যে দুটি গোল করেছেন, তাতে রোনান সুলিভানের প্রশংসায় ভাসাটাই স্বাভাবিক। তার জোড়া গোলে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে পাকিস্তানকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। দ্বিতীয়ার্ধে করা দুই গোলের প্রথমটি নিয়ে হইচই হচ্ছে বেশি। বক্সের প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে অসাধারণ বাঁকানো ফ্রি-কিকে লক্ষ্যভেদ করেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী রোনান সুলিভান। এর ১০ মিনিট পর বক্সের ঠিক ওপর থেকে হেডে করেন দ্বিতীয় গোল। বাংলাদেশের যে কোনো জাতীয় দলের হয়ে অভিষেকেই এভাবে জ্বলে ওঠায় রোনান প্রশংসা পাচ্ছেন সর্বস্তর থেকে। তবে একই সঙ্গে যেটা হচ্ছে, সেটাও মোটেই কাম্য নয়। রোনানের প্রশংসার পাশাপাশি কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে অনূর্ধ্ব-২০ দলে খেলা স্থানীয় ফুটবলারদের। রোনানকে বলের জোগান ঠিকঠাক না দেওয়ার অভিযোগে তুলোধুনো করা হচ্ছে আক্রমণভাগের দুই অস্ত্র নুরুল হুদা ফয়সাল এবং মোর্শেদ আলীকে। অথচ পুরো ম্যাচে গোল না পেলেও পাকিস্তানের ভিত বারবার নাড়িয়ে দেওয়ার কৃতিত্ব কিন্তু এই দুজনেরও। দীর্ঘদিন ধরেই বয়সভিত্তিক দলগুলোতে আলো ছড়িয়ে আসা দুই ফরোয়ার্ডের অবদান খাটো করে দেখা, সেটাও একটা টুর্নামেন্ট চলাবস্থায় কতটা যৌক্তিক, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকেই হাজার হাজার শেয়ার হচ্ছে রোনানের সেই অবিস্মরণীয় ফ্রিকিকের ক্লিপটি। সাবেক, বর্তমান ফুটবলার থেকে শুরু করে সাধারণ ভক্তরাও রোনানে বুঁদ হয়ে থাকছেন। অভিজ্ঞ কোচ জুলফিকার মাহমুদ মিন্টুও ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন, ভবিষ্যতে জাতীয় দলের বড় সম্পদ হয়ে উঠতে পারেন রোনান সুলিভান। যদিও এখনই তাকে নিয়ে উচ্চাশার পক্ষে নন মিন্টু, ‘এখনই তাকে নিয়ে অনেক বড় স্বপ্ন দেখতে চাই না। তবে ও একজন অসাধারণ ফুটবলার। দুটি গোল দিয়েও বুঝিয়ে দিয়েছে নিজের সক্ষমতা। সেটপিসে এমন গোল দেশের কাউকে বিগত ২০-২৫ বছরে করতে দেখিনি। আর দ্বিতীয় গোলটি দিয়ে ও নিজের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার প্রমাণ রেখেছে। একজন নাম্বার নাইনের সহজাত গুণাবলি ওর মধ্যে আছে। আগামীতে ও জাতীয় দলের বড় অ্যাসেট হয়ে উঠতে পারে।’
সোশ্যাল মিডিয়ায় স্বার্থপরতার অভিযোগে টার্গেটে পরিণত হয়েছেন মোর্শেদ আলী ও নুরুল হুদা ফয়সাল। স্থানীয় ও প্রবাসীদের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই গুঞ্জন শোনা গেছে। সেই গুঞ্জনে ঘি ঢেলে দিয়েছেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। ফেসবুকে আমিনুল দলের জয়ে অভিনন্দন জানিয়ে লিখেছেন, ‘সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের উদ্বোধনী ম্যাচে জয়ের জন্য আমি ছেলেদের অভিনন্দন জানাই। তবে একজন সাবেক খেলোয়াড় এবং দেশের ক্রীড়াঙ্গনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে আমি শুধু একটি বিষয় স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, ফুটবলে সাফল্য ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে নয়, বরং দল হিসেবে একে অপরের জন্য লড়াই করার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। আমার মনে হয়েছে আজকের (মঙ্গলবার) জয়ের নায়ক রোনানকে আরও সুযোগ করে দেওয়া যেত, কিন্তু সেখানে টিম কম্বিনেশন ও কমিউনিকেশনের কিছুটা অভাব স্পষ্ট দেখা গেছে। মাঠে সবাইকে একে অপরের ওপর সমানভাবে আস্থা রেখে খেলতে হবে সে স্থানীয় হোক, কিংবা বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়। জন্মস্থান, বেড়ে ওঠা যেখানেই হোক না কেন, যারা দেশের জন্য লাল-সবুজের জার্সি গায়ে জড়ান তারা সবাই বাংলাদেশি। যে কোনো খেলায় দেশের পতাকা ও দলের স্বার্থই যেন সব ব্যক্তিগত লক্ষ্য অর্জনের ঊর্ধ্বে থাকে, এ চিন্তাধারা আমাদের আন্তর্জাতিক ফুটবলীয় সাফল্য অর্জনের জন্য অপরিহার্য।’
আমিনুলের এই মন্তব্যে স্বাভাবিকভাবেই দলে বিভাজনটা প্রকাশ্যে এসেছে। কমেন্টবক্সে শত শত কমেন্টে স্থানীয়দের গালমন্দ করে কমেন্ট করা হচ্ছে। একটা টুর্নামেন্ট চলাবস্থায় ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর এভাবে মতামত দেওয়া এবং সমর্থকদের এতটা ক্ষোভে ফেটে পড়া দলের সবার জন্য কতটা সুফল বয়ে আনবে, সেটা সময়ই বলে দেবে।