অহনা, অর্চি পাখি ডাকার আগে ঘুম থেকে ওঠে। তখনো নারিতা, নোরা ঘুমিয়ে। নারিতারা থাকে তিনতলায়। অহনা, অর্চি বিল্ডিংয়ের পাশে কাঁচা ঘরে থাকে।
পাশাপাশি অনেক দিন থাকার কারণে ওদের মধ্যে ভাব হয়ে গেছে। যদিও বয়সে অনেক ফাঁক। তবু ওরা বন্ধু। অহনা স্কুলে যায়। অন্যরা বাসায় পড়ে।
ছুটির দিনে সকাল ১০টার পরে অহনা ডাকতে আসে নারিতাকে। তিনতলার ডোর বেলের সুইচ টিপে। নারিতা বেলের শব্দে বুঝতে পারে কে এলো।
দাদুর বেলের শব্দ, বাবার বেলের শব্দ, ঠাম্মার বেলের শব্দ ভিন্ন। অহনারটাও আলাদা। অহনার বেলের শব্দ শুনে নারিতা দরজায় যায়।
অহনা বলে, চল নারিতা নিচে, খেলবে না?
‘দাঁড়াও, ড্রেস পাল্টিয়ে আসছি।’
ঠাম্মা একটি জামা এনেছে নারিতার জন্য। সেটা সবসময় নারিতা পরে। আজকেও সেই জামা পরে নিচে খেলতে যায় নারিতা।
কত রকম খেলা। একেক দিন একটা খেলা করে ওরা। ব্যাডমিন্টন, কানামাছি, ছুট খেলা। খেলা শেষে ওরা সবাই বসে।
কদিন পরে পহেলা বৈশাখ।
কে কী করবে? কোথায় যাবে? কে কী জামা পরবে?
অহনা সবার বড়। তাই সে আগে কথা বলে।
অহনা বলে, নারিতা, তুমি কী রঙের জামা পরবে?
‘বাবাকে বলব। দেখি বাবা কী বলেন?
নারিতা উত্তর দেয়।
‘ডিসিহিলের মেলায় যাবো। ওখানে আমি কবিতা আবৃত্তি করবো।’ অহনা বলে।
‘আমি নাচ করবো, রবীন্দ্রসংগীতের গানে।’
নারিতা বলে।
‘আমি গান করবো।’ অর্চি বলে।
সবার কথা শুনে চুপ থাকে নোরা। কিছু বলে না। নারিতার ছোটবোন নোরা।
নারিতা নোরাকে বলে, তুই কী করবি, বলবি না?
‘তুমি তো বললে নাচ করবে। মাকে বলেছো? মা যদি অন্যকিছু বলতে বলে, তখন? আমি মাকে জিগ্যেস করবো আগে। মা যেটা করতে বলে সেটাই করবো। আমিতো সব পারি।’
নোরার কথায় নারিতা বলে, ‘ও, ঠিক, তাই তো, এটা তো ভাবিনি।’
বাসায় ফিরে নারিতা মাকে বলে, ‘মা, মা এবার পহেলা বৈশাখে ডিসিহিলে আমি কী করবো? নাচ, না গান?’
মা কাজে ব্যস্ত। নারিতার কথা শোনেনি। তাই কথার উত্তর না দিয়ে বিছানা ঠিক করছিল।
নারিতা এবার মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘মা, শোননি? এবারে পহেলা বৈশাখে ডিসিহিলে কী করবো?’
‘গান করবি। তুই গান ভালো পারিস।’
সঙ্গে সঙ্গে নোরা লাফিয়ে বলে, ‘দিদি, আমি বলেছিলাম না, মাকে জিগ্যেস করে বলবো। তুমি তো বলে দিয়েছ নাচ করবে! এখন?’
কাল পহেলা বৈশাখ! কী আনন্দ! কাল সকালে ডিসিহিলে যাবে। বাসায় নাড়ু বানাবে, খৈ ভাজবে। নতুন জামা এনেছে মা। পহেলা বৈশাখে পরবে।
ডিসিহিলে নারিতা গান করবে। নোরা কবিতা পাঠ করবে। বাসায় কয়েকবার রিহার্সেল দিয়েছে মা।
ভোর হলেই ছুটে যাবে মেলায়। কারও চোখে ঘুম নেই।
মা বলেছে, তাড়াতাড়ি ঘুমোতে। মায়ের জন্য সবুজপাড়ের সাদা জমিনের শাড়ি কেনা হয়েছে। পহেলা বৈশাখে পরবে।
ভোরের অনেক আগে বৃষ্টি শুরু।
নারিতা, নোরা, মা সবাই নতুন কাপড় পরে তৈরি। বৃষ্টি থামে না। বৃষ্টির ওপর সবার রাগ হয়।
নারিতা জানলায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টিকে ডেকে বলে, ‘এই বৃষ্টি ভাই, এবার একটিবার থামো। আমরা ডিসিহিলে যাবো। আমি গান করবো। নোরা কবিতা পাঠ করবে।’
বৃষ্টি শোনে না নারিতার কথা। নোরাও রাগে। তখনই অহনা, অর্চি আসে।
সবার ভাবনা বৃষ্টিকে নিয়ে। কখন থামবে। এদিকে নারিতার গানের সময় সকাল সাড়ে ৮টায়। এখন আটটা বাজে।
একসময় সাড়ে ৮টা বাজে।
নারিতা আবেগে কাঁদে। মা আদর করে কান্না
থামাবার চেষ্টা করে। না, না। কিছুতেই নারিতার কান্না থামে না।
নোরা বলে, ‘দিদি, আর কেঁদ না। কাঁদলে গান করতে পারবে না। গলা ভেঙে যাবে। বেসুরা গান হবে।’
নারিতা নোরাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে।
হঠাৎ বাবা এসে বলে, বৃষ্টি থেমেছে। কী মজা! সবাই মেলায় যাবো। চল, চল!
নারিতার কান্না থামে। আকাশে সূর্য উঁকি মারে। নারিতার বাবা বলে, আমিও ডিসিহিলে যাবো। নারিতার গান শুনবো, নোরার কবিতা শুনবো।
ঠাম্মা বলে, ‘শিপু, তুই হঠাৎ মেলায় যাবি!
ব্যাপার কী?
‘মা, তোমার নাতনি নারিতা গান করবে, নোরা কবিতা পাঠ করবে। দেখবো না?’
‘ও, তাই বল।’
‘ওরা সবাই ডিসিহিলে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি ভেঙে
নিচে নামে।’
নারিতা, নোরা, অহনা, অর্চি, মা, বাবা।
ওদের সবার চোখে পহেলা বৈশাখের হাসি।