শিশু, কিশোর-কিশোরীরা সংবেদনশীল। তারা অপরাধে জড়ালে আন্তর্জাতিক সনদ ও শিশু আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক বা কঠোর শাস্তি না দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিশু-কিশোরদের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে আটকাদেশে রেখে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়। সাজা কিংবা জামিনের ক্ষেত্রেও শিশুদের বিষয়ে নমনীয়তার সুযোগ রয়েছে আইনে। আমাদের দেশের বাস্তবতায় এই সংবেদনশীলতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের অপরাধমুক্ত কিংবা অপরাধ থেকে নিবৃত্ত রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীরা।
বিগত কয়েক বছরে বিভিন্ন স্থানে কিশোর গ্যাংয়ের ভয়ংকর তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। খুন, ধর্ষণ, অস্ত্র ও মাদক ব্যবহার, মাদক কারবার, ছিনতাই প্রভৃতি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এক শ্রেণির শিশু-কিশোর। আইনজ্ঞরা বলছেন, শিশু আইনের ‘শিথিলতা’র সুবিধা নিচ্ছে অপরাধপ্রবণ শিশু-কিশোর কিংবা দেশের বিভিন্ন এলাকার অলিগলিতে দাপিয়ে বেড়ানো কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। অপরাধ করলেও আইনে লঘুদ-ের সুযোগে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে মনে করেন তারা। আবার, মামলা হলে শিশু আইনের বিশেষ সুবিধা নিতে অনেক সময় বয়স কম দেখানোর প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কয়েক বছর ধরে শিশু আইনে শিশুদের বয়স ১৮ বছর থেকে কমানো যায় কি না, এমন আলোচনাও উঠে।
আইন অনুসারে ১৮ বছরের কম বয়সীরা শিশু। আন্তর্জাতিক আইন ও শিশুসনদের বাধ্যবাধকতার কারণে শিশুর এই বয়সসীমা কমানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন শিশু-অধিকারকর্মীরা। এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও শিশু অধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৭-১৮ বছর বয়সী অনেকের মধ্যে গুরুতর অপরাধ ও নৃশংস প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে তাদের বিচারের বিষয়ে আপাতত শিশুআইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শিশুসনদে স্বাক্ষরকারী। ওই সনদের ভিত্তিতে শিশুআইনে শিশুর বয়সসীমা ১৮ বছর করা হয়েছে। তাই, ১৮ বছর থেকে কমানোর সুযোগ তেমন নেই।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত কর্মকার দেশ রূপান্তরকে জানান, শিশু আদালতে যারা হাজিরা দেয়, তাদের একটা বড় অংশই কিশোর গ্যাং বলতে যা বোঝায় তার আওতায় পড়ে। বড় বড় অপরাধ করেও তারা শিশু আদালতের সুবিধা নিচ্ছে। যত বড় অপরাধই করুক না কেন বয়স কম হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি সাজার সুযোগ আইনে নেই। স্বাভাবিকভাবে জামিন ও সাজার ক্ষেত্রে তারা সুবিধা পাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এই শিশুরা সত্যিকার অর্থেই শিশু কি না, না কি আইনের সুবিধা নিতে বয়স কম দেখিয়ে সুবিধা নিচ্ছে সেটি দেখতে হবে।’
আইনের আওতায় আসা শিশু-কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকা- থেকে দূরে রাখতে এবং তাদের সংশোধন করে সুস্থ ধারায় ফেরাতে দেশে সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন তিনটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে। গাজীপুরের টঙ্গীতে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র (বালক), একই জেলার কোনাবাড়ীতে একটি উন্নয়ন কেন্দ্র (বালিকা) এবং যশোরের পুলেরহাটে একটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে এই তিনটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১ হাজার ১৯ জন শিশু বন্দি রয়েছেন। তারা সবাই জামিন বা বিচার শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। এর মধ্যে টঙ্গীর সংশোধনাগারে রয়েছেন ৬৬৪ জন শিশু। যার মধ্যে ৬ জন বিভিন্ন মামলায় সাজা হয়ে আটকাদেশপ্রাপ্ত। কোনাবাড়ী উন্নয়ন কেন্দ্রে রয়েছেন ৯৮ জন নারী শিশু। পুলেরহাটের উন্নয়ন কেন্দ্রে রয়েছে ২৫৭ জন শিশু।
উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোর পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। শিশু ও মানবাধিকারকর্মীরা কেন্দ্রগুলোকে উন্নয়ন কেন্দ্র না বলে ‘নির্যাতন কেন্দ্র’ ও অপরাধী তৈরির উৎস বলে থাকেন। এগুলোতে ‘গ্যাং’ ‘ক্যাপ্টেন’ ‘র্যাগিং’র মতো অপসংস্কৃতি ও অপতৎপরতা, ‘সিনিয়র’-‘জুনিয়র’ নিয়ে দ্বন্দ্ব, মারামারি, শারীরিক নির্যাতনের মতো ঘটনার খবর শোনা যায় প্রায়শই। শুধু তাই নয়, উন্নয়ন কেন্দ্রে থাকা শিশুরা আদালতের বিচারকাজের সময় বাইরে এসে প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের সংস্পর্শে আসে। এমন পরিস্থিতিতে উন্নয়ন কেন্দ্র কিংবা আদালতে শিশু আইনে বিচারাধীন শিশুদের সংশোধন বা আচরণের কি উন্নয়ন হয়, সে প্রশ্নও ওঠে প্রায়শই।
উন্নয়ন কেন্দ্রের অব্যবস্থাপনার অভিযোগ সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা অজুহাত হিসেবে জনবলসহ নানা সংকটের কথা বলেন। তারা জানান, এগুলো চলছে একটি প্রকল্পের আওতায়, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া জনবলের ভিত্তিতে। যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক মো. মঞ্জুরুল হাসান দেশ রূপান্তরকে জানান, উন্নয়ন কেন্দ্রে মাঝে-মধ্যে দুয়েকজন হিংস্র আচরণ করে। তবে, তাদের কাউন্সেলিং ও কড়া নজরদারি মধ্যে রাখা হয় এবং একটা পর্যায়ে তারা ঠিক হয়ে যায়। তিনি বলেন, অন্য দুই শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের (গাজীপুরের দুই উন্নয়ন কেন্দ্র) চেয়ে যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের পরিবেশ তুলনামূলক ভালো। কেননা ঢাকা ও আশপাশ এলাকায় কিশোর গ্যাং ও অপরাধপ্রবণতা বেশি।
টঙ্গীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক এমরান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুধু উন্নয়ন কেন্দ্রের পরিচর্যা বা দেখাশোনায় সব হবে না। এখান থেকে যারা বাইরে যায় তাদের প্রতি পরিবার, সরকার ও সমাজের আরও নজর দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, শিশুদের অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে অপরাধে জড়ায় না। কোনো একটি চক্র বা পরিস্থিতিতে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পারিবারিক দেখাশোনার ঘাটতি, আর্থিক সমস্যা ও সামাজিক নিগ্রহের সমস্যা থাকে। তিনি বলেন, সামগ্রিকভাবে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সরকারি, বেসরকারি সংস্থাগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকতে হবে।
আদালত অঙ্গনেও বেপরোয়া, উদ্ধত্য আচরণ : দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদক গত ৩ ও ১২ মার্চ থেকে দুইদিন ঢাকার আদালত এলাকায় শিশু আদালতে হাজিরা দিতে আসা অন্তত ৮ জনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের প্রায় সবার চুলের ছাঁট উদ্ভট, পোশাক-পরিচ্ছদ অগোছালো দেখা যায়। আদালত অঙ্গনেও তাদের বেপরোয়া, অস্বভাবিক ও উদ্ধত্য আচরণ দেখা গেছে। তাদের সবারই শিশু বয়স পেরিয়ে গেছে। গত ৩ মার্চ বেলা সাড়ে ১১টায় ঢাকার জেলা ও দায়রা আদালতের পঞ্চম তলার নারী ও শিশুনির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮ এর বারান্দায় ২০/২১ বছরের দুই তরুণের দেখা মেলে। এর মধ্যে একজন বারান্দায় রাখা বেঞ্চের পুরোটায় হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর পর তার বন্ধুস্থানীয় একজনের সঙ্গে খুনসুটি করছিলেন। দেখে বোঝার উপায় নেই তারা শিশুআইনের মামলায় হাজিরা দিতে এসেছেন। তাদের আচরণে বিচারপ্রার্থী অন্যান্য নারী ও শিশুদের অস্বস্তিবোধ করতে দেখা যায়।
বসার জায়গা না পেয়ে কয়েকজন নারী ও শিশু দাঁড়িয়ে ছিলেন। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা আইনজীবী আজাদ রহমানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ‘প্রতিনিয়তই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আদালতে আসতে-যেতে তাদের মধ্যে এক ধরনের সহজাত চিন্তাভাবনা কাজ করে যে, তাদের কিছুই হবে না। তাই আদালতে এসেও তাদের উদ্ধত্য আচরণ দেখা যায়।’
গত ১২ মার্চ বেলা ১১টায় একই ভবনের ষষ্ঠ তলায় নারী ও শিশুনির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৬ এর দরজা ও বারান্দায় চারজন তরুণের সঙ্গে কথা হয়। এর মধ্যে একজন ডাকাতি মামলায়, দুজন মারামারি মামলায় এবং একজন ছিনতাইয়ের মামলায় শিশু আদালতে হাজিরা দিতে এসেছেন। মামলার সময় তারা শিশু হলেও এখন তারা শিশুকাল পার করেছেন। ডাকাতি মামলায় হাজিরা দিতে আসা তরুণ জানান, ২০২৩ সালে মোহাম্মদপুরে ডাকাতি মামলায় তাকে আসামি করা হয়। পরে শিশু হওয়ায় তাকে পাঠানো হয় উন্নয়ন কেন্দ্রে। জামিনে বেরিয়ে নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন। আদালতে আসতে অস্বস্তিবোধ করেন কি না, জানতে চাইলে বলেন, ‘রেগুলার আসি, খারাপ লাগে না। মালিকের (আল্লাহর) হাতে সব ছেড়ে দিছি।’ এ সময় অন্য এক মামলায় শুনানিতে আসা আইনজীবী বিধান রায় বাবু জানান, শিশুআইনে মামলার দীর্ঘসূত্রতায় অনেকেই হাজিরা দিতে দিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কোনোকিছুই গায়ে মাখে না। একটা অপরাধের পর কেউ কেউ আরও ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক, অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিশুদের বয়সটির নানাভাবে অপব্যবহার হচ্ছে। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত কিশোর বা কিশোরীদের নানাভাবে অপরাধে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। কিন্তু বিচারে যেমন দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে, তেমনি আদালত বা উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোও যথোপযুক্ত নয়। ফলে এক শ্রেণির শিশু-কিশোরদের মধ্যে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘শুধু আইন করে বা সাজা দিয়ে অপরাধ থেকে নিবৃত্ত করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কার যদি না হয়, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের প্রতি যদি নজর না দেওয়া হয়, তাহলে আইন করে বিচার করে শিশুদের অপরাধমুক্ত রাখা আসলে সম্ভব নয়।’
