হুমকিতে জ্বালানি নিরাপত্তা নবায়নযোগ্যতে সমাধান

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০৩ এএম

আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়ায় বাংলাদেশ সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। বিশ্ববাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ঝুঁকিপূর্ণ সংকীর্ণ জলপথ চেক পয়েন্ট প্রায়ই বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা চরম সংকটে পড়েছে বলে নতুন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইথ্রিজি’।

গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে গবেষকরা বলেছেন, বৈশ্বিক সংকটগুলো বারবার প্রমাণ করেছে আমদানিনির্ভর জ্বালানি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। এ সংকট কাটাতে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর ঘটাতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশি^ক তেল ও গ্যাসবাণিজ্য হরমুজ প্রণালির মতো ঝুঁকিপূর্ণ সংকীর্ণ জলপথের ওপর স্থায়ীভাবে নির্ভরশীল। বাংলাদেশের মতো যেসব দেশ আমদানি করা তেল ও এলএনজির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তাদের জন্য এ ধরনের পথ সাময়িক, নয় বরং ঘন ঘন ঝুঁকি তৈরি করে। এমনকি পর্যাপ্ত তেল-গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ থাকলেও এই ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব নয়।

বর্তমান সংকটে শুধু একমুখী নয়; বরং বাংলাদেশ বহুমাত্রিক ঝুঁকিতে রয়েছে। স্বল্প মেয়াদে সংকট মোকাবিলার সীমিত সক্ষমতা দেশটিকে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ফলে যেকোনো ধরনের বিঘœ দ্রুত ভৌত বা আর্থিক মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ অনিশ্চয়তা এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি সরবরাহে বিঘœ এখন শুধু ভৌত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তথাকথিত ‘পেপার চোকপয়েন্ট’ যেমন জাহাজ চলাচলে সীমাবদ্ধতা, বীমা সুবিধা প্রত্যাহার, নীতিগত জটিলতা বা জলবায়ুজনিত কারণে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও বাজারকে দ্রুত অস্থির করে তুলতে পারে। ফলে বাংলাদেশের মতো দেশের জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যেতে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

ইথ্রিজির জ্বালানি রূপান্তর কর্মসূচির প্রধান মারিয়া পোস্তুকোভা বলেন, ‘বাংলাদেশ চোকপয়েন্ট ঝুঁকির একেবারে সামনের সারিতে অবস্থান করছে। আমদানি করা জ্বালানির ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার পাশাপাশি সীমিত আর্থিক ও কাঠামোগত রক্ষণশীলতার ফলে বৈশ্বিক যেকোনো সংকট বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংকটে রূপ নেয়। শুধু চলমান হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার মতো ধাক্কা সামাল দেওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত নয়, কারণ এটি বাংলাদেশের জন্য শেষ সংকট নয়। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, বিদ্যুতায়ন এবং দেশীয় পরিচ্ছন্ন জ্বালানির মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো, এটিকে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও অংশীদারত্বের সহায়তায় বাস্তবায়নযোগ্য করা দরকার।’

বাংলাদেশ ছাড়াও সিঙ্গাপুর, ভারত, পাকিস্তান, চীন, জাপান, কোরিয়া, থাইল্যান্ড এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বড় জ্বালানি আমদানিকারকদের ওপর বিশ্লেষণ চালিয়ে ইথ্রিজি দেখেছে, কোনো দেশই চোকপয়েন্ট ঝুঁকি থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। তবে দেশভেদে ঝুঁকির মাত্রা ভিন্ন। এশিয়ার দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। কারণ হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ চোকপয়েন্ট দিয়ে পরিবাহিত তেল ও এলএনজির প্রায় ৯০ শতাংশই এশিয়ার দেশগুলোয় যায়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। সীমিত দেশীয় গ্যাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি এলএনজি আমদানির ওপর বাড়তি নির্ভরতা দেশটিকে বৈশ্বিক বাজারের ওঠানামার বিষয়ে অতি সংবেদনশীল করে তুলেছে। সরাসরি সরবরাহ বন্ধ না হলেও, অন্য অঞ্চলের সংকটের প্রভাব পড়তে পারে স্থানীয় বাজারে।

প্রতিবেদনটি বলছে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সরবরাহ বাড়ানোর চেয়ে ঝুঁকি কমানো বেশি জরুরি।

বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হলো আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া। বিদ্যুতায়ন, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, গ্রিড উন্নয়ন, সংরক্ষণব্যবস্থা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেছে ইথ্রিজি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত