চট্টগ্রাম নগরীর নয়াবাজার বিশ্বরোড এলাকার ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘দুহা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল’। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) থেকে ট্রেড লাইসেন্স নেয়। তবে এরপর দুটি অর্থবছর পেরিয়ে গেলেও আর লাইসেন্স নবায়ন করেনি। এ চিত্র শুধু দুহা ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ক্ষেত্রেই নয়, গত পাঁচ অর্থবছরে চসিকের প্রায় ৬৪ হাজার গ্রাহক লাইসেন্স নবায়ন করেনি। এতে রাজস্ব হারাচ্ছে সংস্থাটি।
চসিকের বিগত পাঁচ অর্থবছরের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নিবন্ধিত লাইসেন্সগুলোর একটি বড় অংশই যথাসময়ে নবায়ন করা হচ্ছে না। প্রাপ্ত তথ্য মতে, বিগত পাঁচ বছরে মোট ১ লাখ ৫২ হাজার ৫২৪টি নবায়নযোগ্য সুযোগের বিপরীতে মোট ৬৩ হাজার ৯৩৭টি ক্ষেত্রে লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি। বছরের শুরুতেই বিপুলসংখ্যক গ্রাহক বা প্রতিষ্ঠান নতুন লাইসেন্স গ্রহণ করলেও পরবর্তী অর্থবছরে তাদের ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এর মধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরে নতুন ও নবায়ন মিলিয়ে মোট ৮০ হাজার ৩৪২টি লাইসেন্স থাকলেও পরবর্তী ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১২ হাজার ৩৭৮টি লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নবায়ন হয়নি ১৫ হাজার ৬২৮টি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৯ হাজার ৪১৮টি এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও ১৬ হাজার ৫১৩টি লাইসেন্স নবায়ন ছাড়া থেকে যায়।
কেন নবায়নের বাইরে থাকছে? : সরাইপাড়া এলাকার স্টেশনারি ও ফটোকপির দোকান ‘আরাফা স্টেশনারি’। দোকানটির ট্রেড লাইসেন্স সর্বশেষ কবে নবায়ন করা হয়েছিল, তা খোদ দোকানিও বলতে পারেন না। দোকানি মো. হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটা ট্রেড লাইসেন্স নতুন করতে ৩ হাজার টাকা লাগে। আর নবায়ন করতে গেলে দিতে হয় ৬ হাজার টাকার মতো, যার মধ্যে ৩ হাজার টাকাই আয়কর। গলির ভেতরের এই দোকানে লাভই বা কত? অন্যদিকে দুহা ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের পরিচালক হাসান মাহমুদ দুই বছর ধরে লাইসেন্স নবায়ন না করার কথা স্বীকার করে বলেন, সাইনবোর্ড-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে একটি ঝামেলা আছে। আমাদের বিদ্যালয়ে সাইনবোর্ডের জন্য প্রায় লাখ টাকার মতো ফি বসানো হয়েছে
নবায়নের পথে বড় বাধা ৩ হাজার টাকা আয়কর : অর্থ আইন ২০০৭ দ্বারা আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর ৫২ (ক) সংশোধন করে সিটি করপোরেশনকে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করার সময় প্রতিটি ট্রেড লাইসেন্স বাবদ আরও ৫০০ টাকা উৎসে কর বাবদ এনবিআরের অনুকূলে আদায় করা হতো। অর্থ আইন ২০১৯-এর ২৭ ধারায় সেই উৎসে কর বাড়িয়ে ৩ হাজার টাকা করা হয়েছে। ফলে গত ২০১৯-২০২০ অর্থবছর থেকে ট্রেড লাইসেন্স ফি’র সঙ্গে অতিরিক্ত ৩ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই ফি বড় ধরনের বোঝার মতো বলছেন ব্যবসায়ীরা। দেওয়ানহাট এলাকার পান-সিগারেটের দোকানদার খালেকুজ্জামান বলেন, আমাকে সিটি করপোরেশনের লোকেরা বুঝিয়ে ট্রেড লাইসেন্স বানিয়ে দিয়েছে। এখন নবায়ন করতে হলে প্রতি বছর ৩ হাজার টাকা আয়কর দিতে হবে। আমার এই ছোট দোকানে ৩ হাজার টাকা কর দিলে আমার থাকবে কী?
দি চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে আয়কর সবার জন্য ৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করা সঠিক নয়। ব্যবসার ধরন, আয়ের ওপর শ্রেণিভুক্ত আয়কর নির্ধারণ করা যেতে পারে। আবার আরেকটা বিষয় হলো, আয়কর দেওয়ার পর আমার নাগরিক সুবিধা ঠিকমতো নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, সেটাও দেখার বিষয়।
ট্রেড লাইসেন্স কী ও কেন? : ব্যবসা বা পেশা নিবন্ধনের আইনি ভিত্তি ও প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক সনদ হলো ট্রেড লাইসেন্স। চট্টগ্রামের মতো ঢাকার দুই সিটিতেও ব্যবসার ধরন ভেদে সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা ট্রেড লাইসেন্স ফি ধার্য আছে। স্থানীয় সরকার আইন অনুযায়ী, যেকোনো ধরনের বৈধ বাণিজ্যিক কর্মকা- পরিচালনার জন্য এই সনদ গ্রহণ বাধ্যতামূলক। এই ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ করলে তা প্রতি বছর নির্দিষ্ট ফি, ভ্যাট, আয়কর প্রদান করে নবায়ন করা বাধ্যতামূলক। তবে ট্রেড লাইসেন্সের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে যথাযথ আবেদনের মাধ্যমে তা স্থগিত বা বাতিল করার সুযোগ আছে। অন্যথায় প্রতি বছরই জরিমানাসহ বকেয়া যুক্ত হতে থাকবে।
ট্রেড লাইসেন্স থেকে চসিকের কত আয় : নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ট্রেড লাইসেন্স থেকে চসিক আয় করেছে ২৩ কোটি ৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এর মধ্যে নতুন ১৪ হাজার ৬৭৫টি লাইসেন্স থেকে আয় হয়েছে ৩ কোটি ১১ লাখ ৭০ হাজার ৯২৫ টাকা। আর ৬৫ হাজার ৬৬৭টি লাইসেন্স নবায়নের বিপরীতে এসেছে ১৯ কোটি ৯২ লাখ ৯৯ হাজার ২৯৮ টাকা। একইভাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয় হয়েছে ২৪ কোটি ৪৩ লাখ ৫৮ হাজার ৩৫৯ টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৪ কোটি ৬৫ লাখ ৯২ হাজার, ৭০৩ টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৬ কোটি ১৮ লাখ ৯৪ হাজার ৫৭৯ টাকা এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ কোটি ৬৭ লাখ ৮১ হাজার ২৭৫ টাকা।
পাঁচ বছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয় না গড়ে ২৩ শতাংশ : বিগত চার অর্থবছরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ট্রেড লাইসেন্স ফি আদায়ের দাপ্তরিক হিসাব বিবরণী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, করপোরেশন যে পরিমাণ নতুন ও নবায়নযোগ্য লাইসেন্সের বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে, প্রকৃত আদায়ে তার বড় একটি শতাংশ অর্জনের বাইরে থেকে যায়। ২০২১-২২ অর্থবছরে ট্রেড লাইসেন্সের মোট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৮টি এবং তার বিপরীতে রাজস্ব আয়ের বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩২ কোটি ৩ লাখ ৩৯ হাজার টাকা। কিন্তু ওই অর্থবছরে রাজস্ব আয় হয়েছে ২৩ কোটি ৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ৭২ শতাংশ। অর্থাৎ অর্জনের বাইরে বা অনাদায়ী থেকে গেছে ২৮ শতাংশ টাকা। কিন্তু পরের ২০২২-২৩ অর্থবছরে লাইসেন্সের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৩৬টি এবং রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৩২ কোটি ৪০ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। এই অর্থবছরে অর্জিত হয়েছে ৭৪ শতাংশ এবং অর্জনের বাইরে রয়ে গেছে ২৬ শতাংশ টাকা। এরপর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লাইসেন্সের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২১ হাজার ৬৯৯টি এবং রাজস্ব দাবি ধরা হয় ৩৩ কোটি ৪০ লাখ ০৩ হাজার ৪৬০ টাকা। তবে এ বছরও অর্জিত হয়েছে মাত্র ৭৪ শতাংশ টাকা। পরবর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লাইসেন্সের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ২৬ হাজার ৮৩৪টি এবং রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৩৪ কোটি ৪৫ লাখ ৪২ হাজার টাকা। এ বছর অর্জন হয়েছে ৭৬ শতাংশ এবং অর্জনের বাইরে থাকে ২৪ শতাংশ টাকা। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লাইসেন্সের বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা সর্বোচ্চ ১ লাখ ৩৪ হাজার ৭১৬টিতে উন্নীত করা হয় এবং রাজস্ব অর্জনের লক্ষ্য ধরা হয় ৩৬ কোটি ২৮ লাখ ১৭ হাজার ৮২০ টাকা। এ বছর অর্জিত হয়েছে ৮৫ শতাংশ, আর অর্জনের বাইরে থাকে ১৫ শতাংশ টাকা।
রাজস্ব বিভাগের বক্তব্য : চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয়ের সুবিধার্থে ৪১টি ওয়ার্ডকে আটটি সার্কেলে ভাগ করা হয়েছে। আটটি সার্কেলের তিনজন কর কর্মকর্তা জানান, লাইসেন্স নবায়ন না করাদের মধ্যে বড় একটা অংশ ভাসমান ব্যবসায়ী। হঠাৎ কোনো প্রয়োজনে লাইসেন্স করলেও প্রয়োজন শেষ হলে তারা আর লাইসেন্স নবায়ন করেন না। এর বাইরে ৩ হাজার টাকা আয়করের জন্য অনেক ব্যবসায়ী নবায়ন করতে আগ্রহী না। তারা জানান, নবায়ন করার জন্য প্রথম আমাদের পরিদর্শকরা গিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে নোটিশ প্রদান করেন। এরপরও আদায় না করলে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। সর্বশেষ মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। তিন নং রাজস্ব সার্কেলের কর কর্মকর্তা জানে আলম বলেন, আমরা নবায়ন করানোর জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করি। বছরে দেড় থেকে ২ হাজার নোটিশ প্রদান করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এসএম সরওয়ার কামাল বলেন, লাইসেন্স শতভাগ নবায়ন না হওয়ার পেছনে কিছু কারণ থাকে। তবে নবায়নের হার আগের তুলনায় গত অর্থবছরে কিছুটা বেড়েছে। এটা আরও বাড়ানোর জন্য আমরা চেষ্টা করছি।
উল্লেখ্য, রাজস্ব আদায়ে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে প্রতি বছর লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হলেও গড়ে বার্ষিক নির্ধারিত রাজস্বের ২৪.৪ শতাংশ বা প্রায় এক-চতুর্থাংশ টাকাই অর্জনের বাইরে বা অনাদায়ী থেকে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে লাইসেন্স নবায়নের হার বাড়লে করপোরেশনের রাজস্ব আহরণের ঘাটতি কমে আসত।