ভ্রমণ ভিসায় বাংলাদেশে আসছেন চীনা নাগরিকরা। এসে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে আবার চলে যাচ্ছেন নিজ দেশে। পরে আবার আসেন। এভাবে আসা যাওয়ার ফাঁকে তারা রাজধানী ঢাকায় বাসা ভাড়া নেন। সেই বাসায় তারা তৈরি করছেন কেমিক্যাল ল্যাব। দেশীয় বাজার থেকে নানা উপকরণ সংগ্রহ করে ল্যাব বসে তৈরি করছেন ভয়ংকর মাদক কিটামিন। পরে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে এই ভয়ংকর মাদক পাচার করছেন শ্রীলঙ্কা ও চীনসহ নানা দেশে।
সম্প্রতি কুরিয়ারে কিটামিন পাচারের সময় একটি চালান জব্দ করেছে মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ঢাকা মেট্রো উত্তর কার্যালয়।
ডিএনসি জানায়, গত ২৫ মার্চ ৫০ গ্রাম কিটামিনর চালান জব্দের পাশাপাশি তিন চীন নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। রাজধানীর উত্তরায় একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। সেই ফ্ল্যাটে মিলে কিটামিন তৈরি এক ল্যাব। অভিযানে ল্যাব থেকে জব্দ করা হয় ৬.৩০০ কেজি কিটামিন।
গ্রেপ্তার চীনা নাগরিকরা হলেন বিন (৫৯), ইয়াং চুনশেং (৬২) ও ইউ ঝে (৩৬)।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত ডিএনসির প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএনসির মহাপরিচালক মো.হাসান মারুফ।
মো.হাসান মারুফ বলেন, ডিএনসি’র গোয়েন্দা বিভাগ দীর্ঘদিন যাবত কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে মাদক পাচারের বিষয়ে নজরদারি করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রাপ্ত গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ২৫ মার্চ ঢাকার একটি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস অফিসে অভিযান পরিচালনা করে একটি সন্দেহজনক পার্সেল আটক করা হয়। পরবর্তীতে পার্সেলটি তল্লাশি করে একটি ব্লুটুথ সাউন্ড স্পিকারের ভিতরে বিশেষ কৌশলে লুকানো অবস্থায় ৫০ গ্রাম কিটামিন উদ্ধার করা হয় এবং তাৎক্ষণিক রাসায়নিক পরীক্ষায় মাদকটির সত্যতা নিশ্চিত করা হয়।
উদ্ধার করা পার্সেলের তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে রাজধানীর উত্তরা এলাকায় অবস্থানরত একটি চক্রের সন্ধান পাওয়া যায়। পরবর্তীতে একই দিন রাতে উত্তরা পশ্চিম থানাধীন একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তিনজন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়।
তিনি বলেন, অভিযানে ফ্ল্যাটটির একটি কক্ষে গড়ে তোলা অস্থায়ী ল্যাব। এই ল্যাব থেকে থেকে ৬.৩০০ কেজি কিটামিন, বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক দ্রব্য,বিভিন্ন ল্যাব সরঞ্জাম, ডিজিটাল স্কেল, প্যাকেটজাতকরণ যন্ত্রপাতি, মোবাইল ফোন এবং দেশি-বিদেশি মুদ্রা উদ্ধার করা হয়। চক্রটি এই ল্যাবে সুসংগঠিতভাবে মাদক প্রক্রিয়াজাত, সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাচারের সাথে জড়িত ছিল।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা স্বীকার করে যে, তারা তরল কিটামিন সংগ্রহ করে ফ্ল্যাটের ভেতরে ল্যাব স্থাপন করে তা পাউডার আকারে প্রক্রিয়াজাত করত এবং পরবর্তীতে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিদেশে পাচারের চেষ্টা করত।
তিনি আরও বলেন, চক্রটি ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মাদকের অর্ডার গ্রহণ করত এবং একই মাধ্যমে বড় পরিসরে মাদক সংগ্রহ করত। তারা কিটামিন প্রক্রিয়াজাত করে সাউন্ড স্পিকারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ভিতরে লুকিয়ে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে পাচার করত। তারা অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে চক্রটি ক্রিপ্টোকারেন্সিনির্ভর পদ্ধতি অনুসরণ করত। তারা মূলত টিআরওএন (TRON) নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে লেনদেন পরিচালনা করত এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে মূল্য গ্রহণ করত। পরবর্তীতে তারা ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ ইউএসডিটি সমপরিমাণ অর্থ একত্রে উত্তোলন করত, যা তাদের কার্যক্রমকে গোপন রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক ছিল।
মাদকের ডিজি বলেন,আসামিরা এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার, নিয়মিত ডিজিটাল তথ্য মুছে ফেলা, মোবাইল ফোন ও সিম পরিবর্তন এবং ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহারসহ বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে নিজেদের কার্যক্রম গোপন রাখত। ফলে গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম জটিল হয়ে ওঠে। তবে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ ও ধারাবাহিক গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে এই নেটওয়ার্কের কার্যক্রম ধাপে ধাপে উন্মোচিত হচ্ছে।
গ্রেপ্তার এই ভয়ঙ্কর মাদক কোনো কোনো দেশে পাচার করত জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তারা শ্রীলংকা ও চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এই মাদক পাচার করে আসছিল।
এই চীনা নাগরিকরা বাংলাদেশে কতদিন ধরে অবস্থান করছিল এবং তারা কি ভিসায় বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে জানতে চাইলে মাদকের ডিজি বলেন, তারা মূলত ভ্রমণ বিষয়ে বাংলাদেশে আসতো। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে আবার তারা নিজ দেশে চলে যেত। পরবর্তীতে বিসা রিনিউ করে আবার বাংলাদেশে প্রবেশ করত। বাংলাদেশে এভাবে আসা-যাওয়ার মাধ্যমে তারা ল্যাব স্থাপন করে এই মাদক তৈরি করে বিদেশে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাচার করে আসছিল। তারা দীর্ঘদিন ধরে এভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করে আসছিল।
তারা বাংলাদেশের কোথায় থেকে এই মাদকের কাঁচামাল সংগ্রহ করত এবং তাদের সাথে দেশীয় কেউ জড়িত আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই বিষয়ে আমরা এখন কিছু বলবো না তবে আমাদের কাছে তথ্য আছে। আমরা গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করছি এবং এই বিষয়ে আমাদের আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
