'বাবাকে একনজর দেখেছি, দেশের মাটিতে দাফন হয়েছে এটিই সান্ত্বনা'

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০০ পিএম

বাসার আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকা অ্যাম্বুলেন্সটি যেন শুধু একটি যান নয়, একটি পরিবারের ভেঙে পড়া পৃথিবীর নীরব সাক্ষী। ভেতরে কফিন, সাদা কাফনে মোড়ানো নিথর দেহ। বাইরে স্বজনদের ভিড়, কিন্তু কোনো উচ্চস্বরে কান্না নেই শুধু নিঃশব্দ তাকিয়ে থাকা, যেন কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না, এভাবেই ফিরতে হবে প্রিয় মানুষটিকে।

চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর ঈদগাহ বউবাজার এলাকার ভাড়া বাসার সামনে শনিবার সকালে এমনই এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের জন্ম হয়। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত এস এম তারেকের লাশ ঘিরে ভারি হয়ে ওঠে পরিবেশ।

গত ১ মার্চ রাতে প্রাণ হারান তারেক। দীর্ঘ এক মাস পর শুক্রবার সন্ধ্যায় তার মরদেহ দেশে পৌঁছায়। দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে কফিনবন্দি লাশটি আনা হয় তার পরিবারের কাছে যেখানে স্ত্রী ও একমাত্র মেয়ে অপেক্ষা করছিলেন এক অনিশ্চিত প্রতীক্ষায়।

চিকিৎসকদের পরামর্শে কফিন খোলা হয়নি সঙ্গে সঙ্গে। ফলে রাতভর লাশ সামনে থাকলেও প্রিয় মুখটি আর দেখা হয়নি কারও। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে আজ সকালে। জানাজার আগে অল্প সময়ের জন্য কফিন খোলা হয়। সেই মুহূর্তেই ঘটে সবচেয়ে নিঃশব্দ অথচ গভীর দৃশ্যটি।

এক মাস পর বাবার মুখ দেখার সুযোগ পায় এক মাত্র কন্যা তাসনিম তামান্না। তবে তার চোখে ছিল না অশ্রুজল। করেননি কোনও আহাজারি। তিনি শুধু তাকিয়ে থাকেন বাবার নিথর চেহারার দিকে। যেন শোক ও ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। পরে শুধু একটি বাক্যই বলতে পারেন তিনি—'বাবাকে একনজর দেখতে পেরেছি, বাবা দেশের মাটিতে দাফন হয়েছেন এটিই সান্ত্বনা।'

ঘরের ভেতরে তখন অন্য এক দৃশ্য। স্বজনদের মাঝে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তারেকের স্ত্রী রোকেয়া বেগম। তাকে ঘিরে সান্ত্বনা দিচ্ছেন আত্মীয় স্বজন প্রতিবেশীরা। কিন্তু কোনোভাবে তাকে বোঝানো যাচ্ছিল না।

তারেকের মামাতো ভাই মোশাররফ হোসেন বলনে, কফিন না খোলার নির্দেশ ছিল চিকিৎসকদের। তাই রাতভর অপেক্ষার পর সকালে অল্প সময়ের জন্যই মুখ দেখার সুযোগ দেওয়া হয়। “এক মাসের মধ্যে লাশ দেশে এসেছে, দেশের মাটিতে দাফন হচ্ছে—এটাই এখন আমাদের বড় সান্ত্বনা,” বলেন তারেকের মামাতো ভাই মোশাররফ।

২০০৯ সালে জীবিকার তাগিদে বাহরাইনে পাড়ি জমান তারেক। রাজধানী মানামার একটি ড্রাইডক প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। প্রবাসে থেকেও দেশের মানুষের জন্য কাজ করেছেন এমনটাই জানান তার সহকর্মীরা। অনেক বাংলাদেশিকে চাকরি পেতে সহায়তা করেছিলেন তিনি।

যুদ্ধের এই পরিস্থিতির মধ্যে লাশ দেশে আনার বিষয়ে সহায়তার জন্য বাংলাদেশ সরকার, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমানের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তারেকের ভাই মোশাররফ।

তিনি বলেন, বিমানবন্দরে মন্ত্রীরা লাশ গ্রহণ করে আমাদের দিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে লাশ দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা ও পরিবারের জন্য ৫০ হাজার টাকা দিয়েছে সরকার। আরও ১০ লাখ টাকা দেবে তারা। এর আগে স্থানীয় সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান তারেকের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তারেকের মেয়ে তাসনিম তামান্নার সকল ধরনের পড়ালেখার দায়িত্ব নিয়েছেন।’

তারেকের মরদেহ বাহরাইন থেকে চট্টগ্রাম আনতে স্থানীয় সাংসদ হিসেবে কি কি করতে হয়েছে? এমন প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম ১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমানকে দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেদিন আমি ঘটনা শুনি সেদিন থেকে লাগাতার আমি তারেকের মরদেহ চট্টগ্রাম আনতে প্রাণপণ চেষ্টা শুরু করি। কারণ পরিবারটির এবং তারেকের একমাত্র কন্যা তামান্নার একটাই অনুরোধ ছিল আমার কাছে যে তার পিতাকে যে করেই হোক চট্টগ্রাম আনা হয়। তাই আমি দায়িত্ব হিসেবেই আমার চেষ্টাটুকু করেছি।

তিনি আরও বলেন, চলমান এই যুদ্ধে আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের নিহত হওয়া অনেক দুঃখের ও যন্ত্রণার। আমি মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানকারী আমার রেমিট্যান্স যোদ্ধা ভাইদের সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করতে অনুরোধ করব।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত