সম্পাদকের কথা

স্বাধীনতা একটি অসমাপ্ত নদীর নাম

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২৬, ০১:৫৪ পিএম

যে দেশের মায়ের নাম নদী। যাকে আমরা গর্বভরে নদীমাতৃক বাংলাদেশ বলে ডাকি তাকে নিয়ে গল্পে, তাকে নিয়ে চিন্তায় নদী তো আসবেই। এই যে স্বাধীনতার কথা বলছি, স্বাধীনতাও তো একটি নদ যার বীজ বপন হয়েছিল সেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে আর দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় চূড়ান্ত পরিণতি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। এই বহতা নদীর উৎস আছে, কিন্তু শেষ নেই। এটি জন্ম নেয় রক্তে, বয়ে চলে স্মৃতিতে আর প্রতিদিন নতুন নতুন অর্থ খুঁজে নেয় জীবন থেকে জীবনে। আমাদের এটাও জানা থাকতে হবে, কোনো কোনো নদী মানচিত্রে স্পষ্ট থাকে, কোনো কোনো নদী শুকিয়ে গিয়েও মাটির নিচে গোপন স্রোত বাঁচিয়ে রাখে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাও তেমন এটি শুধু ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের শুরু কিংবা বিজয় মুহূর্ত নয়; এটি একটি চলমান যাত্রা।

প্রতিবছর ২৬ মার্চ এলে আমরা পতাকার দিকে তাকাই। সবুজের বুকে লাল সূর্য দেখি। শহীদদের স্মরণ করি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলি। কিন্তু এই দিনটি শুধু স্মরণের দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনারও দিন। কারণ স্বাধীনতা যদি শুধু অতীতের অলংকার হয়ে যায়, তবে তার প্রাণশক্তি ফুরিয়ে যায়। স্বাধীনতা তখনই জীবন্ত থাকে, যখন তা বর্তমানকে প্রশ্ন করে এবং ভবিষ্যতের কাছেও জবাবদিহি দাবি করে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আসলে তিনটি বড় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল মানুষের মর্যাদা, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র এবং বৈষম্যহীন ভবিষ্যৎ। এ লড়াই শুধু পাকিস্তানি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ছিল না; এটি ছিল বঞ্চনার বিরুদ্ধে, দমনের বিরুদ্ধে, অসমতার বিরুদ্ধে। অর্থাৎ স্বাধীনতা মানে ছিল শুধু একটি পতাকা নয়; একটি ন্যায্য সমাজের স্বপ্ন। সে কারণেই স্বাধীনতার দিন এলে আমাদের নিজেদের কাছেই জিজ্ঞেস করতে হয় স্বাধীন রাষ্ট্র আমরা পেয়েছি, কিন্তু রাষ্ট্রের ভেতরে মানুষের স্বাধীনতা কতদূর নিশ্চিত হয়েছে?

আমরা উন্নয়নের গল্প বলি এবং বলার মতো গল্পও আমাদের আছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎ উৎপাদন, ডিজিটাল সংযোগ এবং সেবা সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ আজ একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রের চেহারা নিয়েছে। কিন্তু উন্নয়নের এই আলোকোজ্জ্বল বর্ণনার আড়ালে যে ছায়া তৈরি হয়েছে, সেটিও কি আমরা দেখতে চাই? যখন কোনো কৃষক তার ফসলের ন্যায্যমূল্য পান না, যখন কোনো শ্রমিক জীবনের নিরাপত্তা ছাড়াই দিন কাটান, যখন শহরের প্রান্তিক মানুষ বেঁচে থাকার মৌলিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন তখন উন্নয়ন একটি অসম বৃত্তে পরিণত হয়। স্বাধীনতা তখন একটি পরিসংখ্যানের বিষয় হয়ে যায়, মানুষের অভিজ্ঞতার নয়। আর তখন নদী বয়ে চললেও তার স্রোত মানুষের জীবন স্পর্শ করে না।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা এই প্রশ্নকে জটিলও করে, জরুরিও করে। বিশ্বব্যাংকসহ একাধিক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। দারিদ্র্যও দীর্ঘ মেয়াদে কমেছে। কিন্তু একই সঙ্গে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যায়, মূল্যস্ফীতি এখনো মানুষের জীবনে বড় চাপ হয়ে আছে; জানুয়ারি ২০২৬-এ সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ, খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর এসে আমরা যদি বর্তমান বাংলাদেশকে দেখি, তাহলে একটি দ্বৈত বাস্তবতা চোখে পড়ে একদিকে অভূতপূর্ব উন্নয়ন, অন্যদিকে অসমতার বিস্তার। এখানেই স্বাধীনতার প্রশ্নটি আবার ফিরে আসে। যে স্বাধীনতা মানুষের ভাতের থালা, চিকিৎসার সুযোগ, শিক্ষার অধিকার, নিরাপদ কর্মসংস্থান এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, সে স্বাধীনতা অপূর্ণ। রাজধানীর আকাশচুম্বী ভবন আর গ্রামের প্রান্তিক মানুষের অসহায় অবস্থা একই মানচিত্রে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকলে বুঝতে হবে নদী বয়ে চলেছে ঠিকই, কিন্তু তার পানি সবার ঘাটে সমানভাবে পৌঁছায়নি।

স্বাধীনতার সবচেয়ে গভীর পরীক্ষা হয় মতপ্রকাশের জায়গায়। একজন নাগরিক কতটা নির্ভয়ে তার কথা বলতে পারে এ প্রশ্নই নির্ধারণ করে একটি রাষ্ট্র কতটা স্বাধীন। আজকের বাংলাদেশে আমরা দেখি, মতের ভিন্নতা অনেক সময় শত্রুতায় পরিণত হয়, প্রশ্ন তোলাকে বিদ্বেষ হিসেবে দেখা হয়, সমালোচনাকে বিরোধিতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর ফলে স্বাধীনতার যে অন্তর্নিহিত প্রাণ বহুমতের সহাবস্থান তা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস’ -এর প্রকাশিত বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মধ্যম বা নিম্ন অবস্থানে রয়েছে। একইভাবে ‘ফ্রিডম হাউজ’ মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে পার্টলি ফ্রি বা আংশিক মুক্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই পরিসংখ্যানগুলো শুধু র‌্যাংকিং নয়; এগুলো একটি বাস্তবতার প্রতিফলন যেখানে সাংবাদিক, লেখক বা সাধারণ নাগরিক অনেক সময়ই আত্মসংযমের ভেতরে কথা বলতে বাধ্য হন। প্রশ্ন তোলার জায়গা সংকুচিত হলে স্বাধীনতার প্রাণশক্তিও সংকুচিত হয়।

গণতন্ত্রের প্রশ্নটিও এখানে অবধারিতভাবে উঠে আসে। নির্বাচন, রাজনৈতিক দল, ক্ষমতার পালাবদল এসব গণতন্ত্রের বাহ্যিক কাঠামো। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রাণ নিহিত থাকে আস্থায় নাগরিকের আস্থা, বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতায়। যদি এই আস্থা ক্ষয়ে যেতে থাকে, তাহলে স্বাধীনতা একটি আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

আমাদের বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, গণমাধ্যম এই তিনটি স্তম্ভ স্বাধীনতার প্রকৃত রক্ষক। কিন্তু এই স্তম্ভগুলো যদি চাপের মুখে থাকে, যদি স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ না পায়, তাহলে রাষ্ট্রের ভেতরে একটি নীরব সংকট তৈরি হয়। সেই সংকট হয়তো সবসময় দৃশ্যমান নয়, কিন্তু তা গভীর কারণ এটি ধীরে ধীরে নাগরিকের ভরসাকে ক্ষয় করে। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশ এই বাস্তবতার মধ্য দিয়ে গিয়েছে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪-এর পরিবর্তন, তারপরও অবস্থার বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে এটা বলা যাবে না। বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আরও সংকটে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের ঘাড়ে মবসন্ত্রাস জেঁকে বসেছে। বৃহত্তর তরুণ সমাজের স্বপ্ন দেড় বছরের মাথায় ফিকে হয়ে এসেছে। তারপরও আমাদের গল্প শুধু হতাশার নয়। এই জাতির ভেতরে পুনর্জাগরণের ক্ষমতা আছে। যার কেন্দ্রে আছে দেশের তরুণ প্রজন্ম, যারা তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বেড়ে উঠেছে, যারা বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত, যারা প্রশ্ন করতে জানে তারা এই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। তারা ইতিহাসকে শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয় হিসেবে দেখে না; তারা এটিকে নিজেদের জীবনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে চায়। এই তরুণদের মধ্যেই আমরা দেখি প্রতিবাদের নতুন ভাষা, সৃজনশীলতার নতুন দিগন্ত এবং স্বাধীনতার নতুন সংজ্ঞা। তারা চায় একটি বাংলাদেশ যেখানে পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন হবে; যেখানে ভয় নয়, স্বাধীনতা হবে জীবনের স্বাভাবিক অবস্থা। ফলে ২০২৪-এর জাগরণকে শুধু রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ছিল মানসিকতার পরিবর্তন। এই প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, কিন্তু তারা বুঝিয়ে দিয়েছে স্বাধীনতার চেতনা জাদুঘরে রাখা কোনো বস্তু নয়; এটি জীবন্ত অধিকারবোধ। তারা চাকরিতে মেধার স্বীকৃতি চেয়েছে, রাষ্ট্রের জবাবদিহি চেয়েছে, জীবনে মর্যাদা চেয়েছে। অর্থাৎ তারা ১৯৭১-এর প্রশ্নকেই নিজেদের ভাষায় নতুন করে তুলেছে। এই জাগরণ তাই ভয় পাওয়ার বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। যে তরুণরা প্রশ্ন করে, তারাই ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। যে তরুণরা অন্যায় মেনে নেয় না, তারাই গণতন্ত্রকে ভিত দেয়। এই শক্তিকেই সত্যিকার অর্থে কাজে লাগাতে হবে। ফিকে হওয়া স্বপ্নের পুনর্জাগরণ ঘটাতে হবে।

আর এটাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাদের প্রয়োজন আত্মসমালোচনার সাহস। স্বাধীনতা দিবস তাই শুধু আনন্দের নয়, এটি প্রশ্ন তোলারও দিন। আমরা কি সেই বাংলাদেশ গড়তে পেরেছি, যেখানে একজন মানুষ তার স্বপ্ন দেখতে পারে নির্ভয়ে? আমরা কি এমন একটি সমাজ তৈরি করেছি, যেখানে আইনের শাসন সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠিত? আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র নির্মাণ করেছি, যেখানে ক্ষমতা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ নয় এবং হয়তো সব উত্তর আমাদের পছন্দসইও হবে না। কিন্তু প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ স্বাধীনতা এমন একটি অর্জন, যা স্থির নয়, গতিশীল। এটি প্রতিনিয়ত নতুন করে সংজ্ঞায়িত হয়, নতুন করে অর্জিত হয়।

বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের পর দেশে আবার নির্বাচিত সরকার ফিরেছে। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রী দেশের আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন, দুর্নীতি দমন, বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের বদলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। এই অঙ্গীকারগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনগণের প্রধান উদ্বেগের মধ্যে ছিল দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান। তবে এটাও মানতে হবে, নতুন সরকারের সামনে বাস্তবতা সহজ নয়। একদিকে অর্থনীতির চাপে, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা আংশিকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত। এই আস্থা পুনর্গঠনই এখন বড় কাজ। আর এই কাজ শুধু বক্তৃতায় হবে না; দৃশ্যমান পদক্ষেপে হতে হবে। প্রথম প্রয়োজন আইনশৃঙ্খলার দৃঢ় পুনর্গঠন। স্বাধীন রাষ্ট্রে সবচেয়ে ভয়ংকর সংকেত হলো যখন নাগরিক মনে করে রাষ্ট্র হয় তাকে রক্ষা করতে পারছে না, নয়তো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে মবসন্ত্রাস ও দলবদ্ধ হামলার ঘটনা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ জানিয়েছে; ২০২৫ সাল জুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব আক্রমণ, হেফাজতে মৃত্যু এবং জবাবদিহির ঘাটতির কথা তারা তুলেছে। এর অর্থ হচ্ছে, রাষ্ট্রের গায়ে এখনো এক ধরনের অস্থিরতা লেগে আছে।

মব সংস্কৃতি কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের আকাক্সক্ষার বিকল্প হতে পারে না। এটি বিচার নয়, প্রতিশোধের বেসামাল রূপ। এটি রাষ্ট্রকে ছোট করে, আদালতকে অকার্যকর করে, নাগরিককে হিংসায় অভ্যস্ত করে। স্বাধীনতার নামে, ধর্মের নামে, ন্যায়বিচারের নামে কোনো নামেই এটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। নতুন সরকারের উচিত এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি দেখানো। শুধু বিবৃতি নয়, প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, প্রকাশ্য বিচারিক অগ্রগতি এবং রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় নির্বিশেষে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রকে আবার নাগরিকদের বোঝাতে হবে আইন আছে, আদালত আছে, ন্যায়বিচার আছে।

দ্বিতীয় বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত জবাবদিহিমূলক সুশাসন ও দুর্নীতি দমন। নতুন সরকার নিজেই যে অগ্রাধিকারের কথা বলেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও মার্চ ২০২৬-এ বলেছে, দৃশ্যমান ও কার্যকর দুর্নীতিনিয়ন্ত্রণ ছাড়া কাক্সিক্ষত সুশাসন সম্ভব নয়; তারা অর্থ পাচার ঠেকাতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানো এবং উপকারভোগী মালিকানা স্বচ্ছতার আইন চেয়েছে। অর্থাৎ দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুধু নৈতিক উচ্চারণ নয়; এর সঙ্গে অর্থনীতি, বিনিয়োগ, বিচার এবং নাগরিক আস্থার প্রশ্নও জড়িত।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সহনশীলতা। স্বাধীনতা মানে একদলীয় স্বর নয়; বহুস্বরের নিরাপদ সহাবস্থান। ভিন্নমতকে শত্রু ভাবা রাষ্ট্রের আত্মবিশ্বাসের লক্ষণ নয়, দুর্বলতার লক্ষণ। বাংলাদেশকে যদি আগামী কয়েক বছরে স্থিতিশীল ও আধুনিক গণতন্ত্রে পরিণত করতে হয়, তবে বিরোধী মত, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিকতা এবং শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশের জায়গা সুরক্ষিত রাখতে হবে।

চতুর্থত, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ‘স্মার্ট’ ভবিষ্যতের নানা রূপরেখা তৈরি করেছে। সরকারি ডিজিটাল রূপান্তর পরিকল্পনায় বাংলাদেশ ন্যাশনাল ডিজিটাল আর্কিটেকচার (বিএনডিএ) ন্যাশনাল ডেটা এক্সচেঞ্জ (এনডিএক্স), ৮০০-এর বেশি সরকারি সেবা ডিজিটাইজেশন, মাইগভ ও ডি-নথি বিস্তার এবং সরকারি সেবায় এআইনির্ভর অটোমেশনের মতো উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকও ২০২৫ সালে ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার, নিরাপদ ডিজিটাল পরিচয় ও আন্তঃকার্যকর ডেটা-শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ মানে শুধু আরও কিছু অ্যাপ নয়। এর অর্থ হলো, দুর্নীতি কমানোর জন্য স্বচ্ছ ডিজিটাল প্রক্রিয়া, আদালতের বিলম্ব কমানোর জন্য ই-জুডিশিয়ারি, স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল রেকর্ড, কৃষকের জন্য বাজারদর ও সরবরাহ তথ্য, শিক্ষার্থীর জন্য দক্ষতাভিত্তিক অনলাইন সুযোগ এবং নাগরিকের জন্য এক জানালার সরকারি সেবা। প্রযুক্তি যদি শুধু শহুরে সুবিধাভোগী শ্রেণির খেলনা হয়ে থাকে, তবে তা স্বাধীনতার বিস্তার নয়; নতুন বৈষম্যের জন্ম দেবে। ফলে ডিজিটাল রূপান্তরকে অবশ্যই অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে গ্রাম, নারী, নিম্নআয়ের পরিবার, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সবাইকে সঙ্গে নিয়ে।

আগামীতে আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই, যেখানে আইন রাজনৈতিক পরিচয়ে বদলাবে না; যেখানে পুলিশ ভয় নয়, আস্থার প্রতীক হবে; যেখানে আদালত বিলম্বের জঙ্গল নয়, ন্যায়ের পথ দেখাবে; যেখানে তরুণের মেধা চাকরির লাইনে হারিয়ে যাবে না; যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সনদ দেবে না, ভবিষ্যৎও তৈরি করবে; যেখানে বাজারে সিন্ডিকেট নয়, ন্যায্য প্রতিযোগিতা কাজ করবে; যেখানে রাষ্ট্র ডিজিটাল কিন্তু মানবিক; দ্রুত কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক; আধুনিক কিন্তু বৈষম্যহীন হবে। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে স্বাধীনতা দিবসে শুধু অতীতের ইতিহাস নিয়ে কথা বলব না, বর্তমানের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়েও নিশ্চিন্ত থাকতে পারব।

বাংলাদেশ এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে পেছনে তার রক্তাক্ত জন্ম, আর সামনে ডিজিটাল ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের স্বপ্ন। মাঝখানে আছে কঠিন বাস্তবতা মূল্যস্ফীতি, বৈষম্য, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, মবসন্ত্রাস, আস্থাহীনতা। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা হলো যে জাতি একবার স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে পারে, সে চাইলে স্বাধীনতার অর্থও নতুন করে নির্মাণ করতে পারে। ২৬ মার্চের আহ্বান তাই স্পষ্ট স্বাধীনতাকে স্মৃতিতে পরিণত করা যাবে না। একে জীবনের ভেতরে জারি রাখতে হবে। আইনের শাসনে, ন্যায়বিচারে, নাগরিক মর্যাদায়, তরুণের ভবিষ্যতে, প্রযুক্তির সৎ ব্যবহারে এবং সহিংসতার বদলে সভ্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক আচরণে। স্বাধীনতার নদী এখনো বয়ে চলেছে। তবে প্রশ্ন একটাই নদী কি সমুদ্রের দিকে যাবে, নাকি মরুভূমিতে হারিয়ে যাবে? এই প্রশ্নের উত্তরও নির্ভর করছে আমাদের ওপর, আমরা আসলে কী চাই। স্বাধীনতা তাই শেষ কথা নয়; এটি শুরু। আর সেই শুরু প্রতিদিন আমাদের হাতেই লেখা হচ্ছে।

লেখক : সম্পাদক, দেশ রূপান্তর

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত