির উত্থান ঠেকাতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরান সংকটের মূলে রয়েছে এই একক আধিপত্য বজায় রাখার মার্কিন প্রচেষ্টা এবং তার প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়া ও চীনের মতো শক্তির পাল্টা পদক্ষেপ।
তার এই বিশ্লেষণের সঙ্গে ফরাসি রাষ্ট্রচিন্তাবিদ রেমন্ড অ্যারনের মতের মিল খুঁজে পাওয়া যায়, যিনি বলেছিলেন, "রাজনীতি সম্ভাবনার শিল্প, কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক হলো পছন্দের বিজ্ঞান।" রাষ্ট্রগুলো তাদের আশপাশের শক্তির ভারসাম্য দেখে পথ বেছে নেয়। মিয়ারশেইমার দেখান, ইউক্রেনকে ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত ছিল পশ্চিমাদের একটি 'পছন্দ', যা রাশিয়ার জন্য ছিল জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। অধ্যাপক স্টিফেন ওয়াল্ট, হার্ভার্ডের কেনেডি স্কুলের অধ্যাপক এবং মিয়ারশেইমারের সহ-লেখক, এই বিশ্লেষণকে সমর্থন করে বলেন, "মিত্রতা সম্প্রসারণের এই নীতি রাশিয়াকে কোণঠাসা করেছে, এবং একটি বড় শক্তিকে কোণঠাসা করা কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ নয়।"
ইউক্রেন যুদ্ধ: পশ্চিমা মেরুকরণের ভুল হিসাব
মিয়ারশেইমারের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার মূল কারণ পুতিনের সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, বরং এটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোটের একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অনিবার্য ফল। তিনি বারবার বলেছেন, ইউক্রেনকে রাশিয়ার 'সফট বেলি' বা কৌশলগত গভীরতা থেকে ছিঁড়ে নিয়ে পশ্চিমা শিবিরে যুক্ত করার প্রচেষ্টা ক্রেমলিনের জন্য ছিল অসহনীয়। ২০০৮ সালের বুখারেস্ট শীর্ষ সম্মেলনে ইউক্রেন ও জর্জিয়াকে ন্যাটোর সদস্য করার প্রতিশ্রুতি মিয়ারশেইমার 'মৌলিক ভুল' হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই সিদ্ধান্ত রাশিয়ার শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের মনে গভীর অনাস্থা ও হুমকির অনুভূতি তৈরি করে।
তার এই যুক্তি অনেক পশ্চিমা সমালোচকের কাছে অগ্রহণযোগ্য। তাদের মতে, পুতিনের রাশিয়া একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র যা তার প্রতিবেশীদের ওপর বল প্রয়োগ করে। কিন্তু মিয়ারশেইমার প্রশ্ন তোলেন, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র তার সীমান্তে একটি প্রতিকূল সামরিক জোটকে মেনে নেবে কেন? তিনি শীতল যুদ্ধের সময়কার মার্কিন নীতি নির্ধারক এবং পরবর্তীতে ন্যাটো সম্প্রসারণের তীব্র সমালোচক জর্জ কেনানের উদ্ধৃতি দেন, যিনি সতর্ক করে গিয়েছিলেন যে এটি একটি দুঃখজনক ভুল হবে এবং নতুন শীতল যুদ্ধের সূচনা করবে।
এই বিশ্লেষণের সঙ্গে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গ্যারি জে. বাসের মতের পার্থক্য রয়েছে। বাস মনে করেন, রাশিয়ার আগ্রাসন মূলত তার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও সাম্রাজ্যিক নস্টালজিয়া থেকে উদ্ভূত, পশ্চিমা নীতি থেকে নয়। তবে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর সিনিয়র ফেলো চার্লস কুপচান মিয়ারশেইমারের কাছাকাছি গিয়ে বলেন, "মহাশক্তিগুলোর নিজস্ব প্রভাব বলয় থাকে এবং সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ করা বিপজ্জনক। ইউক্রেন ইস্যুতে পশ্চিমা নীতিতে বাস্তববোধের অভাব ছিল।"
মধ্যপ্রাচ্যে আগুন: ইরান, ইসরায়েল ও মাল্টিপুলার বিশ্ব
এখন মধ্যপ্রাচ্যের দিকে চোখ ফেরানো যাক। মিয়ারশেইমার মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিকে একই বাস্তববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। ইরান ও ইসরায়েলের সংঘাতকে তিনি দেখেন আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াই হিসেবে। ইসরায়েল তার প্রযুক্তিগত ও সামরিক সুবিধা (বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্র) ব্যবহার করে ইরানকে দুর্বল রাখতে চায়, কারণ একটি শক্তিশালী ইরান তার অস্তিত্বের জন্যই হুমকি। অন্যদিকে, ইরান তার শিয়া মিত্রদের নেটওয়ার্ক (লেবাননের হিজবুল্লাহ, সিরিয়ার আসাদ সরকার, ইয়েমেনের হুতি) ব্যবহার করে ইসরায়েলকে ঘিরে রাখার কৌশল নিয়েছে।
এই বিশ্লেষণে তিনি একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছেন ইরান ও চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের আলোচনার মাধ্যমে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে ইরান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে চীনের দিকে ঝুঁকছে। চীন ইরান থেকে সস্তায় তেল কিনছে এবং বিনিময়ে বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা সহযোগিতা দিচ্ছে। এটি শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়; এটি একটি সংকেত যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার যুগ শেষ হতে চলেছে এবং চীন তার নিজস্ব শক্তি দিয়ে একটি নতুন অর্থনৈতিক জোট গড়ে তুলছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফারজানা শেখ মনে করেন, চীন ইরানকে ব্যবহার করছে মধ্যপ্রাচ্যে তার পদচিহ্ন বাড়াতে এবং মার্কিন প্রভাবকে প্রতিহত করতে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশল, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় নতুন মেরুকরণ তৈরি করছে।
তিনি ইসরায়েলের ইরান নীতিকে আত্মঘাতী বলে মন্তব্য করেছেন। ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা বা শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের হত্যা ইরানকে দুর্বল করেনি, বরং তার প্রতিশোধপরায়ণতা বাড়িয়েছে এবং পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পক্ষে যুক্তি শক্তিশালী করেছে। এখানে 'খেলা তত্ত্বের' (Game Theory) এর একটি ধারণা 'সেফটি-ভার্সেস-অটোনমি' ডাইলেমা কাজ করে। ইসরায়েল নিজের নিরাপত্তা চায়, কিন্তু তার আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ ইরানের স্বায়ত্তশাসন ও আত্মসম্মানে আঘাত করে, যা দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের নিরাপত্তাকেই বিপন্ন করে তোলে।
পূর্ব এশিয়া: আগামীর সংঘাতের কেন্দ্রভূমি
মিয়ারশেইমারের মতে, পূর্ব এশিয়া ভূ-রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় সবার ওপরে। তিনি তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'দ্য ট্র্যাজেডি অফ গ্রেট পাওয়ার পলিটিক্স'-এ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে চীনের উত্থান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য রক্ষার প্রচেষ্টা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তীব্র দ্বন্দ্ব তৈরি করবে। তাইওয়ান ইস্যুটি এই দ্বন্দ্বের সবচেয়ে স্পষ্ট রূপ। চীন তাইওয়ানকে তার ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে এবং একে আলাদা করার যেকোনো প্রচেষ্টাকে যুদ্ধের কারণ হিসেবে দেখে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে গণতন্ত্রের মডেল ও কৌশলগত অবস্থান হিসেবে ব্যবহার করে চীনের উত্থান ঠেকাতে চায়।
হার্ভার্ডের বিশিষ্ট রাজনীতি বিজ্ঞানী গ্রাহাম অ্যালিসন 'থুসিডাইডস ট্র্যাপ' ধারণা দিয়ে এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, যখন একটি প্রতিষ্ঠিত শক্তি (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) এবং একটি উদীয়মান শক্তি (চীন) মুখোমুখি হয়, তখন যুদ্ধের সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায়। ইতিহাসে প্রায় ১২টির মধ্যে ১১টি ক্ষেত্রে এমন দ্বন্দ্ব যুদ্ধে গিয়ে পৌঁছেছে। মিয়ারশেইমার আশঙ্কা করেন, তাইওয়ান নিয়ে যুদ্ধ হলে তা শুধু দ্বিপাক্ষিক থাকবে না, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এমনকি রাশিয়াও এতে জড়িয়ে পড়তে পারে। এটি হবে অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অঞ্চলে একটি সর্বগ্রাসী সংঘাত, যা পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকিও তৈরি করবে।
সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার তার শেষ জীবনে বারবার সতর্ক করে গেছেন, আমেরিকা ও চীনকে অবশ্যই একটি নতুন শীতল যুদ্ধ এড়াতে হবে এবং তাইওয়ান ইস্যুতে উভয়কেই সংযম দেখাতে হবে। মিয়ারশেইমারের বিশ্লেষণ কিসিঞ্জারের এই বাস্তববাদী সতর্কবার্তাকেই প্রতিধ্বনিত করে।
পরাশক্তিদের ভূমিকা: দ্বন্দ্বের নেপথ্য নাট্যকার
এই আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, পরাশক্তিধর দেশগুলোই কোনো না কোনোভাবে এইসব দ্বন্দ্বের নেপথ্য নাট্যকার। এই সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে তিনটি প্রধান শক্তি—যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া।
যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর যেসব প্রতিষ্ঠান (আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ) ও জোট (ন্যাটো) গড়ে তুলেছিল, সেগুলোর মাধ্যমে লিবারেল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু মিয়ারশেইমার মনে করেন, এই ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি ছিল উদারনীতি নয়, বরং মার্কিন জাতীয় স্বার্থ। যখনই এই প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী হয়েছে, ওয়াশিংটন সেগুলোকে এড়িয়ে গেছে, উপেক্ষা করেছে বা ধ্বংস করে দিয়েছে। ইরাক আক্রমণ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর নিষেধাজ্ঞা—সবই এর উদাহরণ। বর্তমানে তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকে 'অহংকারী ও অনমনীয়' বলে বর্ণনা করেন, যা বিশ্বে মার্কিন প্রভাবকে দুর্বল করছে।
অন্যদিকে চীন ধীরে ধীরে তার অর্থনৈতিক শক্তিকে সামরিক ও কূটনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এর মাধ্যমে সে বিশ্বের বিভিন্ন অংশে পরিকাঠামো বিনিয়োগ করে অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা তৈরি করছে। মিয়ারশেইমার মনে করেন, চীন পশ্চিমা ব্যবস্থাকে উৎখাত করতে চায় না, বরং সেই ব্যবস্থার মধ্যেই নিজের প্রভাব বাড়িয়ে একে নিজের অনুকূলে নিয়ে যেতে চায়। দক্ষিণ চীন সাগরে তার সামরিক তৎপরতা এবং তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে সামরিক মহড়া এটাই প্রমাণ করে যে চীনের অর্থনৈতিক শক্তি এখন ধীরে ধীরে সামরিক শক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে।
রাশিয়া পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে একীভূত হওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। মিয়ারশেইমারের ভাষায়, ইউক্রেন যুদ্ধ রাশিয়াকে পুরোপুরি পশ্চিম থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে এবং তাকে চীনের কাছে ঠেলে দিয়েছে। রাশিয়া এখন নিজেকে একটি স্বতন্ত্র সভ্যতা হিসেবে দেখে, যা পশ্চিমা উদারনীতির বিপরীতে রক্ষণশীল মূল্যবোধ ও বহুমেরু বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করে। এই তিন শক্তির মধ্যকার টানাপোড়েন একটি নতুন বৈশ্বিক স্থাপত্য তৈরি করছে, যেখানে জোটগুলো নমনীয় ও পরিস্থিতিভিত্তিক হবে এবং হতে বাধ্য হবে।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রভাব
বৈশ্বিক এই মহাশক্তির দ্বন্দ্বের প্রভাব বাংলাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ওপর সুদূরপ্রসারী হবে। এর স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা জরুরি।
স্বল্পমেয়াদী প্রভাব হিসেবে প্রথমেই আসে অর্থনৈতিক ধাক্কা। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম যেমন বেড়েছিল, তেমনই মধ্যপ্রাচ্যে বড় কোনো সংঘাত শুরু হলে তা পণ্যের দামে অস্থিরতা তৈরি করবে। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতি, যা আমদানিনির্ভর। জ্বালানি, খাদ্যশস্য (গম) ও ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে, যা রেমিট্যান্স-নির্ভর অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে। দ্বিতীয়ত, প্রবাসী আয়। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়লে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারে বাংলাদেশি কর্মীদের চাকরি ও আয় অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। তৃতীয়ত, রপ্তানি বাণিজ্য। পশ্চিমা দেশগুলোতে মন্দা দেখা দিলে তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়বে, যা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস।
দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব আরও জটিল হতে পারে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো সরবরাহ শৃঙ্খলের (Supply Chain) পুনর্বিন্যাস। মহামারি ও যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে পশ্চিমা বিশ্ব এখন 'ডিরিস্কিং'-এর কৌশল নিচ্ছে, অর্থাৎ চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো হচ্ছে। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো যেমন এর সুবিধা নিচ্ছে, বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি সুযোগ হতে পারে। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নত পরিকাঠামো ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ।
ভূরাজনৈতিকভাবেও বাংলাদেশ একটি সূক্ষ্ম অবস্থানে রয়েছে। মার্কিন-চীন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি (Balancing Diplomacy) অনুসরণ করতে হবে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সাথে রাজনৈতিক, কুটনৈতিক ও পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এদিকে চীনের বিপুল বিনিয়োগ (পদ্মা সেতু, পায়রা বন্দর, কর্ণফুলী টানেল) ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের সমর্থন রয়েছে; অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জরুরি। বাংলাদেশকে নিশ্চিত করতে হবে যে সে যেন কোনো শক্তির সামরিক ঘাঁটি বা সরাসরি সংঘাতের অংশ না হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো (আসিয়ান) একই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তারা নিজেদের কেন্দ্রীয় অবস্থান বজায় রাখতে চায়, কিন্তু মহাশক্তিগুলোর চাপে বিভক্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফিলিপাইন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, অন্যদিকে কম্বোডিয়া ও লাওস চীনের পৃষ্ঠপোষকতায় রয়েছে। এই বিভক্তি আসিয়ানকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
গণতন্ত্রের ভঙ্গুরতা ও রাজনৈতিক দর্শনের সংকট
মিয়ারশেইমারের বিশ্লেষণের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তিনি গণতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদের দ্বন্দ্বকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল চালিকা শক্তি হিসেবে দেখতে নারাজ। তার মতে, রাষ্ট্রের আচরণ নির্ধারণ করে তার অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা নয়, বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বাস্তবতা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রও কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের মতোই নিজের শক্তি ও নিরাপত্তা বাড়ানোর চেষ্টা করে। ইউক্রেন যুদ্ধে পশ্চিমারা একে 'গণতন্ত্র বনাম স্বৈরতন্ত্র' হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইলেও, মিয়ারশেইমার সেটিকে বাস্তবতা থেকে পালানোর অজুহাত হিসেবে দেখেন।
এই প্রসঙ্গে আমরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা নিয়ে ভাবতে পারি। পশ্চিমা গণতন্ত্রগুলো অভ্যন্তরীণভাবে ক্রমশ মেরুকৃত হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রে ক্যাপিটল হিলে হামলা, ফ্রান্সে 'ইয়েলো ভেস্ট' আন্দোলন, ব্রিটেনে ব্রেক্সিট—সবকিছুই দেখায় যে জনগণের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা কমছে। ফলে এসব সরকারের পররাষ্ট্রনীতিও অনিশ্চিত ও দোদুল্যমান হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, চীন তার অর্থনৈতিক সাফল্যকে ব্যবহার করে একটি ভিন্ন মডেল উপস্থাপন করছে, যেখানে উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতাকে ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর প্রাধান্য দেওয়া হয়। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেমস স্কট এই ধরনের রাষ্ট্রকে 'হাই-মডার্নিস্ট স্টেট' হিসেবে বর্ণনা করেন, যা জটিল সামাজিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে সরলীকৃত, প্রযুক্তিগত সমাধান চাপিয়ে দেয়।
রাজনৈতিক দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে, আমরা হবসীয় বাস্তবতা ও কান্টীয় আশাবাদের দ্বন্দ্ব দেখতে পাই। হবস যেমন বলেছিলেন, মানুষের জীবন 'নিঃসঙ্গ, দারিদ্র্যপূর্ণ, নোংরা, পাশবিক ও ক্ষণস্থায়ী'—এই রাষ্ট্রগুলোও যেন সেই অবস্থায় আছে। অন্যদিকে কান্টের চিরস্থায়ী শান্তির ধারণা, যেখানে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধ করে না, তা এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। মিয়ারশেইমার হবসের কাছেই ফিরে যেতে বলেন। তিনি মনে করেন, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো বিশ্বরাষ্ট্র না গঠিত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এই দ্বন্দ্ব অনিবার্য।
নতুন বিশ্ববিন্যাসের সন্ধানে
পরিশেষে বলতে চাই, পৃথিবীর ভুক্তভোগী দেশগুলোর এখন নতুন বিশ্ববিন্যাসের সন্ধানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতি নির্মাণ করা উচিত। আমি মনে করি, জন মিয়ারশেইমারের এই সাক্ষাৎকারটি একটি জ্বলন্ত বার্তা বহন করে। এটি আমাদের স্পষ্টভাবে জানান দেয় যে ইউক্রেন থেকে গাজা, তাইওয়ান প্রণালী থেকে দক্ষিণ চীন সাগর—প্রতিটি স্থানেই মহাশক্তির প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে। তার বিশ্লেষণ কঠোর বাস্তবতার নিরিখে আমাদের সতর্ক করে যে, নৈতিকতা বা আদর্শ নয়, শক্তি ও স্বার্থই শেষ কথা বলে।
এই নতুন বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলোর নিজেদের কৌশল পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য সামনে আছে বিপদ, কিন্তু আছে সুযোগও। মহাশক্তির দ্বন্দ্বকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে অর্থনৈতিক উন্নতি ত্বরান্বিত করা সম্ভব, যদি কূটনীতি সতর্ক ও দূরদর্শী হয়। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই টানাপোড়েন যেন কোনোভাবেই সরাসরি সংঘাতে রূপ না নেয়, কারণ সেই আগুনের ফুলকি সহজেই শুকনো ঘাসে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়তে পারে।
শেষ পর্যন্ত মিয়ারশেইমার আমাদের মনে করিয়ে দেন, ইতিহাসের করুণ পরিহাস হলো, মানুষ যুদ্ধ চায় না, কিন্তু যুদ্ধের প্রস্তুতি না নেওয়ার অর্থ নিজের অস্তিত্ব বিলিয়ে দেওয়া। এই চিরন্তন ট্র্যাজেডির মঞ্চ এখন সারা বিশ্ব। দর্শক নয়, আমাদের সবাই এই নাটকের চরিত্র। আর এই চরিত্র হিসেবে আমাদের অভিনয় নির্ভর করবে আমরা বাস্তবতাকে কতটা গভীরভাবে বুঝতে পারি এবং তার ওপর ভিত্তি করে কতটা বিচক্ষণ পদক্ষেপ নিতে পারি।
(লেখক একজন প্রাবন্ধিক, কবি, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক)
