‘বারবার ফিরে দেখি নিজেকে’

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৫ এএম

এম এ আলমগীর। বাংলা চলচ্চিত্রের উজ্জ্বল এক নক্ষত্রের নাম। একুশে পদকপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব দর্শকের কাছে কেবল আলমগীর এবং সিনেমা পরিবারের কাছে চিরসবুজ বলে খ্যাত। অনবদ্য ও সাবলীল অভিনয় দিয়ে অভিনেতাদের মধ্যে সর্বাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়ার রেকর্ড এখনো তারই দখলে। শুধু কি তাই! ১৯৮৯ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত টানা ৪ বছর শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের রেকর্ডটিও এখন পর্যন্ত ভাঙতে পারেননি কেউ। আর দুই বছর আগে একুশে পদকে ভূষিত হয়ে নিজেকে আরও এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি। জীবন্ত এই কিংবদন্তি একাধারে নায়ক, প্রযোজক, পরিচালক সর্বোপরি চলচ্চিত্রের অভিভাবক। চলচ্চিত্র পরিবারের কাছে বটবৃক্ষ বলে বিবেচিত আলমগীর নায়করাজ রাজ্জাকের পরেই নিজের আসন পাকাপোক্ত করে ফেলেছেন বহু আগেই। বর্ষীয়ান এই তারকা ২০১৯ সালের ৮ ডিসেম্বর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হন। পরিচালক হিসেবে সর্বশেষ ‘একটি সিনেমার গল্প’ নির্মাণ করেও প্রশংসা কুড়ান সুধীমহলে। এই সিনেমায় সুরকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেই সেরা সুরকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন তার স্ত্রী রুনা লায়লা। আবার একই সিনেমায় গান গেয়ে প্রথমবার সেরা গায়িকা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন কন্যা আঁখি আলমগীর।

যদিও চিরসবুজ, মহানায়ক, বরেণ্য, কিংবদন্তি এসব কোনো বিশেষণই তাকে পুলকিত করে না। কারণ হিসেবে এই তারকা জানান, তিনি সবসময় কেবল একজন অভিনেতা হওয়ারই চেষ্টা করেছেন এবং এখনো সাধারণ এক অভিনেতাই ভাবেন নিজেকে। আজ তিনি স্পর্শ করলেন জীবনের ৭৭তম বসন্ত। নিজের বিশেষ দিন নিয়েও তেমন কোনো বাড়তি আবেগ কাজ করছে না বলেও জানান তিনি। আলমগীর বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে এখন আর জন্মদিনে আগের সেই অনুভূতি কাজ করে না। আয়োজনও থাকে বেশ ভালোই। কিন্তু বিশেষ ব্যাপারটি যেন হারিয়ে যাচ্ছে জীবন থেকে। প্রতিবারের মতো এবারও খুব সাধারণভাবেই কেটে যাবে দিনটা। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন, আমি যতদিন বাঁচি, যেন যেন সুস্থভাবে বেঁচে থাকি।’

নিজের জন্মদিন নিয়ে আলমগীর তেমন কোনো কথা না বললেও তাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বেশ লম্বা একটা বক্তব্য দিয়েছেন তার সহধর্মিণী দেশবরেণ্য সংগীতশিল্পী রুনা লায়লা। তিনি বলেন,‘আমার ভীষণ ভালোলাগার, ভালোবাসার মানুষ তিনি। আল্লাহর অশেষ রহমত তিনি সুস্থ ও ভালো থেকে আমাদের সঙ্গে আছেন। তার সঙ্গে সবসময়ই আমার দারুণ বোঝাপড়া, যেকোনো বিষয় নিয়েই আমি তার সঙ্গে আলোচনা করি। তবে আমার খুব দুঃখ হয় যে, তিনি যে ধরনের ট্যালেন্টেড একজন অভিনেতা, সে হিসেবে তার ট্যালেন্টকে পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। আমার বিশ্বাস যদি আগামীতে তার কোনো চরিত্র বা কোনো গল্প ভালো লেগে যায় আবারও তিনি অভিনয় করতেও পারেন। অনেক উদার মনের, আমার জীবনসঙ্গী এবং অনেক বড় মনের এই মহায়নায়কের প্রতি রইল অনেক শ্রদ্ধা ভালোবাসা।’

আড়াই শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করা আলমগীর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে কত ঘটনা, অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন তার অন্ত নেই। তবে জীবনের এ পর্যায়ে এসে নিজেকে বারবার ফিরে দেখেন তিনি। জন্মদিনে আজ শুক্রবার মাছরাঙা টেলিভিশনের ‘স্টার নাইট’ অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে আসছেন শক্তিমান এই অভিনেতা। অনুষ্ঠানে বর্ণাঢ্য জীবন ও ক্যারিয়ারের অনেক নতুন তথ্য জানাবেন তিনি। আর তাকে নিয়ে বলবেন তার সহকর্মী, কাছের বন্ধু এবং পরিবারের সদস্যরা। মাছরাঙা টেলিভিশনের পক্ষ থেকে জনানো হয়, অনুষ্ঠানে আলমগীরের প্রিয় চলচ্চিত্রের বিভিন্ন ক্লিপিংসও দেখানো হবে। রুম্মান রশীদ খানের গ্রন্থনা ও মৌসুমী মৌয়ের উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানটি প্রযোজনা করেছেন অজয় পোদ্দার।

১৯৫০ সালের এই দিনে (৩ এপ্রিল) ঢাকা মেডিকেল কলেজে জন্ম নেওয়া আলমগীরের শৈশব যৌবন কেটেছে তেজগাঁও এলাকায়। নায়ক আলমগীর আদ্যোপান্তই একজন সিনেমার মানুষ, সিনেমাপ্রেমী মানুষ। তিনি যে শুধু যে অভিনয়ই করে গেছেন, এমন নয়। পাশাপাশি জীবনের শুরু থেকে আজ অবধি সিনেমার মানুষসহ সাধারণ মানুষেরও বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন। যে কারণে তিনি হয়ে উঠেছেন সিনেমা এবং বাস্তবের সত্যিকারের মহানায়ক। কলেজ জীবনে নাটকে অভিনয়ের মধ্যদিয়ে অভিনয় জীবনের যাত্রা শুরু হলেও মূলত ১৯৭২ সালের ২৪ জুন প্রয়াত বরেণ্য পরিচালক আলমগীর কুমকুম পরিচালিত ‘আমার জন্মভূমি’ সিনেমাতে অভিনয়ের জন্য প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি এই সিনেমা মুক্তির আগেই আলমগীর সিরাজুল ইসলামের ‘দস্যুরানী’ (১৯৭৪), আজিজুর রহমানের ‘অতিথি’, আলমগীর কুমকুমের ‘মমতা’, মোহর চাঁদের ‘হীরা’ সিনেমার কাজ শুরু করেন। সেই থেকে আজোবধি অভিনয় করে চলেছেন তিনি। সর্বশেষ তিনি তার নিজের পরিচালনায় ‘একটি সিনেমার গল্প’ সিনেমায় অভিনয় করেন।

১৯৭৫ সালে তিনি শাবানার বিপরীতে ‘চাষীর মেয়ে’ ও কবরীর বিপরীতে ‘লাভ ইন শিমলা’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৭৮ সালে ‘জিঞ্জির’ চলচ্চিত্রে সেই সময়ের প্রতিষ্ঠিত নায়করাজ রাজ্জাক ও সোহেল রানার সঙ্গে অভিনয় করে তিনি এ দেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে আরও অধিক পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৯৮৫ সালে কামাল আহমেদ পরিচালিত ‘মা ও ছেলে’ ছবিতে দীপক চৌধুরী চরিত্রে অভিনয় করে তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এরপর ‘অপেক্ষা’, ‘ক্ষতিপূরণ’, ‘পিতা মাতা সন্তান’, ‘মরণের পরে’, ‘অন্ধ বিশ্বাস’, দেশ প্রেমিক, ‘কে আপন কে পর’, ‘জীবন মরণের সাথী’ সিনেমাতে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন। প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভের বছরেই ১৯৮৫ সালে ‘নিষ্পাপ’ ছবি দিয়ে আলমগীরের চলচ্চিত্র পরিচালনায়ও অভিষেক হয়।

 পারিবারিক টানাপড়েন, সামাজিক অ্যাকশন, রোমান্টিক অ্যাকশন, ফোক ফ্যান্টাসিসহ সব ধরনের চলচ্চিত্রে আলমগীর ছিলেন একজন সফল অভিনেতা। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি প্রযোজক-পরিচালক, গায়ক ও উপস্থাপক হিসেবেও সুনাম কুড়িয়েছেন। আলমগীর শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ও শ্রেষ্ঠ পার্শ্বচরিত্রে অভিনেতা বিভাগে আরও বহুবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন। আলমগীর পরিচালক হিসেবে সর্বশেষ ‘একটি সিনেমার গল্প’ নির্মাণ করেন। তার প্রথম প্রযোজিত সিনেমা ‘ঝুমকা’। এক সময় রাজধানীর গ্রিনরোডে একটি স্কুলে সৈয়দ আব্দুল হাদীর কাছে গানও শিখেছিলেন তিনি। মোস্তফা মেহমুদের ‘মণিহার’ সিনেমায় গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা সত্য সাহার সুর সংগীতে প্রথম প্লে-ব্যাক করেন বহুমাত্রিক এই প্রতিভা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত