রহনপুরের লালপা ঢেঙ্গা

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২০ এএম

এক বিরল প্রজাতির রাজহাঁসের খোঁজে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর ইউনিয়নে এসেছি। এখানকার ভারত সীমান্তবর্তী চরইল বিলে পাখিটিকে খুঁজব। রহনপুরের বিশিষ্ট পাখি সংরক্ষক ও স্কুলশিক্ষক মাশওয়ারুল হক জিকেন। তিনি বিপ্লব মাঝিকে আমাদের পাখি দেখার ব্যবস্থা করতে বললেন। বিলের কোথায় কোন পাখি দেখা যায় তা বিপ্লবের নখদর্পণে। ভোর ৬টা ১০ মিনিটে লোকাল ট্রেনে রাজশাহী রেল স্টেশন থেকে রহনপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। দুপুর ২টা ২০ মিনিটে ট্রেন রহনপুর স্টেশনে পৌঁছাল। লোকাল ট্রেনের এমন সময়ানুবর্তিতায় খুশি না হয়ে পারলাম না।

প্রায় ৭ বছর পর এখানে এলাম। জায়গাটি আমের জন্য বিখ্যাত। এক সময় রহনপুরই ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের মূল পাইকারি বাজার। ট্রেন থেকে নেমে নাশতা সেরে পুনর্ভবা নদী পার হলাম পরিত্যক্ত রেল সেতু হেঁটে। এই রেল লাইনটি চলে গেছে ভারতে। এক সময় এর ওপর দিয়ে ট্রেন চললেও এখন রহনপুরের লোকজন মূলত নদী পার হওয়ার জন্যই সেতুটি ব্যবহার করেন। সেতু পার হয়ে ওপারে গিয়ে অটো চেপে ৬ কিলোমিটার দূরের চরইল বিলে পৌঁছলাম সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে।

বিলের ঘাটেই বাঁধা ছিল নৌকা। বিপ্লব, মিলন ও নির্বাচন নামের তিনজন মাঝি তিনটি নৌকা নিয়ে আমাদেরসহ তিনটি দল নিয়ে একসঙ্গে রওনা হলো। কিন্তু ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট ধরে পুরো বিল দু’বার চক্কর দিয়েও রাজহাঁসগুলোর সন্ধান পেলাম না। অবশেষে বেলা ১১টা ৩১ মিনিটে আরাধ্য রাজহাঁস তিনটি আমাদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল। উড়ার ভঙ্গি ও কপালের সাদা দাগই ওদের পরিচয় বলে দিল। দুপুর ১টা ১৩ মিনিট পর্যন্ত ওদের ছবি তুললাম। এরপর জিকেন ভাইয়ের মাছের ঘেরের দিকে রওনা হলাম। আগে যে দু’বার এখানে এসেছিলাম তখন বেশ কিছু সৈকত পাখির দেখা পেয়েছিলাম। সেই আশায়ই একবার ওখানটায় চক্কর দিতে গেলাম।

দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে ওখানে পৌঁছলাম। প্রচুর পাখি। আর এত প্রজাতির পাখির মধ্যে লম্বা লম্বা লাল পায়ের সাদা-কালো পাখির সংখ্যাই বেশি। পাখিগুলোকে ২০১৩ সাল থেকে নিয়মিতভাবে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার বাইক্কা বিল ও সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়া হাওরে দেখি। তবে রাজশাহী বিভাগে রহনপুরেই ওদের আজ প্রথম দেখলাম। নৌকা এগোতে এগোতে ওদের একদম কাছে চলে এলো। আর আমরাও পেয়ে গেলাম নানা অ্যাঙ্গেলে ওদের ছবি। এর আগে পাখিগুলোকে এত কাছ থেকে কখনো দেখিনি। এ বছরের ১৭ জানুয়ারির ঘটনা এটি।

রহনপুরের চরইল বিলে দেখা লাল পায়ের সাদা-কালো পাখিগুলো এ দেশের দুর্লভ পরিযায়ী পাখি অনিন্দ্য সুন্দর লালপা ঢেঙ্গা। রামঠেঙ্গি, রণঠেঙ্গি, রাজ ঢেঙ্গা বা রণপা নামেও পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে বলে লাল ঠেঙ্গি বা লাল গোরি। ইংরেজি নাম ইষধপশ-রিহমবফ ঝঃরষঃ। রিকার্ভিরস্ট্রিডি (জবপঁৎারৎড়ংঃৎরফধব) গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম ঐরসধহঃড়ঢ়ঁং যরসধহঃড়ঢ়ঁং (হিমানটোপাস হিমানটোপাস)। শীতে পাখিগুলো উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে এ দেশে পরিযায়ী হয়ে আসে।

একনজরে লাল-পা ঢেঙ্গা অত্যন্ত লম্বা ও ছিপছিপে পাখি। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের দৈর্ঘ্য ৩৫-৪০ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ৬৮-৭১ সেন্টিমিটার ও ওজন ১৬৫-২০৫ গ্রাম। পুরুষের মাথার চাঁদি ও ঘাড় কালচে-ধূসর, প্রজননকালে যা পুরোপুরি সাদা হয়ে যায়। ডানা ও কাঁধ-ঢাকনির ওপরের অংশ কালো। পিঠ ধাতব কালো। দেহের নিচসহ বাদবাকি অংশ পুরোপুরি সাদা। স্ত্রী পুরুষের থেকে আকারে খানিকটা ছোট হয় এবং ওর কাঁধ-ঢাকনি ও ডানা বাদামি। স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে চঞ্চু সরু, সোজা, কালো ও লম্বা। চোখের রঙ লাল। লম্বা পা দুটো গাঢ় লাল। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির হলদে পাড়ের পিঠের পালক বাদামি এবং মাথার চাঁদি ও ঘাড়ের নিচে থাকে ধূসর আভা।

লালপা ঢেঙ্গা হাওর, বিল, হ্রদ, বিভিন্ন ধরনের জলাশয়, লবণ চাষের জমি ইত্যাদিতে ছোট বা মাঝারি দলে বিচরণ করে। এ ছাড়া অন্য খাদ্য সন্ধানী জলচর পাখির মিশ্র দলেও চরে বেড়াতে দেখা যায়। অগভীর পানিতে ধীরে ধীরে হেঁটে লম্বা চঞ্চু দিয়ে পানি বা কাদা থেকে প্রিয় খাবার, যেমন চিংড়ি, জলজ পোকামাকড় ও প্রাণী খায়। আকাশে উড়ার সময় লম্বা পা দুটো দেহের পেছনে টেনে রাখে ও ‘কিপ-কিপ--’ বা ‘চেক-চেক-চেক---’ শব্দে ডাকে।

এপ্রিল থেকে আগস্ট প্রজননকাল। এ সময় ওরা নিজ আবাস এলাকার শুকনো মাটিতে ঘাস, লতাপাতা ও ক্ষুদ্র বস্তু দিয়ে স্তূপাকার বাসা বানায় ও তাতে তিন থেকে চারটি জলপাই রঙের ডিম পাড়ে। বাসা বানানো, ডিমে তা দেয়া ও ছানাদের লালনপালন স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে করে। ডিম ফোটে ২২-২৬ দিনে। ছানারা খুব দ্রুত বাড়ে এবং প্রায় চার সপ্তাহে উড়তে শিখে ও বাসা ছাড়ে। দেড় থেকে দু-মাস বয়সে ছানারা স্বাবলম্বী হয়ে যায়। আর এক থেকে দুবছর বয়সে প্রজননক্ষম হয়। আয়ুষ্কাল সাত থেকে আট বছর।

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত