মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দ্বিগুণের বেশি দামে আরও দুই কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। যুক্তরাজ্য থেকে এ দুই কার্গো এলএনজি কেনা হবে। এতে ব্যয় হবে ১ হাজার ৬৬৬ কোটি ৭৯ লাখ ১৩ হাজার ২৪ টাকা। গতকাল বুধবার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই এলএনজি আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির আহ্বায়ক অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
একই সভায় টিসিবির কার্ডধারী নিম্নআয়ের এক কোটি পরিবারের কাছে ভর্তুকি মূল্যে বিক্রির জন্য এক কোটি লিটার পরিশোধিত পাম তেল কেনার প্রস্তাবসহ আরও বেশি কিছু প্রস্তাব অনুমোদন হয়েছে।
এলএনজি ক্রয় প্রস্তাবের বিষয়ে জানা গেছে, গত ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে বাড়তি দামে আরও তিন কার্গো এলএনজি আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে উত্তর কোরিয়া থেকে দুই কার্গো এবং যুক্তরাজ্য থেকে এক কার্গো এলএনজি আনার সিদ্ধান্ত হয়। এই তিন কার্গো এলএনজি আমদানিতে ব্যয় ধরা হয় ২ হাজার ৬৫৪ কোটি ৫৪ লাখ ৬৩ হাজার ২৮০ টাকা।
বৈঠকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫ এর বিধি-১০৫(৩) (ক)-অনুসরণে আন্তর্জাতিক কোটেশন সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় স্পট মার্কেট থেকে দুই কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব নিয়ে আসে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। কমিটি এ প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে।
এর মধ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক টোটাল এনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড এই দুই কার্গো এলএনজি সরবরাহ করবে। প্রতি কার্গো এলএনজির দাম ধরা হয়েছে ৮৩৩ কোটি ৩৯ লাখ ৫৬ হাজার ৫১২ টাকা। সে হিসাবে দুই কার্গো এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হবে ১ হাজার ৬৬৬ কোটি ৭৯ লাখ ১৩ হাজার ২৪ টাকা।
এর আগে গত ১১ মার্চ যুক্তরাজ্যের টোটাল ইঞ্জিনিয়ারিং গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড থেকে এক কার্গো এলএনজি ৯০৭ কোটি ৮৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩০৪ টাকা দিয়ে আমদানি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার পসকো ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন থেকে প্রতি কার্গো এলএনজি ৮৭৩ কোটি ৩৪ লাখ ৯৯ হাজার ৪৮৮ টাকা দরে দুই কার্গো আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়।
অর্থাৎ, আগের তুলনায় এখন কিছুটা কম দামে এলএনজি কিনতে পারছে সরকার। তবে গত ডিসেম্বরের তুলনায় এখনো এলএনজি কিনতে সরকারকে দ্বিগুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
গত বছরের ৯ ডিসেম্বরে যুক্তরাজ্যের টোটাল ইঞ্জিনিয়ারিং গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড থেকে এক কার্গো এলএনজি ৪৩৬ কোটি ৭ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫২ টাকায় কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অন্যদিকে বৈঠকে স্থানীয়ভাবে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে এক কোটি লিটার পরিশোধিত পাম তেল পাঁচটি লটে কেনার একটি প্রস্তাব উত্থাপন করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। স্থানীয়ভাবে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হলে ১৬টি দরপ্রস্তাব জমা পড়ে। সব প্রস্তাবই টিইসি (দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি) কর্তৃক রেসপনসিভ বিবেচিত হয়।
দরপ্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাইসহ সব প্রক্রিয়া শেষে টিইসি পাঁচটি লটে সুপারিশ করা রেসপনসিভ সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান শবনম ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজের কাছ থেকে এক কোটি লিটার পরিশোধিত পাম তেল ১৬৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকায় কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। টিসিবির গুদাম পর্যন্ত পরিবহন খরচসহ প্রতি লিটার পাম তেলের দাম পড়বে ১৬৩ টাকা ৪৮ পয়সা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভোজ্য তেল কেনার লক্ষ্যমাত্রা ২৩ কোটি লিটার। এ পর্যন্ত ক্রয়চুক্তি সম্পাদন হয়েছে ৬ কোটি ৫ লাখ লিটার।
এ ছাড়া বৈঠকে ‘সার সংরক্ষণ ও বিতরণের সুবিধার্থে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ৩৪টি বাফার গুদাম নির্মাণ’ প্রকল্পের আওতায় চুয়াডাঙ্গা জেলায় ১০ হাজার টন ধারণক্ষমতার একটি বাফার গুদাম নির্মাণের পূর্ত কাজের ক্রয় প্রস্তাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় হবে ৪৩ কোটি ১৫ লাখ ২৮ হাজার ৮৫৯ টাকা।
জানা গেছে, মাঠপর্যায়ে ইপিআই কার্যক্রম চলমান রাখতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সব রুটিন ইপিআই ভ্যাকসিন নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহের জন্য সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ইউনিসেফের মাধ্যমে কেনার প্রস্তাব গত ৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়।
পরবর্তীতে এডিবির নির্ধারিত ফরমেট অনুসরণ করে ইউনিসেফ-জিআই কাছে প্রাইস অফার আহ্বান করা হলে তারা প্রস্তাব দখিল করে। টিইসি কর্তৃক প্রস্তাবটি যাচাই-বাছাই করে নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে সুপারিশ করা দরদাতা প্রতিষ্ঠান ইউনিসেফের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ পাঠানোর মাধ্যমে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে সব রুটিন ইপিআই ভ্যাকসিন (১০ ধরনের ভেকসিন) ৬০৪ কোটি ৫ লাখ ৫ হাজার ৮৯৫ টাকায় কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অন্য এক প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে বৈঠকে ‘বাপবিবো’র বৈদ্যুতিক বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ক্ষমতাবর্ধন (ঢাকা- ময়মনসিংহ বিভাগ) (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্পের আওতায় এসপিসি পোল কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইপিআই কর্মসূচিতে ব্যবহৃত টিকা ইউনিসেফ থেকে অগ্রিম অর্থ প্রেরণের মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) ক্রয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
একই সভায় কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো), বাংলাদেশের কাছ থেকে ৩০ হাজার টন ব্যাগড গ্র্যানুলার ইউরিয়া সার কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রতি টনের দাম ধরা হয়েছে ৪৭৬ দশমিক ৩৭৫ ডলার। এতে মোট ব্যয় হবে ১ কোটি ৪২ লাখ ৯১ হাজার ২৫০ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ১৭৫ কোটি ৩৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৭৫ টাকা।