অক্সফোর্ডের পথে লন্ডনে প্রথম দিন

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০২:১৫ এএম

চল্লিশ বছর আগে ১৯৮৬ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে, ব্রিটিশ টেকনিক্যাল অ্যাসিট্যান্সের বৃত্তি নিয়ে অক্সফোর্ডে উচ্চতর বিদ্যার একটি কোর্সে পড়তে যাই। টেমস নদীর ওপর ওয়াটারলু ব্রিজ পার হয়েই বাঁদিকে মোড় নিয়ে ২৫তলা একটি ভবনের সামনে গাড়ি থামালেন মি. নরউইচ। ব্রিটিশ কাউন্সিলের পক্ষ থেকে গাইড করা হয়েছে, লগুনে ২ দিন হোটেল বাসের পর আমাকে অক্সফোর্ডের পথ দেখিয়ে দেওয়া হবে। সেই হিসেবে মি. নরউইচের দায়িত্ব হচ্ছে, আমাকে হোটেলে পৌঁছে দেওয়া। আগেই জানানো হয়েছিল, ইউনিয়ন জ্যাক ক্লাবে আমার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখানে দুদিন থাকার পর অক্সফোর্ডে পাঠানো হবে, যেখানে আমার মূল অবস্থান। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র আমি। অক্সফোর্ড আমার কাছে অতি আরাধ্য। কিন্তু যা পড়তে যাচ্ছি (কম্পিউটারাইজেশন অ্যান্ড অ্যাকাউনট্যানসি) তা শুনলে, এখনো অনেকে বিস্মিত  হয়ে যান। আমি অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউনটস সার্ভিসের সদস্য। পড়লাম শেক্সপিয়ার, যাচ্ছি তার আখড়ায়, কিন্তু কম্পিউটারাইজেশন অ্যাকাউনট্যানসি চর্চায়। কী মুশকিল! সাউথ ইস্ট লন্ডনের ওয়াটারলুর স্যান্ডওয়েল স্ট্রিটে কাউন্সিলের সৌজন্যে বৃত্তিপ্রাপ্ত বিদেশি ছাত্র, অধ্যাপক কিংবা সরকারি কর্মকর্তাদের থাকার জায়গা ইউনিয়ন জ্যাক ক্লাবে। ভাড়া চলনসই। সকালের নাশতা ফ্রি, লাঞ্চ এবং ডিনার খরচ পকেট থেকে। চলনসই আয়তনের সিঙ্গেল সিটের রুম।  কাউন্টারে নামধাম লিখিয়ে, রিসিপশনিস্ট মিস এলিজার কাছে আমাকে বুঝিয়ে দিয়ে নরউইচ ‘সি ইউ এগেইন’ বলে চলে গেল। এলিজা জানালেন, আমাকে যে রুম বরাদ্দ করা হয়েছে, তাতে ওঠা যাবে সাড়ে বারোটায়। অতএব ব্রেকফাস্ট করে অপেক্ষা করা ছাড়া পথ খোলা নেই।

বর্ষপঞ্জির হিসাব অনুযায়ী, লন্ডনে তখন বসন্ত শেষে গ্রীষ্মের উঁকিঝুঁকি মারার কথা। কিন্তু হিথরোতে যখন পা দিলাম, তখন হাড়ে হাড়ে টের পেলাম পৌষের প্রচণ্ড শীত বসন্তের এখতিয়ার এবং গ্রীষ্মের আগমনের অধিকারকে আত্মসাৎ করে এখনো বহালতবিয়তে লন্ডনে জেঁকে বসে আছে। বুঝলাম, লন্ডন বা  বিলেতে আবহাওয়ার স্বেচ্ছাচারী আচরণ সব ভবিষ্যদ্বাণী ও  আশা-প্রত্যাশাকে প্রায়ই ব্যঙ্গ করে। এদেশেরই কবি পি. বি. শেলী নিজেও অনিশ্চিত ছিলেন বলে, ‘শীত এলে বসন্ত কি খুব দূরে থাকে?’ জাতীয় হেঁয়ালিসুলভ আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি বাঙালি কবির মতো, নিশ্চিত করে বলতে পারেননি ‘ফাগুন এলেই পলাশ শিমুলে ছেয়ে যাবে সবুজ সোনার গাঁ কোকিলের কুহুতানে’। বাংলাদেশে কোকিল আজকাল অবশ্য অনেক অসময়ে ডাকে। বসন্তের কোকিলের সংখ্যা ইদানীং বেড়েছে বলে হয়তো। যা বলছিলাম বিলেতবাসীরা আচার-আচরণ, মনন-বিশ্বাসে প্রথানুযায়ী ঐতিহ্যমনা এবং রক্ষণশীল।  কিন্তু তাদের প্রকৃতিতে সচরাচর এই দর্শন দৃষ্টিগোচর হয় না। প্রকৃতি ইংরেজ চরিত্রের ওপর এক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রভাব রাখতে পেরেছে বলে মনে হয় না। উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ লুসিকে প্রকৃতির সন্তান বলে আখ্যায়িত করেছিলে।  কিন্তু বালিকা লুসির পরবর্তী জীবন এবং ভিন্নতর পরিবেশে, তার প্রতিক্রিয়া কী হয়েছিল তা জানাননি।

বাইরে বেশ ঠা-া এবং গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। সাড়ে ১২টার আগে হোটেল কক্ষে যাওয়া যাবে না। অগত্যা ভিজিটরস রুমে বসতে হলো। হঠাৎ করে ১০-১২ জন লোক আমার দিকে আত্মীয়তাসুলভ সম্ভাষণে এগিয়ে এলেন। আর ইউ ফ্রম শ্রীলঙ্কা? আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি বলাতে, শুদ্ধ এবং মিষ্টি বাংলায় আরেকজন বললেন, ‘তা আজই এলেন বুঝি?’ একটু পরেই জানলাম,  ইনি আশীষ কুমার পালিত।  আদিনিবাস খুলনার সেনহাটি, স্থায়ী আবাস কলকাতা, চাকরি দুর্গাপুর পাওয়ার প্ল্যান্টে। ওরা ১৬ জন। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে, পাওয়ার হাউজের প্রকৌশলগত বিভিন্ন দিকের ওপর ব্রিটিশ কাউন্সিলের সৌজন্যে প্রদত্ত কারিগরি সহযোগিতার আওতায়,  কর্মশিবিরে অংশ নিতে এসেছেন। অন্তরঙ্গ আলাপে মুখর হয়ে পড়লাম একা একা বিদেশে আমার বিমর্ষ ভাবটা কেটে গেল। তানিয়া আর বিথুনের কথা মনে করার কষ্টটা কিছুক্ষণ ভুলে থাকা গেল। টেলিফোনের কয়েন বক্সে, মাত্র ৫০ পেন্স ফেলে কোড নম্বর মিলিয়ে বাংলাদেশে ফোন করলাম। নিজের কানে বিশ্বাস হচ্ছিল না, যখন অপর প্রান্ত থেকে এ বি এম নুরুজজামান  (ইনফরমেশন সার্ভিসের। পরে লিবিয়ায় রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন। বেইলি ড্যাম্প কলোনিতে আমাদের নিকট প্রতিবেশী ছিলেন) সাহেবের সুস্পষ্ট গলা শুনতে পেলাম। সংক্ষেপে আমার নিরাপদে লন্ডন পৌঁছানোর খবরটা জানাতে পেরে খুব আনন্দ পেলাম। সঙ্গে সঙ্গে একটা ক্ষুব্ধ অভিমানবোধ অনুভব করলাম। ভাবলাম, সে সময় আমরা কত পিছিয়ে ছিলাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুফল থেকে। ঢাকার পাশে নারায়ণগঞ্জে চাচার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে, কি ঝক্কিটাই না পোহাতে হয়েছিল। পুরো দুটো ঘণ্টা ব্যয় করে যদিও লাইন পাওয়া গিয়েছিল,  তার স্বর এতটা ক্ষীণ ও সংকীর্ণ ছিল যে, আমার সিভিল সার্জন চাচারই গলা পাঁচ মাসের শয্যাশায়ী রোগীর মতো মনে হচ্ছিল। আর উভয়ের বোধগম্যতায় এতটা গ্যাপ ছিল যে, আমি বললাম, চাচা আমি লন্ডন যাচ্ছি।  তিনি বললেন, তোমার চাচি কিছুক্ষণ আগে বাইরে গেলেন। কিন্তু সাত সাগর তেরো নদীর পার থেকে, কত স্বাভাবিক প্রচেষ্টায়, কত অমায়িক অবয়বে কথা বলতে পারলাম। উন্নত প্রযুক্তির জগতে প্রবিষ্ট হওয়ায় পথে আমাদের বাধা কি একমাত্র অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা, না কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণে ব্যর্থতা? অথবা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উন্নাসিকতা, না উন্নীত হওয়ার মানসিকতায় দুষ্টক্ষতের অনুপ্রবেশজনিত সমস্যা দায়ী? অপচয়, অপব্যয় আর আত্মসাতের আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা জাতীয় অর্থনীতিতে, সুবাতাসের স্বপ্ন সুদূর পরাহত।

অবকাশ এবং অবসর জীবনযাপনকারী এক জোড়া আইরিশ দম্পতির সঙ্গে আলাপ হলো নৈশভোজের টেবিলে। এখানে ইউনিয়ন জ্যাক ক্লাব বা এই হোটেলটির সম্বন্ধে দুকথা বলা দরকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধফেরত অফিসার ও সৈনিকদের উদ্যোগে এই ইউনিয়ন জ্যাক ক্লাব প্রতিষ্ঠা লাভ করে ১৯৪৮ সালে। অবসরপ্রাপ্ত পদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা এর সদস্য। ১৯৭৬  সালে ২৫তলা বিশিষ্ট ক্লাবের এই নতুন ভবন উদ্বোধন করেন রানী এলিজাবেথ। ক্লাব সদস্য ছাড়াও বহিরাগত সরকারি কর্মকর্তারা এখানে নির্দিষ্ট ভাড়ায় সাময়িকভাবে অবস্থানের সুযোগ পেয়ে থাকে। এটি একাধারে ক্লাব ও আবাসিক হোটেল। সব বেলার খাবার পরিবেশন করার মতো ক্যাফেটেরিয়া ও বারসহ আধুনিক সব সুবিধা এখানে রয়েছে। আইরিশ দম্পতি ক্লাবের সদস্য। মি. আর্নেসট সি ফাউলার, আমার বাড়ি বাংলাদেশে শুনেই চিটাগাং চিনি কিনা জানতে চাইলেন। জানালেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ নেভিতে অফিসার ছিলেন তিনি এবং ব্যাঙ্গালোর ও চট্টগ্রাম বন্দরে তাকে বেশ কয়েকবার যেতে হয়েছিল। এতদিন পরও চট্টগ্রামের কথা তার মনে আছে এবং সে সময়কার স্মৃতিচারণ করার জন্য তাকে অশেষ ধন্যবাদ জানালাম। বললাম, ‘ইওর নেশান ইজ প্রাউড অব ইউ’। তিনি  বললেন, ‘ওয়াজ ওয়ান্স আপন এ টাইম’। আমি বললাম, ‘স্টিল শুড নেশন স্যালুট ইউ’। বৃদ্ধ ভদ্রলোক যুদ্ধের কাহিনি শোনাবার এবং যুদ্ধে তার গর্বিত অংশগ্রহণের কথা বলতে পেরে, নিজেকে বেশ চাঙ্গা করে তুললেন। তার চোখ জোড়ায় দেখতে পেলাম, এক ধরনের বীরত্বব্যঞ্জক উন্মাদনা। ধূসরতা তার দৃষ্টিশক্তিকে আচ্ছন্ন করে দিলেও মনে হলো,  এখনো যেন রণসংগীতের সুরে তা লাফাচ্ছে।  ইউনিয়ন জ্যাক উড়িয়ে রণতরী গভীর সমুদ্রে এগিয়ে যাচ্ছে তার দৃষ্টি। ভদ্রলোকের মুখে কথার খই ফুটতে লাগল! বৃদ্ধ মাত্রই বাগাড়ম্বর ও বিস্তর  বাক্যালাপে জড়িয়ে পড়েন, সেটা ফাউলার সাহেব প্রমাণ করে ছাড়লেন।

দেখলাম, আইরিশ বুড়োর কথা বলাতে বাংলাদেশের বৃদ্ধ অছিমুদ্দীনের চাইতে কম যান না। খাবার টেবিল থেকে ওয়েটিং রুমে গল্প করার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হলো। আমার ভালো লাগছিল। তাকে উসকে দেওয়ার জন্য- তার দেখা আয়ারল্যান্ড, সেখানকার অতীত এবং বর্তমান জীবনযাত্রা সম্পর্কে কথা তুললাম। বললাম, ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র আমি।  আইরিশ কবি ইয়েটস, নাট্যকার জর্জ বার্নাড শ এবং ই এম সিঙ্গের ভয়ানক ভক্ত। আর যাই কোথায়? সিঙ্গের (ঝুহমব)র ‘প্লেবয় অব দি ওয়েস্টার্ন ওয়ালর্ডের’ খেই ধরে বক বক করা শুরু করলেন। মাঝে সাময়িক ক্ষ্যান্ত দিয়ে পকেট থেকে নেমকার্ড বের করে, আমাকে নর্দান আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্ট শহরে যাওয়ার দাওয়াত করলেন। জানালেন, ফোনে যোগাযোগ করা হলে বেলফাস্ট এয়ারপোর্টেই তিনি আমার জন্য অপেক্ষা করবেন। আলাপের একপর্যায়ে, আমি অডিট ডিপার্টমেন্টের লোক শুনেই তারা চারজনই একটা বিস্মিত, বীতশ্রদ্ধ এবং ভীতিপ্রদ অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন। কারণ ব্যাখ্যা করে বললেন, তাদের দেশে অডিটরকে সবাই ভয় করে ‘বিকজ অ্যান অডিটর ডাজনট অ্যালাউ টু স্পেন্ড মানি অ্যাজ ওয়ান লাইকস ইট’। তবে আস্তে আস্তে তারা এটা স্বীকার করলেন, অডিটরের এ অপ্রিয় কাজ প্রকারান্তরে তাদের মঙ্গলের জন্যই এবং সেজন্য তাদের দেশে অডিটরদের সম্মান বেশি। ফাউলার দম্পতি আমাকে অডিট ডিপার্টমেন্টের লোক হিসেবে, আমার মধ্যে কিছুটা স্ববিরোধী সম্পর্ক লক্ষ্য করেন বলে জানালেন। কূটনৈতিক চালে প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে,  অন্য কথায় তার জবাব দিলাম। মনে মনে ভাবলাম, ফাউলার সাহেবেরা হয়তো জানেন না আমাদের জাতীয় জীবনে শিক্ষাব্যবস্থা ও রাজনীতিতে, স্ববিরোধিতা আজ প্রায় সর্বত্র। তার বিস্তৃত ব্যাখ্যার অবকাশ এখানে নেই।

লেখক: সাবেক সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান

[email protected] 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত