ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ভিয়েতনামের জনজীবনে। জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে দেশটিতে যাতায়াত ও জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন অ্যাপ-ভিত্তিক রাইড শেয়ারিং ও ডেলিভারি সেবা বা ‘গিগ’ কর্মীরা।
সম্প্রতি দিনভর যাত্রী আনা-নেওয়া শেষে এনগুয়েন নামের এক মোটরবাইক চালক হতাশার সঙ্গে জানান, তার আয়ের অর্ধেকই চলে গেছে জ্বালানি কিনতে। ভিয়েতনামের স্থানীয় অ্যাপ ‘বি’-এর এই চালক জানান, আট ঘণ্টা পরিশ্রম করে তিনি ২ লাখ ৪০ হাজার ভিয়েতনামি ডং (প্রায় ৯.১১ ডলার) আয় করেছেন, যার মধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার ডং-ই চলে গেছে পেট্রোল কিনতে। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘শহরে এই সামান্য টাকা দিয়ে টিকে থাকা অসম্ভব। তেলের দাম না কমা পর্যন্ত আমি অ্যাপ বন্ধ করে কাজ থেকে বিরতি নেব।’
ভিয়েতনাম তাদের অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ কুয়েত থেকে আমদানি করে। কিন্তু হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কার্যকর অবরোধের কারণে তেলবাহী জাহাজ আসা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে দেশটিতে ডিজেলের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে এবং পেট্রোলের দাম বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। হো চি মিন সিটির মতো শহরগুলোতে, যেখানে ৭০ লাখেরও বেশি মোটরবাইক চলে, সেখানে যাতায়াত এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
জনরোষ কমাতে ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ভিয়েতনাম সরকার জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী ফাম মিন চিন গত মাসে ডিজেল, পেট্রোল ও এভিয়েশন ফুয়েলের ওপর থেকে পরিবেশগত কর স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন। ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত এই সুবিধা কার্যকর থাকবে। তবে এই কর ছাড়ের কারণে সরকারের প্রায় ২৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার রাজস্ব ক্ষতি হবে।
সিঙ্গাপুরের আইএসইএএস-ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউটের ভিজিটিং ফেলো এনগুয়েন খাক গিয়াং বলেন, ‘ভিয়েতনামে জ্বালানির দাম বাড়লে সবকিছুর ওপর প্রভাব পড়ে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকার এই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে।’
জ্বালানি সংকটের প্রভাবে ভিয়েতনাম এয়ারলাইনস ও ভিয়েতজেট এয়ারের মতো অভ্যন্তরীণ বিমান সংস্থাগুলো ফ্লাইটের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে। গণপরিবহন ব্যবস্থার ওপরও প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। হো চি মিন সিটির ১৩ নম্বর রুটের বাস কন্ডাক্টর আনহ দাও জানান, টিকিটের দাম ৩ হাজার ডং বাড়ানোর পরেও বাস অপারেটররা লোকসান গুনছে।
উপকূলীয় অঞ্চল বিন থুয়ানের জেলেরা জানান, জ্বালানির দাম বাড়ায় তাদের নৌকার খরচ বাড়ছে, অথচ বাজারে মাছের চাহিদা কম থাকায় তারা সঠিক দাম পাচ্ছেন না। যে মাছ আগে ৮ লাখ ডংয়ে বিক্রি হতো, এখন তা সাড়ে ৬ লাখে বিক্রি করতে হচ্ছে।
সাউগন চিলড্রেন চ্যারিটির কর্মকর্তা উয়েন ফাম জানান, রান্নার গ্যাসের দাম দ্বিগুণ হওয়ায় অনেক পরিবার এখন পুরোপুরি লাকড়ির চুলায় ফিরে গেছে। এমনকি যাতায়াত খরচ বাড়ায় শহরে কর্মরত অনেক বাবা-মা গ্রামে থাকা সন্তানদের দেখতে যাওয়ার নিয়মিত সূচিও কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
এই সংকট ভিয়েতনামকে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে স্বনির্ভর হওয়ার বিষয়টি নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। এনগুয়েন খাক গিয়াং জানান, দেশে মাত্র দুটি রিফাইনারি (শোধনাগার) রয়েছে, যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ভিয়েতনামের বৃহত্তম রিফাইনারি ‘নি সন’ সতর্ক করেছে যে, বিকল্প উৎস না পেলে মে মাসের শেষ নাগাদ তাদের অপরিশোধিত তেলের মজুদ শেষ হয়ে যাবে।
এদিকে, যুদ্ধের প্রভাবে দেশটির বৃহত্তম শিল্পগোষ্ঠী ‘ভিনগ্রুপ’ তাদের পরিকল্পিত এলএনজি-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ স্থগিত করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের মতে, যুদ্ধের কারণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের উচ্চমূল্য এই প্রকল্পের জন্য বড় ঝুঁকি।
আপাতত সরকারের কর ছাড়ের সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও, দীর্ঘমেয়াদী সংকটের আশঙ্কায় এখনো কাটেনি ভিয়েতনামিদের কপালে থাকা চিন্তার ভাঁজ।
সূত্র: আল-জাজিরা
