ওয়ান-ইলেভেনের অজানা সত্য উদঘাটনের তাগিদ

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০৬ এএম

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্তের সময় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শারীরিকভাবে নির্যাতনের কোনো বিধান নেই। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগে যেসব ব্যক্তি ২০০৭-০৮ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, তাদের অনেককে রিমান্ডের সময় শারীরিক ও মানসিকভাবে ব্যাপক নির্যাতন করা হয়েছে, এমন অভিযোগ রয়েছে।

দুদক আইন অনুযায়ী, কোনো অভিযোগের অনুসন্ধান বা তদন্তের বিষয়ে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি পরবর্তীতে কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবে না। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই বিধান না থাকলে ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময়ে দুর্নীতি দমনের নামে যে নির্যাতন ও কর্মকান্ড হয়েছে, তা তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতো। তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়তো রোধ করা যেতে পারে। তারা মনে করেন, দুই দশক পরও সেই সময়ের পূর্ণ সত্য আজও অনেকটাই আড়ালে রয়ে গেছে। এ বিষয়ে এখন অনুসন্ধান ও তদন্ত করা যায় কি না, খতিয়ে দেখা দরকার।

সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ এবং দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল ও প্রসিকিউশন) মো. মঈদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুদক আইনে কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শারীরিকভাবে নির্যাতনের কোনো বিধান নেই। আবার কোনো ব্যক্তি দুদক কর্মকর্তা দ্বারা হয়রানির শিকার হলে পরবর্তীতে কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবে না। কিন্তু ২০১৩ সালে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী ওয়ান-ইলেভেন সময়ে যাদের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটেছে, তারা আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবেন কি না, সেটি আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে দেখতে পারেন।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তদানীনন্তন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্গঠনের পর সেনা-সমর্থিত ‘ওয়ান-ইলেভেনের’ সরকার হিসেবে পরিচিতি পায়। এ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করে। এই নীতি কার্যকর করার ক্ষেত্রে ঘোষিত লক্ষ্য ছিলÑ রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা দুর্নীতির নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া। জরুরি অবস্থার আওতায় জারি করা আইনি কাঠামো ব্যবহার করে দুর্নীতি দমন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে তখন রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার অনেককে দ্রুত গ্রেপ্তার ও মামলা দায়ের করা হয়। মামলার তদন্ত করা হয়। কিন্তু এসব মামলার বেশির ভাগ আদালতে প্রমাণিত না হওয়ায়, আবার অনেক ক্ষেত্রে নিম্ন আদালতে সাজার রায় উচ্চ আদালতে বাতিল হওয়ায় তখনকার দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের উদ্দেশ্য, কার্যকারিতা, বিচারিক প্রক্রিয়া ও তার ফলাফল নিয়ে বিতর্ক এখনো চলছে।

ওয়ান-ইলেভেনের সময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে আটক করা হয় দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে। একইভাবে বিএনপি নেতাদের মধ্যে তারেক রহমান, যিনি বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী, আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, লুৎফুজ্জামান বাবরসহ অনেকে, আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অসংখ্য নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। ব্যবসায়ীদের মধ্যে সালমান এফ রহমান ও বর্তমানে মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টুসহ অনেকে গ্রেপ্তার হন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনাসহ দলটির নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করা হয়। তার সরকারের সময় বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ বিএনপি নেতাদের অনেকের আদালতের রায়ে সাজা হয়। পরবর্তীতে উচ্চ আদালতের রায়ে অভিযোগ থেকে রেহাই পান। 

অভিযোগ রয়েছে, ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের সময় দুদক চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল হাসান মশহুদ চৌধুরী। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর দুদকের মহাপরিচালক পদে নিয়োগ পান কর্নেল হানিফ ইকবাল। সেনা কর্মকর্তা হাসান মশহুদ ও হানিফ ইকবাল দুদকের দায়িত্বে থাকাকালে সব মিলিয়ে চারটি তালিকায় দুর্নীতির অভিযোগে সন্দেহভাজন হিসেবে ২০০ জনের নাম প্রকাশ করা হয়।

দুদক আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনারের অনুমোদন সাপেক্ষে অনুসন্ধান নথি চালু করা হয়। ওয়ান-ইলেভেন সময়টা ছিল এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।

দুদকের কয়েকজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় দুদকের কর্মকা- পরিচালিত হয়েছিল জরুরি বিধিমালা ১৬/২ ধারা অনুযায়ী। তখন সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করে আইনি ব্যবস্থা নিতে একজন সেনাকর্মকর্তার নেতৃত্বে এনবিআর, র‌্যাব ও দুদকসহ বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের নিয়ে ঢাকা মহানগরের জন্য ৪০টি এবং ৬৩ জেলার জন্য ২১টিসহ মোট ৬১টি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। তখন দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য আমলে নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসত সেনাবাহিনীর ওল্ড-অফিসার্স মেসে স্থাপিত টাস্কফোর্সের অফিস থেকে। সেখান থেকে অনুমোদন হওয়ার পরই অনুসন্ধানের নথি চালু হতো এবং অনুসন্ধান শেষে থানায় মামলা করা হতো। মামলার পর তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হতো। এসব প্রক্রিয়ার মধ্যে টাস্কফোর্স টিমের একজন সদস্য হিসেবে দুদক কর্মকর্তা অভিযোগ অনুসন্ধান সংক্রান্ত ফাইলে স্বাক্ষর, নোটিস জারি, চিঠিপত্র ইস্যু ও আদালতে আবেদন করতেন। আদালত দুদক কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড মঞ্জুর করত। এরপর দুদক কর্মকর্তাকে আর কিছুই জানাত না। অভিযুক্তকে রিমান্ডে আনার পরই টাস্কফোর্স প্রধান তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কোথায় নিয়ে যেতেন, তাও ছিল দুদকের অজানা।

দুদক কর্মকর্তাদের অভিযোগ, যাদের গ্রেপ্তার করা হয়, তাদের বেশির ভাগকে গোপন স্থানে রেখে হাত-পা বেঁধে ফ্যানের সঙ্গে ঝোলানো ও ইলেকট্রিক শক দেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে।

দুদক কর্মকর্তারা বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের সময় সংস্থার চেয়ারম্যান হাসান মশহুদ চৌধুরী রিমান্ডে আনার পক্ষে ছিলেন না। তিনি বলতেন, দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান মামলা দায়ের এবং তদন্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিলের দায়িত্ব দুদকের। তার শক্ত অবস্থানের কারণে দুর্নীতির অভিযোগের প্রথম ও দ্বিতীয় তালিকায় থাকা ১০০ জনকে রিমান্ডে আনা হয়নি।

তারা বলেন, ‘রিমান্ডের ব্যবসা’ শুরু হয় তৃতীয় তালিকায় ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করার পর থেকে। তৎকালীন জাতীয় দুর্নীতিবিরোধী সমন্বয় কমিটির প্রধান লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং দুদক মহাপরিচালক কর্নেল হানিফ ইকবালের নেতৃত্বাধীন প্রভাবশালী একটি  সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও আমলাসহ সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের  গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে নিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় শুরু করে। যারা টাকা দিতে পারত না, তাদের ওপর বেশি মাত্রায় নির্যাতন চালানো হয়েছে। শুধু অর্থ হাতিয়ে নিতেই ‘রিমান্ড ব্যবসা’ চালানো হয়েছে, এমন অভিযোগ আছে।   

দুদক কর্মকর্তারা বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের সময় রিমান্ডের নামে শারীরিক নির্যাতন করা হলেও দুদক কার্যালয়ের অভ্যন্তরে নির্যাতনের যে অভিযোগ উঠেছে, তা সঠিক নয়। ওই সময়ে অভিযুক্তদের দুদকে রাখার মতো কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ইকবাল মাহমুদ চেয়ারম্যান হওয়ার পর ২০১৬ সালে দুদকের গ্যারেজ বিল্ডিংয়ের দোতলায় পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা দুটি হাজতখানা প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিন্তু সরকারের অনুমোদন না থাকায় সেটি ভেঙে ফেলা হয়। ওই সময়ে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের দুদকে রাখা হয়নি। 

তারা আরও বলেন, দুদক আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে  সংস্থার চেয়ারম্যান ও কমিশনারের অনুমোদন সাপেক্ষে অনুসন্ধান নথি চালু করা হয়। কোনো অভিযোগের অনুসন্ধান ও তদন্তকালে আসামিকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হলে দুদক প্রথমে আদালতের অনুমোদন নিয়ে আসত। এরপরই আসামিকে দিনের বেলায় দুদক কার্যালয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রাতে পাশর্^বর্তী বা অভিযোগ সংশ্লিষ্ট থানায় পুলিশ হেফাজতে রেখে আসত। একইভাবে পরদিন থানা থেকে আসামিকে দুদকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ফের থানায় রাখত এবং রিমান্ড শেষে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠিয়ে দিত। এটিই ছিল নিয়ম। কিন্তু ওয়ান-ইলেভেনের সময় এই নিয়ম মানা হয়নি।

তারা বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আগে গ্রেপ্তার করে পরে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান সংক্রান্ত নথি চালু করা হতো। অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে মামলা দায়ের এবং পরে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হতো। আর তখন কোনো আসামিকে রিমান্ডে আনা হলেও দুদক কর্মকর্তারা জানতেন না আসামি কোথায় আছে, কে বা কারা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

অভিযুক্তদের নির্যাতনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাও অভিযোগ তুলেছিল। সংস্থাগুলো বলেছে, রিমান্ডে থাকা অনেককে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের সময়কার দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে নানামুখী আলোচনা রয়েছে। একপক্ষের মতে, এটি ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ও সাহসী পদক্ষেপ, যা রাজনৈতিক সংস্কারের পথ খুলে দেয়। অন্যপক্ষের মত, এটি ছিল রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি কৌশল, যেখানে আইন প্রয়োগের নামে বিরোধী মত দমন করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত