২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেন সরকারের অন্যতম কুশীলব সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা রিমান্ডে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিচ্ছেন। এক-এগারোর সময়ে ক্ষমতাসীন দুই নেত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হলেও একজনকে পর্দার আড়ালে থেকে বিশেষভাবে ছাড় দেওয়া হতো। সংসদ ভবন এলাকার বিশেষ কারাগারে গোপন বৈঠকের ব্যবস্থা করতেন। এমনকি কারাগার থেকে হাসিনাকে বের করার ব্যবস্থা ও বিভিন্ন জনের সঙ্গে বৈঠক করে আবার কারাগারে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হতো। এসব বৈঠক আয়োজনের সব কিছু প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) দেখভাল করত। এ ছাড়াও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎসহ নানা ইস্যুতে অনৈতিকভাবে নেতাকর্মীদের গুম, আয়নাঘরে বন্দি ও মুঠোফোন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত ডিজিএফআই।
ওয়ান-ইলেভেনের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে চিহ্নিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং আয়নাঘর ও মুঠোফোন আড়িপাতার কারিগর হিসেবে চিহ্নিত ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে এ তথ্য জানিয়েছেন।
গতকাল শনিবার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানায়, রিমান্ডে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাইও করা হচ্ছে। ওয়ান-ইলেভেনের বিষয় জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর তাদের সঙ্গে নির্বাচন, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎসহ নানা ইস্যুতে দরকষাকষি হতো। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলুল বারী চৌধুরী এবং মেজর জেনারেল এটিএম আমিন বেশিরভাগ সময় কারাগারে গিয়ে দুই নেত্রীর সঙ্গে বৈঠক করতেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ দিকে পর্দার আড়ালে দরকষাকষি করতে শেখ হাসিনা প্রায়শই সংসদ ভবন এলাকার বিশেষ কারাগার থেকে সন্ধ্যার পর বের হয়ে যেতেন। এরপর বিভিন্ন জনের সঙ্গে বৈঠক করে আবার কারাগারে ফিরতেন। পর্দার আড়ালে এসব বৈঠক আয়োজনের সব কিছু ডিজিএফআই দেখভাল করত।
এ ছাড়াও মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে ওয়ান ইলেভেন সরকারের আমলে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াসহ শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার, ব্যবসায়ীদের হয়রানি করে অর্থ আদায়, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক নির্যাতনসহ আরও নানা গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে গোয়েন্দা পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী অনেক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাচ্ছেন। নিজেকে জড়িয়ে বক্তব্য দিতেও সতর্কতা অবলম্বন করছেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অপরদিকে ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক মামুন খালেদের জিজ্ঞাসাবাদের বিষয় জানতে চাইলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানায়, সাবেক এই সেনা কর্মকর্তাকেও ওয়ান-ইলেভেনের বিষয় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে তিনি বিভিন্ন কৌশলে প্রশ্ন এড়িয়ে যান। পরিকল্পনা রয়েছে, রিমান্ডে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে মুখোমুখি করার। কিন্তু গতকাল বিকেল পর্যন্ত তাদের মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এক-এগারোর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তুলে নিয়ে নির্মম নির্যাতন, আওয়ামী লীগের আমলে প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদসহ নানা অপকর্মের বিষয়ে জানতে চাওয়া হচ্ছে।
গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দাপ্রধান শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা রিমান্ডে রয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে নানা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তবে তাদের দেওয়া তথ্যগুলো আমরা যাচাই-বাছাই করছি। মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা দুজন ভিন্ন ভিন্ন সেলে রয়েছেন। তাদের সঙ্গে এখনো দেখা হয়নি। ওয়ান-ইলেভেনের বিষয়ই বেশি প্রশ্ন করা হচ্ছে বলেও জানান ডিবিপ্রধান।
উল্লেখ্য, গত বুধবার রাতে মিরপুরের ডিওএইচএস এলাকা থেকে শেখ মামুন খালেদকে জুলাই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। আর গত সোমবার রাতে মানব পাচার মামলয় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা দুজনই বর্তমানে পুলিশি রিমান্ডে আছেন।
